পর্যটনশিল্পে করোনা ভাইরাসের প্রভাব

বর্তমানে সারা পৃথিবী একটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব জুড়ে এখন নতুন আতঙ্কের নাম করোনা ভাইরাস। ইতোমধ্যে বিশ্বের অনেক দেশে এই রোগ সংক্রমিত হয়েছে। বাংলাদেশও এই রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশেও কয়েক জন রোগী পাওয়া গেছে। তবে করোনা ভাইরাসের প্রভাবে পৃথিবীর ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। ইতিমধ্যে পর্যটনশিল্পেও এই রোগের প্রভাব ব্যাপকভাবে পড়তে শুরু করেছে। প্রাণঘাতী ভাইরাসটি দ্রুত ছড়ানোর কারণে আতঙ্ক এখন বিশ্ব জুড়ে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশেও। বিশেষ করে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনে এটাকে একটি বড়ো ধাক্কা বলে মনে করছেন।

চীন ছাড়াও ভাইরাসটিতে নতুন করে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা বাড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে শতাধিক দেশে। ইতালী, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র থাইল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, নেপাল এবং যুক্তরাষ্ট্রেও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সংখ্যা বাড়ছেই। ভাইরাসের কারণে চীনা নববর্ষের ছুটি বাড়ানো হয়েছে। এটি অনির্দিষ্টকালের দিকেই যাচ্ছে। এই সময়ে চীনে পর্যটনের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা প্রায় শূন্যের কোটায়। তাছাড়া ভাইরাসটি প্রতিরোধে বিভিন্ন দেশ তাদের পর্যটন এলাকাগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে। ভুটান, সিকিম বিদেশি পর্যটকদের জন্য অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, যার পরিধি আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ভাইরাসটির বিস্তার রোধে প্রথমে উত্পত্তিস্থল হুবাই প্রদেশের সঙ্গে চীন তথা গোটা দুনিয়ার যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে বেইজিং। গোটা ইতালী বন্ধ হয়ে গেছে। একটাই চাওয়া, যত দ্রুত সম্ভব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা। বিশ্ব মিডিয়া বলছে, আচমকা ছড়িয়ে পড়া ঐ ভাইরাস ব্যবসা ও পর্যটনের জন্য বড় ধাক্কা। বিগত এক মাসে ব্যবসা বা পর্যটনের জন্য চীন সফরের পরিকল্পনা নেওয়া অনেকে ফ্লাইট ও হোটেল বুকিং বাতিল করছেন। চীনা লুনার ইয়ার উপলক্ষ্যে প্রতি বছরই এই সময়ে পর্যটনমুখর থাকে চীনের হোটেল আর পর্যটনকেন্দ্রগুলো। পরিবারের টানে দেশে ফেরেন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা চীনা নাগরিকেরা। যাত্রীসেবায় ব্যস্ত থাকে এয়ারলাইনসগুলো। কিন্তু এ বছরের চিত্র পুরোটাই ভিন্ন।

