মানুষের শরীরের জন্য সূর্যের আলো খুব প্রয়োজন

মানুষের শরীরের জন্য সূর্যের আলো খুব প্রয়োজন

সূর্যের আলো মানুষের শরীরের বহু উপকার করে। বিশেষ করে দিনের শুরুর দিকে, যখন আলো ততটা তেতে ওঠেনি। সূর্যের আলো মানুষের শরীরের কিছু ক্ষতিও করে।

ভিটামিন ডি তৈরিতে সাহায্য করে :

সূর্যের আলো নিয়ে কথা বলতে গেলে শুরুতেই চলে আসে ভিটামিন ডি’র কথা, বলছিলেন ইউনাইটেড হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন বিষয়ে সিনিয়র কনসালটেন্ট অধ্যাপক ডা. কানিজ মাওলা। তার ভাষায় ভিটামিন ডি হচ্ছে ‘ম্যাজিক মেডিসিন’।

“বেশিরভাগ ভিটামিন শরীরে পেতে হলে আপনাকে পয়সা খরচ করতে হবে। অর্থাৎ নানা রকম খাবার কিনে খেতে হবে, তারপর শরীরে ভিটামিনের যোগান পাবেন। কিন্তু ভিটামিন ডি পাবেন একদম বিনামূল্যে যদি আপনি নিয়মিত সূর্যের আলোতে যান। খাবার দিয়ে শরীরের ভিটামিন ডি’র চাহিদা পূরণ হয় খুব কমই। এই জাদুর বটিকা মানুষের শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং সূর্যের আলো ছাড়া মানুষের শরীর ভিটামিন ডি প্রস্তুত করতে পারে না”, বলছিলেন ডা. কানিজ মাওলা।

তিনি ব্যাখ্যা করছিলেন এটি একটি চক্রের মতো। মানুষের ত্বকের নিচে এক ধরনের কোলেস্টেরল থাকে। সূর্যের আলোতে গেলে তা ভিটামিন ডি তৈরি করে। ভিটামিন ডি ক্যালসিয়াম তৈরি করে তা ব্যবহারে শরীরকে সহায়তা করে। হাড়, দাঁত, নখের সুরক্ষায় দরকার ক্যালসিয়াম। এই প্রক্রিয়ার শুরু সূর্যের আলোর সাথে ত্বকের সংস্পর্শের মাধ্যমে।

ভিটামিন ডি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শরীরকে সহায়তা করে। এটি পর্যাপ্ত না পেলে শিশুদের পায়ের হাড় বেঁকে যাওয়া রোগ রিকেট হতে পারে। বয়স্কদের হাড় দুর্বল করে দেয় এমন রোগ অস্টিওম্যালাসিয়া প্রতিরোধে সহায়তা করে। একই ভিটামিন শরীরের ফসফেট নিয়ন্ত্রণ করে। সুস্থ পেশির জন্যেও এটি দরকার।

তিনি বলছেন, “আজকাল শহরের মানুষজন চাকরি করে সারাদিন অফিসে থাকে, বাচ্চারা স্কুল কোচিং-এ থাকে। তাদের মাঠে খেলার সুযোগ আগের মতো নেই। তাই গায়ে সূর্যের আলো কম লাগে। আমি জোর গলায় বলতে পারি মানুষের শরীরে এখন ভিটামিন ডি কম। যে ভিটামিন ডি এত কাজে আসে সেটি পেতে হলে আপনাকে অবশ্যই নিয়মিত সূর্যের আলোতে যেতেই হবে।”

মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য খুবই দরকারি :

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দীন আহমদ বলছেন, সূর্যের আলোর সাথে হিসেব করে ঘড়ির কাটা চলে। আর আমাদের শরীরের যে ঘড়ি আছে সেটির কাটা নিয়ন্ত্রণ করে সূর্যের আলো। এই আলো আমাদের ঘুম পাড়ায় এবং জাগিয়ে তোলে।

সূর্যের আলো এবং অন্ধকার মানুষের শরীরে কিছু হরমোন তৈরি করতে ও তা নিঃসরণে সহায়তা করে। মানুষের ত্বকে সূর্যের আলো পড়লে মেলানিন নামে একটি রাসায়নিক তৈরি হয়। মানুষের ঘুমের জন্য প্রয়োজন যে হরমোন সেটি হচ্ছে মেলাটোনিন। সেটি তৈরিতে এই মেলানিন প্রয়োজন।

অন্যদিকে যখন সূর্যের আলো চলে যায় তখন মানুষের শরীর মেলাটোনিন হরমোনটি নিঃসৃত হয়। তখন আমাদের ঘুম পায়। এভাবেই মানুষের ঘুমের চক্র সূর্যের আলোর উপর নির্ভরশীল, ব্যাখ্যা করছিলেন অধ্যাপক আহমদ।

“যারা রাতে জেগে থাকে এবং দিনে ঘুমায় তারা তাদের শরীরের এই ঘড়ির কাটার প্রাকৃতিক নিয়ম ভাঙে। শরীর বলছে ঘুমাও কিন্তু আমি জেগে আছি। এতে তাদের আচরণে পরিবর্তন আসো। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, বেশি রাগ করে। এদের অনেকে সহজে মাদক গ্রহণে আসক্ত হয়। নিজেকে আঘাত করার প্রবণতা থাকে। এটাকে বলে সার্কাডিয়ান রিদম স্লিপ ডিজঅর্ডার। ভাল মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সূর্যের আলোর নিয়ম মেনে শরীরের ঘড়িকে চলতে দিতে হবে।”

সূর্যের আলো মন মেজাজ কিভাবে ভালো রাখে সেটি ব্যাখ্যা করে তিনি বলছেন, সূর্যের আলোতে গেলে মানুষের মস্তিষ্কে সেরোটোনিন নামে একটি হরমোন নিঃসরণ হয়। এটি মানুষের মন, মেজাজকে নিয়ন্ত্রণ করে। যারা নিয়মিত দিনের আলোতে বের হন না, রাতে কাজ করেন তাদের বিষণ্ণতায় বেশি ভুগতে দেখা যায়। যেসব শীতের দেশে সূর্যের আলো কম সময় ধরে থাকে সেসব দেশে মানুষজন বিষাদে ভোগেন বেশি।

বিষাদ কমাতে ‘লাইট থেরাপি’ ব্যাবহার করা হয়। সূর্যের আলোকে কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত করে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। অথবা সরাসরি সূর্যের আলোতে যেতে বলা হয়। এতে বিষণ্ণতা অনেকাংশে কমে যায়।

হেলাল উদ্দিন আহমদ বলছেন, “বৈজ্ঞানিক কথার বাইরেও কথা হচ্ছে দেখবেন আমাদের রৌদ্রোজ্জল দিনে সূর্যের আলো দেখলে ভালো। আবার মেঘাচ্ছন্ন, বৃষ্টির দিনে আমাদের মন খারাপ থাকে। এগুলোও কিন্তু সাধারণ বিশ্বাস।”

কখন এবং কতক্ষণ :

অধ্যাপক ডা. কানিজ মাওলা বলছেন, সূর্যের আলো সবচেয়ে ভালো কাজ করে দিনের শুরুতে। যখন আপনার ছায়া আপনার চেয়ে ছোট। গরমকালে প্রতিদিন দশ থেকে পনের মিনিট যথেষ্ট।

তবে কি কাপড় পরে আছেন তার উপরও নির্ভর করবে কতক্ষণ। বেশি ঢেকে থাকা কাপড় পড়লে বেশিক্ষণ থাকতে হবে। তাই শীতকালে তিরিশ মিনিট পর্যন্ত।

যে ক্ষতি করে :

সূর্যের আলোর ক্ষতি খুব বেশি নেই। সূর্যের আলোতে অনেক বেশি সময় ধরে থাকলে ত্বকের রঙ পরিবর্তন হয়, ত্বক পুড়ে যায়। এর একটিই বড় ধরনের ক্ষতি ।

যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থা এনএইচএস বলছে, সূর্যের আলোতে থাকে ‘আল্ট্রাভায়োলেট লাইট’ বা অতিবেগুনি রশ্মি। সূর্যের আলোতে হঠাৎ করে খুব বেশিক্ষণ থাকলে এই রশ্মি ত্বকের ক্যান্সারের কারণ হতে পারে।

যেমন বেড়াতে গিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের অনেকে দীর্ঘ সময় সৈকতে কাটান। এর অর্থ হচ্ছে হঠাৎ করে অনেক বেশি সূর্যের আলো। ত্বকের ক্যান্সার কিছুটা ত্বকের রঙের উপরেও নির্ভর করে। ত্বকের রঙ গাঢ় হলে সূর্যের আলোতে ক্যান্সারের প্রবণতা কম হতে দেখা গেছে।

 

 

 

 

ভিটামিন ডি তৈরিতে সাহায্য করে :

স্টোররুমে পাওয়া গেলো ৪০০ বছর পুরোনো মিলিয়ন ডলার দামের চিত্রকর্ম

স্টোররুমে পাওয়া গেলো ৪০০ বছর পুরোনো ডাচ চিত্রকর্ম! বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, এই চিত্রকর্মের দাম হতে পারে কয়েক মিলিয়ন ডলার। বহু বছর ধরে এই চিত্রকর্মটি পড়ে ছিল অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের উডফোর্ড একাডেমির স্টোররুমে। তবে সম্প্রতি এক রিস্টোরেশন বা পুনরুদ্ধার কার্যক্রম চলার সময় মূল্যবান এই চিত্রকর্মের সন্ধান পাওয়া যায়। এ খবর দিয়েছে সিএনএন।

খবরে জানানো হয়, ‘স্টিল লাইফ’ নামের ওই চিত্রকর্মটি ১৭ শতকে আঁকা হয়েছিল। এই যুগটিকে বলা হয় ডাচ স্বর্ণযুগ। উডফোর্ড একাডেমির যে ভবনে এই চিত্রকর্মটি পড়ে ছিল তা ন্যাশনাল ট্রাস্ট অব অস্ট্রেলিয়াকে উপহার দেয়া হয়। এরপরই সেখানে থাকা ৬০ হাজারটি সংগ্রহ ঘেটে দেখতে শুরু করে তারা। ওই সংগ্রহের মধ্যেই লুকানো ছিল স্টিল লাইফ চিত্রকর্মটি।

এ নিয়ে রিস্টোরেশন কার্যক্রম পরিচালনা করা কোম্পানি ইন্টারন্যাশনাল কনজারভেশন সার্ভিসের সিইও জুলিয়ান বিকেরস্টেথ বলেন, এটি একটি বিরল এবং অত্যন্ত আনন্দময় মুহূর্ত। এই চিত্রকর্মটি মূলত একটি টেবিলের যাতে রাখা রয়েছে বেশ কিছু বাদাম ও রুটি। এছাড়া আছে একটি রূপার পানপাত্র এবং কাচের বাসন।

 

এই চিত্রকর্মটি কে এঁকেছিল তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়না। অনেক গবেষকই বিশ্বাস করেন, এটি এঁকেছিলেন চিত্রকর গেরিট উইলেমজ হেদা। তিনি ছিলেন বিখ্যাত ডাচ চিত্রকর উইলেম ক্লেসজের সন্তান। হেদা নিজেও ডাচ স্বর্ণযুগের সেরা চিত্রকরদের একজন। তবে এখনও স্টিল লাইফের আসল ইতিহাস খুঁজে বের করতে গবেষণা চলছে। এটি পিতা ও ছেলের যৌথ কাজও হতে পারে বলে মনে করেন অনেক গবেষক।

এদিকে ন্যাশনাল ট্রাস্ট অব অস্ট্রেলিয়ার এক মুখপাত্র জানান, এই চিত্রকর্মটির দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়া এখনো চলছে। তবে বিশেষজ্ঞরা এরইমধ্যে জানিয়েছেন, এর দাম কম হলেও কয়েক মিলিয়ন ডলার হবে। উইলিয়াম ক্লেসজের কাজ সাধারণত ২.৯ মিলিয়ন থেকে ৩.৭ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি করা হয়।

সুন্দরবনে বর্তমানে বাঘ ১১৪টি: সংসদে বনমন্ত্রী

সুন্দরবনের বাঘ।  ছবি: সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট
সুন্দরবনের বাঘ। ছবি: সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট

সর্বশেষ ২০১৮ সালের জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনে বর্তমানে বাঘের সংখ্য ১১৪। ক্যামেরা ট্রাপিং পদ্ধতিতে গণনা করে ২০১৫ সালে সুন্দরবনে ১০৬টি বাঘ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া সুন্দরবনে ১ থেকে দেড় লাখ হরিণ, ১৬৫ থেকে ২০০টি কুমির এবং ৪০ থেকে ৫০ হাজার বানর রয়েছে। আজ সোমবার জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় সাংসদ দিদারুল আলমের প্রশ্নের জবাবে পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী শাহাব উদ্দিন এসব কথা জানান। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপন করা হয়।

বেনজীর আহমেদের প্রশ্নের জবাবে বনমন্ত্রী জানান, বর্তমানে বনের পরিমাণ মোট ভূমির ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ এবং বৃক্ষাচ্ছাদনের পরিমাণ মোট আয়তনের ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

সরকারি দলের আ কা ম সরওয়ার জাহানের প্রশ্নের জবাবে শাহাব উদ্দিন জানান, সামাজিক বনায়নে আওতায় ১৯৮০-৮১ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত ১ লাখ ২ হাজার ৩৩৯ দশমিক ২৮ হেক্টর উডলট ও ব্লক বাগান সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ছাড়া ৭৬ হাজার ৭৫২ দশমিক ৩৬৬ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান সৃষ্টি করা হয়েছে। এতে করে ৭ লাখ ২৬ হাজার ৬৫৪ জন উপকারভোগীকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

সরকারি দলের সাংসদ হাবিবর রহমানের প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক জানান, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের মোট পরিসম্পদের পরিমাণ ৩৯১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে স্থায়ী সম্পদ ১ কোটি ৬১ লাখ, বিনিয়োগ (এফডিআর) ২৩৪ কোটি ৭৫ লাখ এবং চলতি সম্পদ ১৫৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে কল্যাণ ট্রাস্ট আয় করেছে ৫২ কোটি ১৯ লাখ টাকা এবং ব্যয় করেছে ২৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। নিট লাভ হয়েছে ২৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

সরকার দলের মামুনুর রশীদ কিরনের প্রশ্নের জবাবে ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জানান, ২০০৮-০৯ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি, আধা সরকারি, বেসরকারি সংস্থা এবং সাধারণ মিলে ভূমি উন্নয়ন কর বাবদ ৬ হাজার ৯৬৩ কোটি ১২ লাখ ৯২ হাজার ৮২৩ টাকা আদায় হয়েছে।

সরকারি দলের হাজী মো. সেলিমের প্রশ্নের জবাবে সংসদ কাজে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানান, গত ২০২০-২১ অর্থবছরে সেনাকল্যাণ সংস্থা ৯৩ কোটি টাকা নিট লাভ করেছে। এ সময় মোট লাভ করে ৩৭২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ব্যয় হয় ২৫৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। আয়কর প্রদান করে ২০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।

আধুনিক ঔষধিতে আফ্রিকান আদিবাসীদের অবদান

১৭২১ সালের ঘটনা। স্মলপক্স বা গুটি বসন্তের ভাইরাস বোস্টনের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল। শেষ পর্যন্ত শহরের ১১,০০০ বাসিন্দার প্রায় অর্ধেককে সংক্রামিত করেছিল এবং প্রায় ৮৫০ জনের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। যদিও ভ্যারিওলেশন ( variolation)- এর জন্য অনেক বোস্টোনিয়ান সেইসময়ে মারাত্মক ভাইরাস থেকে বেঁচে যান। ভ্যারিওলেশন হল টিকা দেওয়ার একটি প্রাচীন পদ্ধতি। যা প্রথমে রোগী বা সাম্প্রতিক পরিবর্তনশীল ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া উপাদানের সাহায্যে সুস্থ ব্যক্তিদের টিকা দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয় এই আশায় যে এটি শরীরে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। ইচ্ছাকৃতভাবে ত্বকের কাটা অংশ, কিংবা নাক দিয়ে শ্বাস নেয়ার মাধ্যমে অল্প পরিমাণে গুটিবসন্তের জীবাণু প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয় সুস্থ মানুষের শরীরে। এই পদ্ধতি আসলে জনপ্রিয় হয় নিউ ইংল্যান্ডের প্রচারক কটন ম্যাথারের হাত ধরে ।

সালেম জাদুকরী বিদ্যায় ( witch trials) পারদর্শী ছিলেন। আসলে ওনেসিয়ামাস নামে একজন ক্রীতদাস যিনি পশ্চিম আফ্রিকার বাসিন্দা ছিলেন তিনি ম্যাথারকে এই পদ্ধতির কথা জানান । যদিও ওনেসমিয়াসকে সর্বজনীনভাবে আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেওয়া হয়নি, ম্যাথার একটি ডায়েরিতে লিখে গেছেন যে আসলে ওনেসমিয়াসই প্রথম এই পদ্ধতির পরামর্শ দিয়েছিলেন। ওনেসমিয়াস বলে গেছেন যে ইচ্ছাকৃতভাবে একজন সুস্থ ব্যক্তির দেহে সংক্রামিত রোগীর থেকে অল্প পরিমাণে গুটিবসন্তের ভাইরাস পুশ করলে তা শরীরের মধ্যে রোগপ্রতিরোধী ক্ষমতা গড়ে তোলে। বিএমজে কোয়ালিটি অ্যান্ড সেফটি-তে প্রকাশিত একটি জার্নাল অনুসারে, ওনেসমিয়াসের গুটিবসন্ত সম্পর্কে জ্ঞান আমেরিকান ইতিহাসে প্রথম টিকা সম্পর্কে একটি ধারণা প্রদান করেছিল ।

১৭২১ সাল নাগাদ তুরস্ক, চীন এবং ভারতেও সফল ভ্যারিওলেশন পদ্ধতি চালু হয় । তুরস্কে এই চিকিৎসা থেরাপি সম্পর্কে জেনে আসার পর গ্রেট ব্রিটেনে গুটিবসন্তের চিকিৎসা শুরু করেন লেডি মেরি ওয়ার্টলি মন্টেগু। যদিও ওনেসমিয়াসের চিকিৎসা অভিজ্ঞতা বস্টন মহামারীর সময় অগণিত জীবন বাঁচিয়েছিল, তবুও বহু শতাব্দী ধরে চিকিৎসা ইতিহাস থেকে তাঁর নাম বাদ পড়েছিল। যদিও আজ ইতিহাসবিদদের হাত ধরে কালের গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলির নাম প্রকাশ্যে আসছে। রিড কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক মার্গট মিনারডি এনবিসি বোস্টনকে বলেছেন, “ওনেসমিয়াসের গল্প থেকে একটি জিনিস শিখতে হবে তা হল যে বর্ণবৈষম্য এবং পক্ষপাতদুষ্টতার কারণে প্রায়শই কিছু মানুষের জ্ঞান, শ্রম এবং অভিজ্ঞতা প্রচারের আলোয় আসে না। অন্ধকারেই থেকে যায়। ” যখন ওনেসমিয়াস আমেরিকাতে ভ্যারিওলেশন বা প্রাচীন টিকাকরণ প্রক্রিয়া চালু করেছিলেন, অনেক ছাত্র ওনেসিমাসের ইতিহাস বা আমেরিকাতে আধুনিক বিজ্ঞান চর্চায় তাঁর মত একজন ক্রীতদাসের অবদান সম্পর্কে অবগত ছিলেন না । আমেরিকায় আফ্রিকানদের ক্রীতদাস বানানোর ভূমিকা নিয়ে পাবলিক স্কুলের ছাত্রদের বইতে যা পড়ানো হত বা রাষ্ট্র যা বোঝাতো তাই তারা শিখতো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দাসত্ব নিয়ে কি শেখানো হত তা জানতে সাউদার্ন পোভার্টি ল সেন্টার ১২ টি মার্কিন ইতিহাসের ওপর লেখা বই, ১,৭০০ বেশি ইতিহাস শিক্ষক এবং ১,০০০ উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়রদের ওপর সমীক্ষা চালায়। তাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে অনেক শিক্ষাবিদ আমেরিকান দাসত্বের ইতিহাস শেখানোর জন্য পর্যাপ্তভাবে তৈরী নন, ৫০% এরও বেশি রিপোর্ট করেছেন যে তাদের পাঠ্যপুস্তকের বিষয়টির কভারেজ অপর্যাপ্ত ছিল।

ওনেসমিয়াসের গল্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞানের ইতিহাস সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে: আফ্রিকান এবং আফ্রিকান বংশোদ্ভূ্ত লোকেরা কী ধরনের চিকিৎসা এবং বোটানিকাল জ্ঞানের অধিকারী ছিল এবং তারা কীভাবে আধুনিক বিজ্ঞানে অবদান রেখেছিল? এমনকি যখন তাদেরকে তাদের মাতৃভূমি থেকে নির্মমভাবে বহিস্কার করা হয়েছিল , তখন ক্রীতদাস আফ্রিকানরা ব্রিটেন, ইউরোপ এবং আমেরিকায় তাদের মূল্যবান চিকিৎসা জ্ঞানের নমুনা তুলে ধরেছিল । আফ্রিকান চিকিৎসা পদ্ধতি ভারত এবং চীনের মতোই বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থাগুলির মধ্যে একটি। লোকেরা যখন আফ্রিকার কথা চিন্তা করে তখন তারা অনেকেই এই বিষয়টি জানে না, সারা বিশ্বের ৮০% মানুষ তাদের ট্রাডিশনাল ওষুধ ব্যবহার করে। রয়্যাল সোসাইটির কাছে পাঠানো ঘানার কেপ কোস্ট ক্যাসেলের তৎকালীন মন্ত্রী জন স্মিথ এবং মিস্টার ফ্লয়েড- এর নথি অনুসারে, আমেরিকাতে স্থানান্তরিত হওয়ার আগে অন্ধকূপে আটকে রাখা হয়েছিল আফ্রিকান ক্রীতদাসদের । যেহেতু রয়্যাল আফ্রিকান কোম্পানির কর্মচারীদের আয়ুষ্কাল ছিল মাত্র চার থেকে পাঁচ বছর, মন্ত্রীরা মৃত্যু কমানোর জন্য এবং কর্মচারীদের স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির সন্ধান করছিলেন, পাশাপাশি বাণিজ্যিক ওষুধের জন্য নতুন বোটানিকাল ওষুধের সন্ধানও করছিলেন। পশ্চিম আফ্রিকানরা দাঁতকে সুস্থ ও সাদা রাখতে কোন গাছের ছাল ব্যবহার করেন আমেরিকানদের কাছে তাও ছিল গভীর আগ্রহের বিষয়।

ঘানার কেপ কোস্ট ক্যাসেলের মন্ত্রী জন স্মিথ বর্ণনা করেছেন যে আফ্রিকানরা কীভাবে “unnena plant” সেদ্ধ করে সেটিকে শরীরের কেটে যাওয়া বা ফোলা অংশে লাগাতেন প্রদাহ কমাতে। পাম তেল এবং পাম ওয়াইন উভয়ই বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হত। কোষ্ঠকাঠিন্য কমানোর জন্য পাম ওয়াইন সিদ্ধ করা unnena গাছের সাথে মেশানো হত এবং ঘা এবং ক্ষত নিরাময়ের জন্য গাছের পাতাগুলিকে থেঁতলে পাম তেলের সাথে মিশ্রিত করে মলম তৈরি করা হত । ক্রীতদাস আফ্রিকানদের কাছ থেকে স্মিথও “পোকুমা উদ্ভিদ” থেঁতো করে, শুকিয়ে সেবন করে আমাশয়ের জন্য একটি চিকিত্সা পদ্ধতি শিখেছিলেন । এখানেই শেষ নয়- পাকস্থলীর ব্যথা, গুটিবসন্ত, কৃমি, যৌনরোগ, দাঁতের ব্যথা, স্কার্ভি এবং রক্তক্ষরণের চিকিৎসাগুলি পশ্চিম আফ্রিকার বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে শিখেছিলেন স্মিথ। কিন্তু পশ্চিম আফ্রিকার বোটানিকাল এবং চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের নাম আজও রয়্যাল সোসাইটিতে অনুপস্থিত। কেপ কোস্ট ক্যাসলের প্রধান বণিক জেমস ফিপসের কাছে পশ্চিম আফ্রিকার চিকিৎসা অনুশীলনগুলি প্রাথমিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। লন্ডনের নিয়োগকর্তাদের কাছে তিনি লিখেছেন : ” আমরা একজন দক্ষ উদ্যানপালকের সহায়তা পেয়ে আনন্দিত , যিনি ভেষজগুলির সাথে ভালভাবে পরিচিত। আমরা বিশ্বাস করি যে এখানে এমন অনেক জিনিস পাওয়া যেতে পারে যা খুবই উপকারী, যা স্থানীয়দের দ্বারা ফার্মেসিতে ব্যবহার করতে দেখা যায়, সেইসাথে সার্জারিতেও সুফল মেলে ।” “Bitter Roots” নামক বইতে আবেনা ডোভ ওসেও-আসারে বর্ণনা করেছেন কিভাবে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে, আফ্রিকান দেশগুলিতে পাওয়া ঔষধি গাছের ক্ষমতা নিয়ে বিজ্ঞানী এবং নিরাময়কারী মধ্যে দ্বন্দ্ব বিদ্যমান ছিল । অনেক ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি আবার এর মধ্যেই মুনাফা তৈরী করেছে এই নিরাময়কারী উদ্ভিদগুলির পেটেন্ট দাবি করে।

যদিও অতীতের ইতিহাসবিদরা ওনেসমিয়াসের মতো ক্রীতদাসদের গল্প এবং কেপ কোস্ট ক্যাসলের পশ্চিম আফ্রিকান বোটানিকাল এবং চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের উপেক্ষা করেছিলেন, কিন্তু সাম্প্রতিককালে বোস্টন ম্যাগাজিন ওনেসমিয়াসকে ১০০ জন সেরা বোস্টোনিয়ানদের মধ্যে একজন বলে উল্লেখ করেছে । ” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষাবিদরা খুব অল্প বয়স থেকেই এই ইতিহাসগুলি শেখানো শুরু করতে পারেন পড়ুয়াদের এবং ওনেসমিয়াসের মতো গল্পগুলি সম্পর্কে জানলে শিশুদেরও বিজ্ঞান সম্পর্কে আগ্রহ বাড়বে।

পিরামিড মানে অপার বিস্ময়

”ইতিহাসের অন্যতম এবং প্রায় অক্ষত আশ্চর্য মিশরের পিরামিড। এর সুবিশাল উচ্চতা ও শৈলীর সামনে দাঁড়ালে বাক্‌রুদ্ধ হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না”

গিজা শহরের এক প্রান্তে গিজা মালভূমি। জগদ্বিখ্যাত চারকোনা বিশালাকৃতি ইমারতগুলো তার উপরেই। শহরের রাস্তা ধরে এগোতে থাকলে অনেক দূর থেকেই চোখে পড়ে এই চত্বর— গিজা পিরামিড কমপ্লেক্স। কেমন লাগে? বলা মুশকিল। প্রথম যখন নিজের চোখে দেখলাম, তখন রোমাঞ্চই বেশি হচ্ছিল। ছোটবেলা থেকে বইয়ে পড়া এক রহস্যঘেরা ইতিহাস আচমকা সাকার হয়ে উঠলে বোধহয় তেমনই হওয়ার কথা।

দূর থেকে খুব স্পষ্ট বোঝা যায় না পিরামিডগুলো। রোদ আর ধুলো মিলিয়ে দৃষ্টিপথ ঝাপসা। মালভূমি বেয়ে যখন তার সামনে পৌঁছলাম, তখন যেন নিজে থেকেই বিস্ময়সূচক শব্দ বেরিয়ে এল মুখ থেকে! বাক্‌রুদ্ধ হয়ে যাওয়াও আশ্চর্য নয়। স্বদেশে তাজমহল দেখেছি, ভিনদেশে বরোবুদুর, সব বিরাট বিরাট সৌধ, কিন্তু কখনও এত বড় এবং বিচিত্র কোনও সৃষ্টি দেখেছি বলে মনে করতে পারলাম না। বহু মাথা খাটিয়েও এই মাপের আন্দাজ পাওয়া কঠিন। এক-একটা চৌকো পাথর ১০-১৫ টন, সে রকম হাজার হাজার পাথর দিয়ে উঠে গিয়েছে এক বিশাল চারকোনা সৌধ। মিশরে অনেকেই বিশ্বাস করেন, পিরামিড মানুষের তৈরি নয়, ভিনগ্রহের প্রাণীদের বানানো! এ রকমও প্রচলিত যে, কোনও জাদুমন্ত্র বলে পাথরগুলোর ওজন শূন্য করে ফেলে সেগুলো পরপর সাজিয়ে পিরামিড বানানো হয়েছিল! এ সব কথাও কেন ভিতর থেকে বিশ্বাস করা সম্ভব, পিরামিডের সামনে না পৌঁছলে বুঝতাম না।

তবু যুক্তি দিয়ে ভাবতে তো হবেই। জানলাম, কিছু পাথর এসেছিল ওই এলাকার খনি থেকে, বাকিটা দক্ষিণ মিশরের আসোয়ান থেকে নীলনদ হয়ে। সেই সব পাথর কী ভাবে সাজানো হয়েছিল কিংবা অত উঁচুতে তোলা হয়েছিল, তা নিয়ে অবশ্য নিশ্চিত নন ইতিহাসবিদেরা। তবে অনেক রকম জ্যামিতিক হিসেবের কথাই বলা হয়। কেন তৈরি হয়েছিল পিরামিড? প্রাচীন মিশরীয়রা জন্মান্তরে বিশ্বাস করত। সেই সভ্যতার চতুর্থ রাজবংশের আমলে তাই গিজা মালভূমির উপরে তৈরি হয় এই আশ্চর্য সমাধিক্ষেত্র। সেখানেই আছে তিন ফারাও খুফু, খাফরে আর মেনকাউরে-র বিরাট পিরামিডগুলো। আছে স্ফিংস, আরও অনেক সমাধি এবং শিল্প-শ্রমিকদের গ্রাম। প্রাচীন কালের পৃথিবীর সাত আশ্চর্যের মধ্যে পিরামিডই সবচেয়ে পুরনো এবং অনেকাংশে অক্ষত।

তবে খ্রিস্টপূর্ব ২৫৬০ অব্দে একদল লোক ভাবল, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সৌধ বানাবে, যা উচ্চতায় ৪৮১ ফুট আর চওড়ায় ৭৫৬ ফুট। আর তা বানিয়েও ফেলল, এটা বিশ্বাস করতে সত্যি একটু অস্বস্তি হয়। তারা তো যেমন-তেমন করে বানায়নি। পিরামিডগুলোর উপরে ছিল আলাবাস্তার চুনাপাথরের আবরণ। তার ফলে অত বড় ইমারতগুলো সব সময়ে চকচক করত। এখন আমরা যা দেখে এত অবাক হই, তা কিন্তু কেবল ভিতরের কঙ্কাল। উচ্চতাও সেই সময়ের চেয়ে ২৬ মিটার কম। আসলে মৃত মানুষকে জীবন্তের মতো করে রেখে দেওয়ার জন্য ৭০ দিন ধরে এক কঠিন চিকিৎসাপ্রণালী— মমিফিকেশন— চালানোও তো প্রায় অবিশ্বাস্য এক ব্যাপার। সেই মমিকে রাখার ঘর, পিরামিড যে আরও তাজ্জব হবে, তা আর বেশি কথা কি!

ফারাও খুফুর পিরামিডটাই আকারে সবচেয়ে বড়, তার নাম গ্রেট পিরামিড। পাথরের ধাপে ধাপে এর গা বেয়ে কিছুটা ওঠা যায়। ভিতরে নামার ব্যবস্থাও আছে। তবে পিরামিডে নামার উত্তেজনাটুকু ছাড়া বাকিটা বেশ কষ্টকর। ভিতরেও কিচ্ছু নেই। ফারাওদের আমলে পিরামিডের ভিতরে যে মমি এবং ধনরত্ন থাকত, তার বেশির ভাগই লুঠ হয়ে গিয়েছে, বাদবাকিটা এখন মিউজ়িয়ামে।

খুফুর পিরামিডের সামনে থেকে ঘোড়ার গাড়িতে উঠলাম। বাকি দুই পিরামিড পেরিয়ে সেটা চলল একেবারে সাহারা মরুভূমির ভিতরে, একটা বালির পাহাড়ের দিকে। সেখান থেকে গোটা মালভূমির একটা প্যানোরোমিক ভিউ পাওয়া যায়। একসঙ্গে তিনটে বড় পিরামিড এবং তার সঙ্গে তিনটে ছোট পিরামিড মিলিয়ে গোটা চত্বরটা দেখা যায়। গিয়ে দাঁড়ানোর পরে যে দৃশ্য দেখলাম, তার বর্ণনা করতে গেলে লালমোহনবাবুর শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া উপায় নেই— ‘সাহারায় শিহরণ’! ধু ধু মরুভূমির মধ্যে ছ’টা পিরামিড, পাশ দিয়ে এক চিলতে রাস্তা। এই দৃশ্য দেখার জন্যই তো মিশরে আসা।

গিজার পরে মেম্ফিস-সাকারা না গেলে ভ্রমণ শেষ হয় না। গিজার দক্ষিণে ফারাওদের রাজধানী ছিল মেম্ফিস। গিজা থেকে দাহশুর পর্যন্ত যতগুলো পিরামিড চত্বর আছে, পুরোটা মিলিয়েই ইউনেসকো ওয়র্ল্ড হেরিটেজ সাইট। এই সমস্ত সমাধিক্ষেত্র মেম্ফিস শহরকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল। এই এলাকায় সবুজ কিছু বেশি। অধুনা গঞ্জ শহর, একটা খালের ধার ধরে অনেকটা রাস্তা যেতে হয়। দ্রষ্টব্য বলতে ওপেন এয়ার মিউজ়িয়াম। সেখানে ফারাও দ্বিতীয় রামসেসের অনেক মূর্তি আছে, আছে সে যুগের কিছু হায়রোগ্লিফিক্স লেখা এবং সমাধির অন্যান্য নমুনা।

সাকারায় আছে ফারাও জ়োসেরের বিখ্যাত স্টেপ পিরামিড। এটাও মরুভূমির মধ্যে, শহর ছাড়িয়ে একটু উঁচুতে। সাকারার কিছু সমাধির ভিতরে অবশ্য দেওয়াল জুড়ে ছবি আঁকা এবং হায়রোগ্লিফিক্সে লেখা দেখতে পেলাম।

এ সব ছবি খুব অপরিচিত বলব না। বাঙালি ছেলেবেলার সঙ্গে মিশরের প্রতি টান পরতে পরতে জড়িয়ে। তাই জানাও। খানিকটা ইতিহাস বইয়ে, খানিকটা রহস্যে। তাকে চাক্ষুষ করার পরে যে ঘোর লাগবে, তা বলাই বাহুল্য।

ভ্রমন করুন ফয়জুন্নেচ্ছা জমিদার বাড়ি থেকে

ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী উপমহাদেশের একমাত্র নারী নওয়াব। কুমিল্লার লাকসাম থেকে আধা কিলোমিটার দূরে পশ্চিমগাঁওয়ের ডাকাতিয়া নদীতীর ঘেঁষে তার ঐতিহাসিক নবাববাড়ির অবস্থান। ১৮৮৩ সালে বাবার মৃত্যুর পর তিনি পশ্চিমগাঁওয়ের জমিদারি লাভ করেন। কিন্তু ঐতিহ্যমণ্ডিত এই বাড়িটির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় তা এখন বিলীনের পথে। এ ছাড়া তার সম্পত্তির বড় অংশ কৌশলে দখল করে নিয়েছে একটি মহল। অবশেষে সংস্কৃৃতি মন্ত্রণালয় ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর মালিকানাধীন সর্বমোট ৪ একর ৫৩ শতক সম্পত্তি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে সংরক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছে সম্প্রতি। তার স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়িতে নির্মাণ করা হবে উন্মুক্ত জাদুঘর ও পর্যটন কেন্দ্র।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কুমিল্লা কার্যালয়ের আঞ্চলিক পরিচালক ড. মো. আতাউর রহমান বলেন, নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী বাংলাদেশের নারী সমাজের বিস্ময়। তিনি একজন সমাজহিতৈষী ও সাহিত্যিক ছিলেন। তার স্মৃতি রক্ষায় লাকসাম নওয়াববাড়ির দায়িত্ব প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে দেওয়া হয়েছে। বাড়িটি সংস্কার ও আধুনিকায়ন করে উন্মুক্ত জাদুঘর করা হবে। এ জন্য আবেদন জানানো হয়েছে। অনুমতি পেলেই কাজ শুরু হবে।

নওয়াব ফয়জুন্নেসা ছিলেন একাধারে জমিদার, নারীশিক্ষার প্রবর্তক, সমাজসেবক ও কবি। কুমিল্লার লাকসামের পশ্চিমগাঁও গ্রামে ১৮৩৪ সালে জমিদার বংশে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আহমদ আলী চৌধুরী ছিলেন হোমনাবাদ-পশ্চিমগাঁওয়ের জমিদার। তৎকালীন রক্ষণশীল পরিবেশে থেকেও গৃহশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে বাড়িতেই আরবি, ফারসি, উর্দুর পাশাপাশি বাংলা ও সংস্কৃৃতে দক্ষতা অর্জন করেন তিনি।

উপমহাদেশের নারী জাগরণের আরেক অগ্রপথিক বেগম রোকেয়ার জন্মের সাত বছর আগে ১৮৭৩ সালে কুমিল্লা শহরে তিনি একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে ফয়জুন্নেসা কলেজ নামে পরিচিত। ১৯০১ সালে লাকসামে ফয়জুন্নেছা ডিগ্রি কলেজ ও বিএন হাই স্কুলও প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।

নারীদের চিকিৎসাসেবা সহজ করতে ১৮৯৩ সালে নওয়াব ফয়জুন্নেছা মহিলা ওয়ার্ড প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া ১৮৯৯ সালে দেশের ঐতিহ্যবাহী কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের নির্মাণ কাজে তৎকালে ১০ হাজার টাকা অনুদান দেন। তিনি যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন জনহিতকর কাজেও।

নওয়াব ফয়জুন্নেছা রচিত ‘রূপজালাল’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৮৭৬ সালে। ‘সঙ্গীতসার’ ও ‘সঙ্গীত লহরী’ নামে আরও দুটি কবিতার বই লিখেছেন তিনি। রানী ভিক্টোরিয়া ১৮৮৯ সালে ফয়জুন্নেছাকে ‘নওয়াব’ উপাধি দিয়েছিলেন। তিনি ১৯০৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন। নওয়াব ফয়জুন্নেসাকে ২০০৪ সালে একুশে পদকে (মরণোত্তর) ভূষিত করা হয়।

‘নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী’ বইয়ের লেখক ও গবেষক গোলাম ফারুক বলেন, ‘ফয়জুন্নেছার স্মৃতি রক্ষায় দীর্ঘদিনের দাবির কারণে বাড়িটি এখন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীন। এতে আমরা আনন্দিত। আশা করি, এটি ভবিষ্যতে অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে।’

কিভাবে যাবেন :

ঢাকা থেকে ট্রেনে করে যাবেন লাকসাম স্টেশনে । সেখান থেকে খানিকটা দূরে দেখতে পাবেন ফয়জুন্নেচ্ছা জমিদার বাড়ি। লাকসাম স্টেশন থেকে ফয়জুন্নেচ্ছা জমিদার বাড়িতে ভাড়া পড়বে অটো রিকসা থেকে ৩০ টাকা।

এছাড়া আপনি বাসে করে যেতে পারবেন ফয়জুন্নেচ্ছা জমিদার বাড়িতে। বাসে আপনার ভাড়া পড়বে ২৫০-৩০০ টাকা।
এছাড়া আপনি ঢাকা থেকে লন্ঞে করে যেতে হবে চাঁদপুরে। চাদঁপুর থেকে লাকসামগামী ট্রেনে করে যেতে পারবেন ফয়জুন্নেচ্ছা জমিদার বাড়িতে।

 

ভ্রমন করুন বজরা মসজিদ থেকে

নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলাধীন বজরা ইউনিয়নের অন্তর্গত দিল্লির শাহী মসজিদের অনুকরণে নির্মিত বজরা শাহী মসজিদ(Bajra Shahi Masjid) মোগল সাম্রাজ্যের স্মৃতি বহন করছে। মসজিদের কেন্দ্রীয় পথের উপর ফার্সি ভাষায় উৎকীর্ণ লেখা অনুযায়ী মোগল সম্রাট মুহাম্মদ শাহের আমলে জমিদার আমানউল্যাহ কর্তৃক ১১৫৩ হিজরী সাল মোতাবেক ১১৩৯ বাংলা এবং ১৭৩২ সালে নির্মিত মসজিদটি আমানউল্যাহ এর বংশধর বলে কথিত আলী আহাং এবং সুজির উদ্দিন নামক দুই ব্যক্তি চীনা কাঠ, গ্লাস দ্বারা মসজিদের শোভাবর্ধন করেন। মসজিদ তৈরির ১৭৭ বছর পর ১৯০৯ সালে একবার মেরামত করা হয়।

মোগল সম্রাট মোহাম্মদ শাহের বিশেষ অনুরোধে পবিত্র মক্কা শরীফের বাসিন্দা তৎকালীন অন্যতম বুজুর্গ আলেম হযরত মাওলানা শাহ আবু সিদ্দীক এ ঐতিহাসিক মসজিদের প্রথম ইমাম হিসেবে নিয়োজিত হন। তাঁর বংশধরগণ যোগ্যতা অনুসারে আজো এ মসজিদের ইমামের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমানে প্রথম ইমাম সাহেবের সপ্তম পুরুষ ইমাম হাসান সিদ্দীকি উক্ত মসজিদের ইমামের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।

জনশ্রুতি রয়েছে যে, এ মসজিদে কিছু মানত করলে তাতে শুভ ফল পাওয়া যায়। তাই দেখা যায় যে, দুরারোগ্য ব্যাধি হতে মুক্তি পাওয়ার আশায় অগণিত মহিলা ও পুরুষ প্রতিদিন এ মসজিদে টাকা পয়সা সিন্নি দান করেন। এছাড়া বহু দূর- দূরান্ত থেকে মানুষ এসে এ মসজিদে নামাজ আদায় করেন। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভা এ ঐতিহাসিক মসজিদখানার ঐতিহ্য রক্ষার্থে এবং দুর্লভ নিদর্শনের জন্য কাজ করছে।

এই বিখ্যাত মসজিদের নামের সাথে জড়িয়ে আছে মুঘল সম্রাট মুহাম্মদ শাহের শাসনামলের কথা। ভারতবর্ষে মুঘলদের শাসনামলে পুরো ভারতবর্ষ এবং তৎকালীন বাংলা অঞ্চলসহ সর্বত্র স্থাপিত হয়েছিলো দারুণ কিছু স্থাপত্যশৈলী  যেগুলো আজও ইতিহাস হয়ে মুঘল শাসনমলের স্মৃতি বহন করে যাচ্ছে যুগ যুগ ধরে।

নোয়াখালী জেলায় অবস্থিত বজরা শাহী মসজিদ নির্মিত হয়েছিলো ১৭৪১-৪২ খ্রিস্টাব্দে শাসক মুহাম্মদ শাহের সময়কালে। তবে এই মসজিদটি মুহাম্মদ শাহের সময়ে তৈরী হলেও এই স্থাপনা তিনি নিজে নির্মাণ করেননি

এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন তৎকালীন জমিদার আমান উল্ল্যাহ। ১৭৪১-৪২ খ্রিস্টাব্দে প্রায় ৩০ একর জায়গা নিয়ে সেসময়ে বজরা শাহী মসজিদ নির্মাণ করা হয় এবং সাথে খনন করা হয় একটি সুবিশাল দিঘী।
পরবর্তীতে ১৯১১ থেকে ১৯২৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে বজরার জমিদার খান বাহাদুর আলী আহমেদ এবং খান বাহাদুর মুজির আহমেদ এই মসজিদের ব্যাপক সংস্কার করেন।

বজরা শাহী মসজিদের স্থাপত্যকলার বিবরণ:

আয়তাকার বজরা মসজিদে প্রধান গম্বুজ রয়েছে তিনটি। এছাড়া এর চারপাশে রয়েছে চারটি ছোট মিনার। মসজিদে মোট দরজা রয়েছে পাঁচটি এবং মসজিদের সম্মুখে পূর্বদিকে রয়েছে একটি সুদর্শন মিনারবেষ্টিত বিরাট তোরণ।

মসজিদের সম্মুখভাগ এবং তোরণের সৌন্দর্য বর্ধনে ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের উপাদান যা এই ঐতিহাসিক মসজিদের সৌন্দর্য কে বহুলাংশে বৃদ্ধি করে একে একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থানে পরিণত করেছে।

 

বজরা শাহী মসজিদ কোথায় অবস্থিত :

এই ঐতিহাসিক মসজিদের অবস্থান চট্টগ্রামের বিভাগের নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ি উপজেলার বজরা ইউনিয়নে। এটি নোয়াখালী-ঢাকা মহাসড়কের নোয়াখালী সোনাইমুড়ি উপজেলার বজরা বাজার অংশের পাশ্ববর্তী এলাকাতেই অবস্থিত।অর্থাৎ এই মসজিদটি ভ্রমণে আপনাকে দেশের যেকোনো স্থান হতে নোয়াখালীর বজরা বাজার আসতে হবে।

কিভাবে যাবেন বজরা শাহী মসজিদ :

এই ব্লগে ঢাকা , চট্টগ্রাম,নোয়াখালী সদর এবং দেশের বিভিন্ন জেলা হতে নোয়াখালীর বজরা শাহী মসজিদ ভ্রমণের উপায় বর্ণনা করবো যা দেশের সকল অঞ্চলের মানুষের জন্যেই সুবিধাজনক হবে।

রাজধানী ঢাকা হতে বাস বা ট্রেনে আপনারা সহজেই নোয়াখালী আসতে পারবেন।

ঢাকার সায়েদাবাদ বা যাত্রাবাড়ী হতে চব্বিশ ঘণ্টাই নোয়াখালীর উদ্দেশ্যে লাল-সবুজ, একুশে পরিবহন, ঢাকা এক্সপ্রেস ও হিমাচল বাস ছেড়ে আসে। এসব বাসে আপনি ৩৫০-৪০০ টাকা ভাড়ায় নোয়াখালী আসতে পারবেন।

May be an image of outdoors and monument

এছাড়া ঢাকার মিরপুর, উত্তরা, শ্যামলী, ঝিগাতলা এলাকা প্রতিদিন রাত এগারোটার পর এবং ভোরে ৬-৭ টার ভেতর এই পরিবহনগুলোর একটি করে বাস ছেড়ে আসে।

ঢাকার কমলাপুর হতে দুপুর ৩:২০ মিনিটে নোয়াখালীর উদ্দেশ্যে উপকূল এক্সপ্রেস ছেড়ে আসে। ট্রেনে ভাড়া লাগবে শ্রেণীভেদে ২৭০-৫০০ টাকা।

বাসে এসে আপনারা সরাসরি বজরা শাহী মসজিদ যেতে চাইলে বাস আপনাদের বজরা বাজার নামিয়ে দিবে। বজরা বাজার হতে ২০০ গজ পশ্চিমেই বজরা শাহী মসজিদের অবস্থান।

এছাড়া ট্রেনেও আপনি বজরা রেলস্টেশন নেমে সেখান থেকে ২০ টাকা রিকশা ভাড়ায় বজরা বাজার এসে হেঁটে যেতে পারবেন বজরা শাহী মসজিদ।

বাংলাদেশে শ্রম অভিবাসনের জন্য প্রয়োজন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন

বাংলাদেশে শ্রম অভিবাসনের জন্য প্রয়োজন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন

বাংলাদেশ থেকে চার লাখেরও বেশি মানুষ শ্রম অভিবাসনের জন্য বা বৈদেশিক কর্মসংস্থানের উদ্দেশে দেশ ছেড়ে যান। এ তথ্য আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর। কাজেই তাঁদের সমস্যাগুলোর ওপর নজর দেওয়া জরুরি।

জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশগুলো ১৮ ডিসেম্বর ‘আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস’ হিসেবে পালন করেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯০–এর এদিনে সব অভিবাসীশ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক কনভেনশনের ওপর এ প্রস্তাবটি পাস করে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০০০ সালের ৪ ডিসেম্বর দিনটিকে (১৮ ডিসেম্বর) বিশ্বব্যাপী পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। মূলত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ব্যাপক হারে অভিবাসন ও বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি ঘিরে এ দিবসের উৎপত্তি।

বিশ্বব্যাপী মানব অভিবাসন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভৌগোলিক অঞ্চলভেদে স্থায়ীভাবে বা অস্থায়ীভাবে বসতি স্থাপনের অভিপ্রায়ে মানুষ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল করে। বাংলাদেশি অভিবাসীশ্রমিকেরা দেশ থেকে শুরু করে নানান পর্যায়ে, নানান ধরনের শোষণ, বঞ্চনা, প্রতারণা, লাঞ্ছনা ও হয়রানির শিকার হন। মূলত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়া বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অনেককেই জীবন বা সম্পদ বাজি রেখে বিদেশে পাড়ি জমাতে হয়। অভিবাসন, অভিবাসী ও তাঁদের পরিবার–পরিজনকে নিয়ে হৃদয়ছোঁয়া অনেক প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রচারিত ও প্রকাশিত হয়। অভিবাসন ও অভিবাসীদের সেবার ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করার কোনো দৃশ্যমান প্রবণতা নেই। নেই সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর একসঙ্গে কাজ করার কোনো টেকসই উদ্যোগ। বাংলাদেশে নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনে সরকারের নানাবিদ প্রচেষ্টাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত করা উচিত।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো অভিবাসীদের নিয়ে তথ্যনির্ভর কোনো সিদ্ধান্ত নিতে প্রায়ই সহায়ক হয়ে থাকে। তা সত্ত্বেও সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা রকম চটকদার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে অনেক সময় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রতারণা করারও খবর পাওয়া যায়। নিয়মতান্ত্রিক, নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের জন্য বাংলাদেশে একটি যুগোপযোগী আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

বৈশ্বিক শ্রমবাজারে কোভিড-১৯–এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় অনেক অভিবাসী ইতিমধ্যে দেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন এবং অনিশ্চিত জীবন যাপন করেছেন। তাঁদের চাহিদা নিরূপণ করে পুনর্বাসনের জন্য জরুরি কিছু কার্যক্রম নেওয়া দরকার। দেশে এ পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ প্রবাসী কর্মীকে বিশেষ ব্যবস্থায় ‘সুরক্ষা’ অ্যাপসের আওতায় এনে টিকা সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। স্বল্প সুদ ও সহজ শর্তে কিছু ঋণ সুবিধা প্রদান ও পুনর্বাসন কার্যক্রমও নিয়েছে সরকার।

বাংলাদেশে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ঘটনা, যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা নাগরিক ঝামেলার বিষয় হতে পারে। যার কারণে নিজ বাড়ি থেকে সরে যাওয়া ব্যক্তি বা বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি হিসেবে তাঁদের বর্ণনা করা যেতে পারে বা নিজ দেশে অভ্যন্তরীণভাবে ও বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি হতে পারে কেউ কেউ। যে ব্যক্তি অন্য দেশে আশ্রয় চান, সে যদি স্বদেশ ত্যাগের কারণ হিসেবে রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা অন্য কোনো ধরনের নিপীড়নের শিকার হন, তাহলে সে দেশে আশ্রয় চাওয়ার একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে পারে, যাকে সাধারণত আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে বর্ণনা করা হয়। যদি এ ধরনের আবেদনটি সফল হয়, তবে ওই ব্যক্তির আইনগত মর্যাদা হয় শরণার্থীর মতো। সাধারণত এ চলাচল প্রায়ই দীর্ঘ দূরত্বে এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঘটে থাকে। তবে অভ্যন্তরীণ অভিবাসনও সম্ভব; প্রকৃতপক্ষে, এটি বিশ্বব্যাপী মানব অভিবাসনের প্রভাবশালী একটি রূপ।

বৈশ্বিক প্রায় ৫০০টি দেশের আইওএম-এর অফিস এবং সাব-অফিস রয়েছে। সরকারি, আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় নাগরিক সমাজের অংশীদারদের দ্বারা মাইগ্রেশন–সংক্রান্ত ইভেন্টগুলো সংগঠিত হয়। তাঁদের সমর্থিত বৈশ্বিক ইভেন্টটি মাইগ্রেশন থিম, সামাজিক সংহতি, মর্যাদা, শোষণ ও অভিবাসনের জন্য নির্দেশিত সংহতির বিস্তৃত পরিসরে পরীক্ষা করে। এই নীতির দ্বারা যে মানবিক এবং সুশৃঙ্খল অভিবাসন, যা সমাজকে নানাভাবে উপকার করে।

বিশ্বখ্যাত পর্যটক মার্কো পোলো

মার্কো পোলোর নাম শুনেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন হবে। তবে তার গল্প বলতে গেলে শুধু মার্কো পোলোর কথা বললে হবে না, তাঁর গৌরবময় ভ্রমণ কাহিনীর সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে আরও দুটি নাম।মার্কো পোলোর পর্যটক হবার বিষয়টি অনেকটাই কিন্তু বংশগত। তাঁর বাবা নিক্কলো পোলো এবং চাচা মাত্তেও পোলো ছিলেন বিখ্যাত পর্যটক এবং ব্যবসায়ী। মার্কো পোলোর শিশুকালেই তারা দুইজন এশিয়া ভ্রমণ করেন এবং বিখ্যাত মঙ্গলিয়ান সম্রাট কুবলাই খান এর সাথে দেখাও করেন। সেই হিসেবে মার্কো পোলো প্রথম ইউরোপিয় নন যিনি সুদূর এশিয়া ভ্রমণ করেন। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে যে মার্কো পোলোর এত খ্যাতির রহস্য কি? এর উত্তর পেতে হলে তাঁর ভ্রমণ সম্পর্কে জানতে হবে। মার্কও পোলোর সাথে আমাদেরও হয়ে উঠতে হবে ত্রয়োদশ শতাব্দীর অদম্য পর্যটক, যারা অজানাকে জানার জন্যও যেকোনো ঝুকি নিতেও প্রস্তুত ছিলেন মার্কো পোলোর ছেলে বেলা সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। তাঁর বাবা যখন ভ্রমণে ছিলেন, তখন তাঁর জন্ম হয়। জন্মের কিছুকাল পরেই তাঁর মা মারা যায় এবং চাচা চাচির কাছে তিনি মানুষ হন। তাঁরা তাঁকে ব্যবসায়ী এবং পর্যটক হবার জন্যও প্রয়োজনীয় সব শিক্ষায় শিক্ষিত করেন। ফলে অতি অল্পসময়ের মধ্যেইমার্কোবৈদেশিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রা, ভূগোল এবং জাহাজ চালনার মত বিষয় গুলোতে দক্ষতা অর্জন করেন।

জীবনের প্রথমার্ধ

১২৬৯ সালে মার্কো পোলোর বাবা এবং চাচা ভেনিস প্রত্যাবর্তন করেন। ১৫ বছর বয়সী মার্কোর সেটাই ছিল বাবার সাথে প্রথম সাক্ষাৎ। এর দুই বছর পর ১২৭১ সালে বাবা এবং চাচার সাথে ১৭ বছর বয়সী মার্কো বেরিয়ে পড়েন এক দুঃসাহসী অভিযানে। এই অভিযানের বর্ণনা পরবর্তীতে মার্কোর লেখায় চমৎকার ভাবে ফুটে ওঠে। নিক্কলো পোলো এবং চাচা মাত্তেও পোলো এই অভিযানটি শুরু করেন মূলত কুবলাই খানের একটি অনুরোধ রাখতে গিয়ে। মঙ্গোলীয় সম্রাট কুবলাই খান এর আগে নিক্কলো এবং মাত্তেও কে অনূর্ধ্ব করেন একটি দুষ্প্রাপ্য বস্তু তাঁকে এনে দেয়ার জন্য। সেটি হল ‘ক্রিজম’ বা জেরুজালেমের পবিত্র তেল। খ্রিস্টান ধর্মে এই তেল কে অনেক পবিত্র, দুষ্প্রাপ্য এবং মর্যাদা সম্পন্ন হিসেবে দেখা হত। এই তেল সংগ্রহ পোলোদের অভিযানের মুল উদ্দেশ্য হলেও একমাত্র নয়। ভ্রমণ এবং অভিযান প্রিয় পোলোদের উদ্দেশ্য ছিল যতটা সম্ভব এশিয়া এবং আসে পাশের এলাকা গুলো ঘুরে দেখা এবং সেই সাথে কিছু বাণিজ্যও করা। চীন ভ্রমণের উদ্দেশ্যে প্রথমে পোলোরা নৌপথে অ্যাক্রি এ যান। এরপর উটের পিঠে করে হরমুজ প্রণালি পর্যন্ত পৌছায়। পোলোদের ইচ্ছা ছিল সরাসরি চীন যাবার। কিন্তু হরমুজ প্রণালীতে তাঁরা যে জাহাজগুলো পায় সেগুলা সমুদ্র যাত্রার উপযোগী ছিল না। তাই তাঁরা বাধ্য হয়ে সড়ক পথই বেছে নেয়। তাঁরা বিখ্যাত সড়ক সিল্ক রোড ধরে যাত্রা শুরু করে। দীর্ঘ কষ্টকর পথ অতিক্রম করে অবশেষে তাঁরা সাংডুতে পৌঁছান। এখানেই ছিল কুবলাই খানের গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ। এখানে পৌছাতে পোলোদের বিস্তর ঝামেলা পোহাতে হয়। যেমন একবার পোলোরা এক দল ব্যবসায়ীদের সাথে যাচ্ছিলো। পথিমধ্যে একদল ডাকাত তাদের আক্রমণ করে বসে। ডাকাতরা অদ্ভুত এক উপায়ে ধূলিঝড়কে আড়াল হিসেবে ব্যাবহার করে আক্রমণ করে। তারা অনেক ব্যবসায়ীকে মেরে ফেলে এবং অনেককে বন্দী করে। পোলোরা সেযাত্রা কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে বাচে।

মার্কো পোলো নিজে চারটি ভাষায় কথা বলতে পারতেন। দীর্ঘদিনের ভ্রমণের ফলে বিস্তর অভিজ্ঞতাও অর্জন করায় তাঁরা চীনা রাজদরবারে যথেষ্ট সম্মানিত এবং সমাদৃত হয়েছিলেন।

অবশেষে ভেনিস থেকে রওনা হবার সাড়ে তিন বছর পর পোলোরা কুবলাই খানের প্রাসাদ। তাদের পৌঁছানোর সঠিক সময় নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। ঐতিহাসিকদের মতে ১২৭১ থেকে ১২৭৫ এর মধ্যে যেকোনো সময় পোলোরা ইউওান রাজদরবারে পৌঁছান এবং পবিত্র ক্রিজম তেল এবং পোপদের চিঠিগুলো রাজদরবারে হস্তান্তর করেন। এরপর তারা বেশ লম্বা সময় চীনে অবস্থান করেন।মার্কোপোলো নিজে চারটি ভাষায় কথা বলতে পারতেন।মার্কোএবং তাঁর সফর সঙ্গীরা দীর্ঘদিনের ভ্রমণের ফলে বিস্তর অভিজ্ঞতাও অর্জন করে ফেলেছিলেন। তাই তাঁরা চীনা রাজদরবারে যথেষ্ট সম্মানিত এবং সমাদৃত ছিল। কেউ কেউ মনে করেনমার্কোপোলোকে উচ্চ পদেও বহাল করা হয়েছিল। যাইহোক, তাঁরা চীনের বেশিরভাগ অংশই ঘুরে দেখেন। বিশেষ করে দক্ষিণ এবং পূর্ব চীন ও বার্মার অনেক বর্ণনা পাওয়া যায় তাঁর লেখায়। চতুর সম্রাট কুবলাই খান ভাবলেন যে পোলোদের এই অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে কাজে লাগানো যেতে পারে। তাই তিনি পোলোদের চীন ত্যাগের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করলেন। কুবলাই খানের বয়স হয়ে গিয়েছিল। পোলোরা ভাবলেন যে যদি কুবলাই খান মারা যান, তাহলে তাঁর বিপক্ষের লোকজন পোলোদের জন্যও সমস্যা হয়েও দাড়াতে পারে। পোলোদের রাজদরবারের জনপ্রিয়তা স্বাভাবিকভাবেই অনেকের ঈর্ষার কারণ হতেই পারে। এতে তাঁরা বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। অবশেষে ভাগ্যদেবী সুপ্রসন্ন হয় ১২৯২ সালে। সে বছর কুবলাই খানের জ্ঞাতি ভাই, পারস্যের অধিপতি বিবাহের পাত্রী খোজার জন্যও একদল সভাসদ প্রেরণ করেন চীনে। তারা পোলোদের অনূর্ধ্ব করেন যেন তারা ফিরতি পথে সভাসদদের দলটি কে সঙ্গ দেয়। অবশেষে পোলোরা চীন ত্যাগ করার একটা চমৎকার সুযোগ পেয়ে যায় এবং পারস্য যাবার জন্যে এক বাক্যে রাজী হয়ে যায়। সেই বছরেই দক্ষিণ চীনের জাইতুন নামক নগর থেকে জাহাজযোগে পোলোদের পারস্য অভিমুখে যাত্রা শুরু হয়।

পারস্য পথের দুই বছরের সুদীর্ঘ যাত্রায় প্রতিকুল পরিবেশ আর অসুস্থতার কারণে ছয়শত যাত্রীর পাঁচশত বিরাশি জনই মৃত্যুবরণ করেন।

যাত্রার জন্যও ব্যবহার করা হয় চীনের ঐতিহ্যবাহী জলযান যার নাম জাঙ্ক। প্রথমে কনভয়টি জাইতুন থেকে সিঙ্গাপুর পৌছায়। এর পর তাঁরা উত্তর দিকে যাত্রা শুরু করেন এবং সুমাত্রা (বর্তমান ইন্দোনেশিয়া) পৌঁছান। এরপর তাঁরা পশ্চিমে যাত্রা করেন এবং জাফনার বিখ্যাত পয়েন্ট পেদ্র তে পৌঁছান। সেখান থেকে তামিলাক্কামের পান্দায়ান বন্দর। এভাবে বিভিন্ন দেশ ঘুরে ঘুরে অবশেষে আরব সাগর পার হয়ে হরমুজ প্রণালীতে পৌঁছান। দুই বছরের সুদীর্ঘ যাত্রাটি মোটেও সুখকর কিছু ছিল না। প্রতিকুল পরিবেশ আর অসুস্থতার কারণে ছয়শত যাত্রীর পাঁচশত বিরাশি জনই মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘ ভ্রমণ আর অভিজ্ঞতার কারণে পোলোরা শারীরিক ও মানসিক ভাবে অন্যদের চাইতে বেশ শক্ত সামর্থ্য ছিলেন। তাই এযাত্রাও তাঁরা প্রাণে বেঁচে যান। হরমুজ প্রণালীতে অবতরণের পর পোলোরা বরযাত্রীদের কাছ থেকে বিদায় নেন এবং স্থলপথে ভ্রমণ করে কৃষ্ণ সাগরের নিকটবর্তী ত্রেবিজন্দ বন্দরে পৌঁছান। অবশেষে ১২৭১ সালে ভেনিস ত্যাগ করার চব্বিশ বছর পর পোলোরা স্বভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেন ১২৯৫ সালে। ততদিনে তাদের ২৪,০০০ কিলোমিটারেরও বেশী ভ্রমণ করা হয়ে গেছে। দেশে ফিরে তাঁরা অবাক হয়ে দেখেন যে ভেনিসের সাথে জেনোয়ার তুমুল যুদ্ধ চলছে। কিছু বুঝে উঠার আগেই তাঁরা বন্দী হন জেনোয়ার সৈনিকদের হাতে। এরপর তাদের কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। সম্ভবতমার্কোপোলোর বাবা এবং চাচার বন্দীদশাতেই মৃত্যু হয়। কারাগারে থাকা অবস্থায়মার্কোরসাথে দেখা হয় পিসার বিখ্যাত লেখক রুস্তিচেলোর সাথে। তাঁকে তিনি তাঁর ভ্রমণ কাহিনী বর্ণনা করেন। রুস্তিচেলো সাথে সাথে সেগুলো লিপিবদ্ধ করতে থাকেন।মার্কোপোলো চীনে থাকার অভিজ্ঞতা অনেক বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করেন। কুবলাই খান ও তাঁর প্রাসাদের বর্ণনা ছাড়াওমার্কোতাঁর লেখায় এমন সব জিনিস পত্রের বর্ণনা দেন যা ছিল তখনকার ইউরোপীয়দের কাছে একদমই অজানা। যেমন কাগজের টাকা, কয়লা, ডাক ব্যবস্থা এবং চশমার মত বিষয়গুলোর সাথে ইউরোপের কেউই পরিচিত ছিলেন না। এভাবে সৃষ্টি হয়মার্কোপোলোর বিখ্যাত ভ্রমণ কাহিনীর পাণ্ডুলিপি।

শেষ যাত্রা

১২৯৯ সালে ভেনিস ও জেনোয়ার মধ্যে শান্তি চুক্তি হয় এবংমার্কোপোলো কে মুক্তি দেয়া হয়। ভ্রমণ বাণিজ্যও থেকে সংগৃহীত অর্থ ও অন্যান্য মূল্যবান দ্রব্যাদি বিক্রয় করে তিনি বেশ ধনী হয়ে যান। এরপর আর তিনি কখনই ভেনিস ছেড়ে কোথাও যাননি। ১৩০০ সালে ডোনাটা ব্যাডর কে বিয়ে করে সংসারী হন মার্কও। তাঁর তিনজন সন্তান জন্মগ্রহণ করে। ১৩২৪ সালে ৭০ বছর বয়সেমার্কোপোলো মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে ভেনিসের স্যান লরেনজো গির্জার নিকট সমাহিত করা হয়।মার্কোপোলো অনেক বিখ্যাত একজন পর্যটক। তাঁর পূর্বে এবং পরেও অনেক পর্যটক তাঁর মত কিংবা তাঁর চাইতেও বেশী ভ্রমণ করেছেন। কিন্তু কিছ ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অন্যদের চাইতে অনেক বেশী।


ইবনে বতুতা – ইতিহাস ও বিশ্বভ্রমণ

ইবনে বতুতা ছিলেন প্রধানত একজন মরক্কান পর্যটক। অত্যন্ত মেধাবী এই আরব পাশাপাশি ছিলেন একজন ইসলামী চিন্তাবিদ, বিচারক এবং ভূতত্ত্ববিদ। তিনি তাঞ্জিয়ের এর এক বিখ্যাত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি তাঁর শৈশবকালের সব ঘটনা তার ভ্রমণ পঞ্জিতে লিপিবদ্ধ করে যান। এখান থেকেই আমরা পরবর্তীতে তাঁর শৈশব সম্পর্কে জানতে পারি। তিনি সুন্নি মালিকি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৩২৪ সালে তিনি হজের উদ্দেশে মক্কা অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। মূলত এখান থেকেই তাঁর বিখ্যাত ভ্রমণ শুরু হয়। তিনি উত্তর আফ্রিকার উপকূল ধরে তাঁর যাত্রা শুরু করেন এবং পথিমধ্যে অনেক জায়গায় বিরতি নেন। তিনি আবদ-আল-ওয়াদিদ এবং হাফসিদ নামক রাজ্য গুলো ভ্রমণ করেন। এরপর তলেমসেন, বেজাইজা এবং তিউনিসিয়া ভ্রমণ করেন। মক্কা পৌছাতে তাঁর ১৬ মাস সময় লেগে যায়।যদিও তিনি একাকী ভ্রমণে বের হয়েছিলেন, তারপরও তিনি সব সময় কোন না কোন কাফেলার সাথে চলাফেরা করতেন। একাকী চলাফেরা করলে দস্যুদের কবলে পরার সম্ভাবনা ছিল। ১৩২৬ সালের বসন্তকালে ইবনে বতুতা মিসরের বিখ্যাত শহর আলেক্সান্দ্রিয়া তে পৌঁছান। তখন বাহ্রি মামলুক শাসনামল চলমান ছিল। এখানে পৌছাতে তাকে ২০০০ মাইল পথ অতিক্রম করতে হয়। এখানে তিনি কয়েক সপ্তাহ অবস্থান করেন। সেহান থেকে তিনি কায়রো গমন করেন। সেখানে একমাস থাকেন।

ইবনে বতুতা: 

এর পর কায়রো থেকে হেব্রন, জেরুজালেম এবং বেথেলহেম হয়ে দামেস্ক ভ্রমণ করেন। দামেস্কে তিনি পুরো রমজান মাস অতিবাহিত করেন। এর পর তিনি একটি কাফেলায় যুক্ত হন এবং ৮০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে মদিনায় গিয়ে মহানবী (সা:) এর রউজা মুবারক দেখতে যান। মক্কা থেকে তিনি ইরাকগামী একটি কাফেলার সাথে যুক্ত হন এবং যাত্রা শুরু করেন। এরপর বাগদাদ অভিমুখে না গিয়ে পারস্যের দিকে যাত্রা করেন। তিনি ওয়াসিত নগর ভ্রমণ করেন। এরপর টাইগ্রিস নদীর পার ধরে প্রসিদ্ধ বসরায় পৌঁছান।১৩৩১ সালেরর দিকে ইবনে বতুতা সোমালিয়ার বিখ্যাত শহর মাগাদিসু তে অবস্থান করছিলেন। এরপর তিনি এশিয়া অভিমুখে যাত্রার পরিকল্পনা করেন। ১৩৩২ সালে তিনি কনস্তানটিনোপল পৌঁছান। তুরস্কের বেশ কিছু এলাকা ভ্রমণের পর আফগানিস্তান হয়ে ১৩৩৩ সালে তিনি দিল্লি পৌঁছান সেখানে সুলতান মুহম্মদ বিন তুঘলকের সাথে দেখা করেন। সুলতান তাঁকে কাজী পদে নিযুক্ত করেন। তিনি প্রায় ছয় বছর সেখানে কাজ করেন।এরপর তিনি মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা ভ্রমণ করেন। ১৩৪৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছান। হজরত শাহ জালালে (রহঃ) সাহেবের সাথে দেখা করার ইচ্ছায় এর পর তিনি সিলেট যাত্রা করেন। ১ মাস পর তিনি সিলেট পৌঁছান এবং হজরত শাহ জালাল (রহঃ) এর সাথে দেখা করেন। এর পর তিনি জাহাজ যোগে সোয়াহিলি উপকূল এবং মম্বাসা দ্বিপ ভ্রমণ করেন। ১৩৪৫ শেষের এর দিকে তিনি চিনের কুওানঝু প্রদেশে পৌঁছান। সেখানে স্থানীয় মুসলমানরা তাকে সাদর সম্ভাষণ জানান। ১৩৪৬ সালে তিনি পুনরায় মক্কার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। অবশেষে ১৩৫৪ সালে জন্মভূমি মরক্কোতে ফিরে আসেন। দেশে ফেরার পর তিনি তাঁর ভ্রমণ কাহিনী লেখা শুরু করেন।