নববর্ষের উত্সব-আনন্দ মাটি হয়ে গেছে অনেক আগেই। ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের হুবাই প্রদেশে এখন এক ভূতুড়ে পরিবেশ। নববর্ষে কয়েক লাখ পর্যটক চীন ভ্রমণ করেন। চায়না সাউদার্ন চায়না ইস্টার্ন ও চায়না এয়ার প্রধানত যাত্রীদের অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে সেবা দিয়ে থাকে। আর চীনের বৃহত্তম অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি ট্রিপ ডটকম হোটেল ও পরিবহনসেবা দিয়ে থাকে। ট্রিপ ডটকমের মুখপত্র বলছে, পরিস্থিতির কারণে তারা পূর্বনির্ধারিত হোটেল বুকিং এবং অভ্যন্তরীণ পরিবহনের টিকিট বুকিং বাতিলের জরিমানা মওকুফ করতে বাধ্য হচ্ছে। ঘটনার ভয়াবহতায় বিভিন্ন এয়ারলাইনসের শেয়ারের দরেও পতন শুরু হয়েছে বলে রিপোর্ট আসছে। রিপোর্ট বলছে, চীনের অর্থনীতির ১১ শতাংশ পর্যটননির্ভর। এ খাতকে ঘিরে ২ কোটি ৮০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স আর স্পেনের পর বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম পর্যটনবান্ধব দেশ চীন। ২০১৮ সালে দেশটিতে পর্যটক গেছেন ৬ কোটি। ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না এলে তা দেশটির অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা। এর আগে ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাসের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে ৪ হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছিল। তাছাড়া বাংলাদেশের মোট পর্যটকের ১৯ শতাংশ আসে চীন থেকে, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে যা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। চীনের পর ভারত, নেপাল, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি পর্যটক আসে। কিন্তু বিভিন্ন দেশ ভ্রমণে সতর্কতা জারি করায় পর্যটন খাত ধারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে করোনা ভাইরাসের কারণে পর্যটনেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করছে। এর আগে ২০০২ ও ২০০৪ সালে সার্স ভাইরাসের আক্রমণের সময় চীনে জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ২৫ শতাংশ কমে যায়। একই সময়ে হংকংয়ে জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ৪১ শতাংশ হ্রাস পায়। সিঙ্গাপুরের পর্যটন খাতে প্রবৃদ্ধি কমে যায় প্রায় ২৫ শতাংশ। এবারের করোনা ভাইরাসের প্রভাবে চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশে পর্যটনে ধস নেমেছে, যা আগেরবারের চেয়ে আরো বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে থাইল্যান্ডের প্রায় ১০৯ বিলিয়ন থাই বাথ লোকসানের মুখে পড়েছে করোনা ভাইরাসের কারণে। জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া চীনের লোনার নববর্ষ উদ্যাপনের সময় থেকে এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ পর্যটনে লোকসানের সম্মুখীন হয়। ইন্দোনেশিয়া জানিয়েছে, করোনা ভাইরাসের কারণে দেশটির ৪ বিলিয়ন বাণিজ্যিক ক্ষতি বা লোকসান হয়েছে।

অন্যদিকে অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চীনের পর্যটন ক্ষতির কারণে ২০২০ সালের প্রথম চার মাসের বিশ্ব সেবা খাতে আয় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর ফ্লাইট বন্ধ থাকায় বড়ো ধরনের লোকসানের হিসাব কষছে। সব মিলিয়ে বিশ্ব পর্যটনশিল্পে বড়ো ধরনের একটি বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বিশ্ব পর্যটন খাত বিভিন্ন সময়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে। এর আগে ৯/১১-এ যুক্তরাষ্ট্রে হামলার পর সারা বিশ্বে দারুণ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। তবে ধারণা করা হচ্ছে, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে তা এইবার আরো তীব্রতর হবে।

বাংলাদেশের পর্যটন খাতেও করোনা ভাইরাসের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ২০১৬ সালে গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার কারণে পর্যটনশিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এবার বিশ্ব জুড়ে চলা পর্যটন ভাটার কারণে ইতিমধ্যে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বাংলাদেশও। অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে ঘুরতে আসেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। কিন্তু এ বছর প্রথম থেকেই বিভিন্ন দেশের পর্যটকেরা তাদের বুকিং বাতিল করছেন। বাতিল করছেন ফ্লাইটও। করোনা আতঙ্কে বাংলাদেশেও আসছেন না অনেকে। দেশের পর্যটন খাতের একটি বড়ো অংশ আছেন চীনা নাগরিকেরা। এবার তারাও আসতে পারছেন না। তাছাড়া দেশীয় ও অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যাও করোনা ভাইরাসের প্রভাবে দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে, যা পর্যটনসংশ্লিষ্ট সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে, যার প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বিদেশ থেকে পর্যটক আসা যেমন কমেছে, তেমনি কমেছে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া পর্যটকের সংখ্যাও। অনেক পর্যটক তাদের পূর্বনির্ধারিত বুকিং বাতিল করেছেন। এতে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বর্তমানে পৃথিবীর অ্যাভিয়েশন খাতে বহু যাত্রী কমে গেছে। বাংলাদেশ বিমান ১০টি রুটে তাদের ফ্লাইটের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে। কুয়ালালামপুর, কাঠমান্ডু, কলকাতা, দিল্লি, ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর, দোহা, জেদ্দা, মদিনা, কুয়েত রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে; যা আরো তীব্রতর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া পর্যটনসংশ্লিষ্ট সব ধরনের ব্যবসায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে করে সামগ্রিক অর্থনীতি যেমন বাধাগ্রস্ত হবে, ঠিক তেমনি বাধার মুখে পড়বে কর্মসংস্থানের সুযোগ।

%d bloggers like this: