ভ্রমণ ভিসা উন্মুক্ত করল সংযুক্ত আরব আমিরাত

করোনার সম্পূর্ণ ডোজ টিকা গ্রহণ করার শর্তে পর্যটক ভিসা উন্মুক্ত করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। আজ সোমবার থেকে শর্তসাপেক্ষে ভিসা উন্মুক্ত করেছে দেশটি।

এর আগে গত শনিবার আরব আমিরাতে ভ্রমণের বিষয়ে ফেডারেল অথরিটি ফর আইডেন্টিটি অ্যান্ড সিটিজেনশিপ (ICA) ও ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ক্রাইসিস অ্যান্ড ডিজাস্টারস ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (NCEMA) যৌথ বিবৃতি দেয়।

তারা জানায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভ্রমণে আগ্রহী সকল যাত্রীদেরকে স্বাগতম। পর্যটকদের মধ্যে যারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের উভয় ডোজ গ্রহণ করেছে তারা আগামী ৩০ আগস্ট থেকে আরব আমিরাতে ভ্রমণ করতে পারবেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, যে সকল যাত্রী ভ্রমণ ভিসা নিয়ে আরব আমিরাতে অবস্থান করছেন তারা তাদের টিকা সনদ আলহসন অ্যাপে নিবন্ধন করতে পারবেন এবং তারা আরব আমিরাতে টিকা গ্রহণকারীদের মতো একই সুবিধা পাবেন।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সঙ্গে আরব আমিরাতের ফ্লাইট যোগাযোগ স্বাভাবিক হওয়ার পর ভ্রমণ ভিসার সুবিধা পাবে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ থেকে যাত্রী পরিবহন করবে না এমিরেটস

বাংলাদেশ থেকে যাত্রী পরিবহন করবে না এমিরেটস

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিমান পরিবহন সংস্থা এমিরেটস বলেছে, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, ভিয়েতনাম, জাম্বিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে বর্তমানে শেষ গন্তব্য হিসেবে দুবাইগামী যাত্রীদের পরিবহন করা সম্ভব নয়। এসব দেশের বিমানবন্দরে করোনাভাইরাসের আরটি পিসিআর পরীক্ষার সুবিধা না থাকায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে এমিরেটস।

আমিরাতের এই বিমান পরিবহনসংস্থার ওয়েবসাইটে ভ্রমণবিষয়ক হালনাগাদ তথ্যে বলা হয়েছে, বিমানবন্দরে আরটি পিসিআর পরীক্ষা সুবিধা না থাকায় বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, ভিয়েতনাম, জাম্বিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে শেষ গন্তব্য হিসেবে দুবাই ভ্রমণকারী যাত্রীদের পরিবহন সম্ভব নয়।

আমিরাতের ইংরেজি দৈনিক খালিজ টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ওই পাঁচ দেশের সব বাসিন্দাই দুবাই ভ্রমণের অনুমতি পাবেন যদি তারা কোভিড -১৯ পরীক্ষার প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণ করতে পারেন।’

ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া দেশগুলো থেকে যাত্রীদের দুবাইয়ের উদ্দেশে যাত্রা শুরুর ছয় ঘণ্টা আগে আরটিপিসিআর পরীক্ষা করার শর্ত রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশসহ ওই পাঁচ দেশের বিমানবন্দরে আরটিপিসিআর পরীক্ষা সুবিধা না থাকায় যাত্রীদের দুবাইয়ে পরিবহন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এমিরেটস।

স্মার্ট ট্রাভেলসের অপারেশনস ম্যানেজার মালিক বেদেকার খালিজ টাইমসকে বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে দুবাই ভ্রমণের প্রচুর চাহিদা রয়েছে।

তিনি বলেন, তবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ভ্রমণকারী এবং পর্যটক ভিসাধারীদের জন্য আমিরাতের স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রক্রিয়া পরিষ্কার নয়। এয়ারলাইন্স কোম্পানিগুলো এই নিয়ম স্পষ্ট করলে, বিমানের ভাড়া আবারও বাড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। এদিকে, এমিরেটস এয়ারলাইন্সের বরাত দিয়ে গালফ নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সব ট্রানজিট যাত্রীকে তাদের শেষ গন্তব্য দুবাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে।

ট্রানজিট যাত্রীদের দেশ ছাড়ার ৭২ ঘণ্টা আগে অবশ্যই করোনার আরটিপিসিআর পরীক্ষার নেগেটিভ সনদ প্রদর্শন করতে হবে। যেসব দেশের যাত্রীদের এই সনদ দেখাতে হবে, সেসব দেশ হলো: বাংলাদেশ, ভারত, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, উগান্ডা, ভিয়েতনাম, জাম্বিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া।

নালিতাবাড়িতে বিলুপ্তির পথে বজেন্দ্র বর্মনের বকপাখির অভয়াশ্রম

শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে বজেন্দ্র চন্দ্র বর্মনের বাড়ির বকপাখির অভয়াশ্রমটি আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। পরিচর্চা, সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দিনে দিনে হারিয়ে যেতে বসেছে পাখির অভয়াশ্রমটি। এ অভয়াশ্রমটি হচ্ছে, নালিতাবাড়ী উপজেলার বাঘবেড় গ্রামে।

নালিতাবাড়ী উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে বাঘবের ইউনিয়নে বজেন্দ্র চন্দ্র বর্মনের বাড়িতে এ বকপাখির অভয়াশ্রমটি। শেরপুর জেলা সদর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরে। জানা গেছে, দেশ স্বাধীনের পূর্ব থেকেই বজেন্দ্র চন্দ্র বর্মনের বাড়িতে বক পাখির এ অভয়াশ্রমটি গড়ে উঠে।

শতশত বক পাখি তাঁর বাড়ির বাঁশ ঝাড়ে অবস্থান করে। শুধু বক পাখিই নয়। বকপাখির পাশাপাশি অন্যান্য পাখিও ছিল এ অভয়াশ্রমে। এক সময় এসব পাখির কলকাকলীতে বজেন্দ্র চন্দ্র বর্মনের বাড়ি ও চারপাশ মুখরিত হয়ে উঠতো।

এসব পাখির অভয়ারণ্য দেখতে প্রতিদিন বহু দূর দুরান্ত থেকে শতশত মানুষের ভিড় জমে উঠতো ওই বাড়িতে। বজেন্দ্র চন্দ্র বর্মন বক পাখিগুলোকে নিজে পরিচর্চা করতেন। বকগুলো তার ঘরে নেমে এসেও আহার করতো। বজেন্দ্র চন্দ্র বর্মনের ইশারায় তার শরীরে এসে বসতো বক পাখিগুলো। তখন থেকেই বজেন্দ্র চন্দ্র বর্মনের বাড়িটি বক বাড়ি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

বছর কয়েক আগে বজেন্দ্র চন্দ্র বর্মনের মৃত্য হয়। তিনি মারা যাওয়ার পর থেকেই বিপর্যয়ের মুখে পরে পাখিগুলো। বর্তমানে বজেন্দ্র চন্দ্র বর্মনের ছেলে-মেয়ে নাতি নাতনীরা পরিচর্চা ও দেখাশুনা করলেও তা বজেন্দ্র বর্মনের সমতুল্য নয়। ফলে পরিচর্চা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও পাখি শিকারীদের অত্যাচারে দিনে দিনে বকগুলো এখন প্রায় বিলপ্তির পথে।

বজেন্দ্র চন্দ্র বর্মনের ছেলে সতিন্দ্র চন্দ্র বর্মন বলেন, তারা সংখ্যালঘু হওয়ায় প্রতিবেশিরা অনেকেই তাদের কথা কর্ণপাত করেন না। তারা রাতের আধারে বাঁশ ঝাড়ে উঠে পাখিগুলোকে ধরে নিয়ে যায়। কাউকে কিছু বলতে গেলে শিকারীরা উল্টো তাদের উপর চড়াও হয়।

বজেন্দ্র চন্দ্র বর্মনের ছেলে সুকেন্দ্র চন্দ্র বর্মন বলেন, পাখির অবস্থান ও পদচারণার কারণে তাদের বাঁশ ঝাড়টি বেড়ে উঠতে পারছে না। এতে বর্তমানে যে পরিমানে পাখি রয়েছে তার অবস্থানের ক্ষেত্রে স্থান সংকুলান হয়ে উঠছে না।

তিনি বলেন, এখনও যে পরিমানের পাখি রয়েছে তা দেখার জন্য প্রতিদিন লোকজন ভিড় করে। বজেন্দ্র চন্দ্র বর্মনের ছেলে রমেশ চন্দ্র বর্মন জানান, বর্তমানে যে পরিমানের বক পাখি রয়েছে সরকারিভাবে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে এখনও অভয়াশ্রমটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব। বকগুলো আহার করতে গেলে আশপাশের শিকারীরা ধরে নিয়ে যায়।

আবার রাতের অন্ধকারে প্রতিবেশিরা বাঁশ ঝাড়ে উঠে ধরে নিয়ে যায়। তার মতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বকপাখির অভয়াশ্রমটি রক্ষার পাশাপাশি আরো বৃদ্ধি করাও সম্ভব। তিনি বলেন, পাখির অভয়াশ্রমটি টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আশ্বাসও পাওয়া গেছে। কিন্ত কোনই কাজে আসেনি।

ক্রাবির সর্বোচ্চ মন্দির টাইগার হিলে

ক্রাবির সর্বোচ্চ মন্দির টাইগার হিলে

ফিফি আইল্যান্ড থেকে আমাদের গন্তব্য ক্রাবিতে। ফেরিতে চড়ে আন্দামান সমুদ্রের প্রায় ৪১ কিলোমিটার পথ পাড়ি সেখানে যেতে হবে। সকাল ৯টায় আমি এবং হাসান দু‘জন ফেরিতে উঠলাম। আমাদের মতো বিভিন্ন দেশের শতাধিক পর্যটক আছেন এই ফেরিতে। নীল পানির বুক চিড়ে ফেরি চলছে।

মাঝে মাঝে দেখা মিললো সমুদ্রের মধ্যে জেগে উঠা ছোট ছোট পাহাড়ের দ্বীপ। আমি আর হাসান ফেরির ছাদে দাঁড়িয়ে অবাক বিস্ময়ে দেখছি সমুদ্র ও পাহাড়ের অপরূপ দৃশ্য। চোখ জোড়ানো এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যে আমরা ক্রাবি ফেরিঘাটে পৌছে গেলাম টেরই পেলাম না।

ফেরি থেকে নেমে হাসান তার লাগেজ আমার কাছে রেখে বলল, ‘তুই দাঁড়া আমি একটু বাথরুম থেকে আসি।’

বেশি দেরি করিস না বলে আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। ফিরে আসার পর হাসানের হাসিমাখা মুখ দেখে বললাম, ‘কিরে হঠাৎ তোর মুখে আলোর ঝলকানি। ব্যাপার কী?’

হাসান বলল, ‘টাকা লাগেনি। তাই দুটোই একসাথে সেরে এসেছি। থাইল্যান্ডে এমন সুবিধা আর কোথাও মিলবে না। তুইও সেরে আস।’

থাইল্যান্ডের মাটিতে ফ্রি কোনো কিছু পাওয়া যায় না। তাই প্রয়োজন না সত্ত্বেও আমিও ঘুরে আসলাম।

ফেরিঘাট থেকে আমাদের হোটেল বেশি দূরে নয়। কিন্তু অচেনা দেশে রিকশা না নিয়ে ফিক্সড ভাড়ায় ট্যাক্সি ভাড়া নিলাম। মিনিট দশেকের মধ্যে আমারা পৌঁছে গেলাম অনলাইনে বুকিং দেয়া ‘ডি আন্দামান হোটেলে’। চেক ইনের সময়ের আগেই চলে আসায় আমরা রুম পেলাম না। হোটেল কর্তৃপক্ষকের পরামর্শে আমরা লবিতে ব্যাগ রেখে চলে গেলাম সুইমিং পুলে। আমি পুলের পাশে রাখা চেয়ারে গা হেলান দিলাম।

হাসান পানিতে নেমে বলল, তুই নবাবের মতো শুয়ে আছিস। এত সুন্দর সুইমিং পুল! তুই নামবি না?

সাগরে সাঁতার কাটার পর সুইমিং পুল আমাকে আকর্ষণ করছে না। বললাম আমি।

হাসান একা একা কতক্ষণ সাঁতার কেটে ক্লান্ত হয়ে উঠে এলো। ততক্ষণে হোটেলে রুম পাওয়ার সময় হয়ে গেছে। দু‘জন লবি থেকে ব্যাগ নিয়ে রুমে চলে গেলাম। রুমের ইর্নেরিয়র রীতিমতো টাসকি খাওয়ার মতো। কাঠের দরজা-জানালা, খাট-পালংক, আলমারি সব কিছুতে একটা বাদশাহী ভাব। মনে হলো তুরস্কের সুলতান সোলেইমানের কোনো বিলাসী কক্ষ।

হোটেল থেকে বের হয়েই হাসান বলল, ‘চল আশপাশে কোথাও খেয়ে নেই।’

মিনিট দশেক হাঁটার পর ‘পিয়ারলি অহ বিস্ত্র’ নামের একটি রেস্টুরেন্ট চোখে পড়ল। দু‘জন সেখানে গিয়ে বসলাম। রেস্টুরেন্টটি ছোট হলে বেশ নান্দনিকভাবে সাজানো। ম্যানু হাতে এগিয়ে এলো এক সুন্দরী তরুণী। কোমর পর্যন্ত কালো কেশ, মিষ্টি ও বিনয়ী হাসি দেখে আমরা মুগ্ধ হয়ে গেলাম।

দু‘জনেই ফ্রাইড রাইস এবং সি-ফুডের অর্ডার দিলাম। বেশ আন্তরিকতার সাথে তরুণী খাবার পরিবেশন করল। কথা বলে জানতে পারলাম তার ডাক নাম পিয়ার। এমবিএ শেষ করে সে এই দোকান পরিচালনা করছে।

হাসান ফেরিঘাট থেকে ফেরার পথে চালকের ফোন নম্বর সেভ করে রেখেছিল। খাবার শেষ হওয়ার পর সে চালককে ফোন দিল।

কিছুক্ষণের মধ্যে চালক হোটেলে হাজির। তাকে সব বুঝিয়ে বলার পর তিনি জানালেন, ‘এই সময়ে শহরের কিছু দর্শনীয় স্থান দেখতে পারবেন। আর ক্রাবির আকর্ষণীয় টাইগার মন্দির না দেখলে ক্রাবি আসা বৃথা।’

আমরা বললাম, ‘আগে টাইগার হিলে নিয়ে চলেন। তারপর অন্য জায়গায় ঘুরব।’

গাড়ি আমাদের নিয়ে চলছে টাইগার হিলের দিকে। জানালা দিয়ে আমরা একপলকে শহর দেখা নিলাম। ফুকেটের চেয়ে বেশ শান্ত এই শহর। নেই কোনো কোলাহল ও যানজট। গাড়ি গিয়ে থামল মন্দিরে কাছে।

চালক বললেন, ‘আপনাদের ফিরে আসতে আড়াই তিন ঘণ্টা সময় লাগবে। আমি এখানেই অপেক্ষা করব।’

টাইগার কেইভ টেমপেল মাউটেন্ট যা টাইগার হিল মন্দির নামে পরিচিত। সমতল ভূমি থেকে ৩০৯ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট এ মন্দিরের আরোহণ করতে হলে ৬০০ মিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। আর ১২,৬০টি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হবে মূল মন্দিরে। এ তথ্য জানার পর অনেক পর্যটক নিচ থেকেই ঘুরে চলে যান। আমি এবং হাসান দু‘জনই সিদ্ধান্ত নিলাম যত কষ্টই হোক মন্দিরের চূড়ায় উঠব।

সাহস সঞ্চয়ের জন্য প্রথমে দু‘জনে মূল মন্দিরের নিচে ছোট ছোট মিন্দরগুলো দেখে নিলাম। তারপর এক বোতল পানি কিনে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠা শুরু করলাম। প্রথম দিকে দু‘জনে গুনে গুনে সিঁড়ি পার হচ্ছি। কয়েক‘শ সিঁড়ি আরোহণের পর কারও মুখ দিয়ে আর কথা বের হচ্ছিল না। এই পথেই অনেক পর্যটক উপর থেকে নেমে আসছেন। তাদের চেহারায় মাউন্টেন এভারেস্ট জয়ের হাসি। আমি একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম কর কতদূর? সে হেসে উত্তর দিলো, ‘সবে তো শুরু। আরও বহুপথ পাড়ি দিতে হবে।’

খাঁড়া সিঁড়ি বেয়ে চলতে গিয়ে দু‘জনের শরীর দিয়ে ঘাম ঝরছে। কয়েক দফা বিরতি নিয়ে আমরা পৌঁছলাম মাঝপথে। সাথে থাকা পানিও প্রায় শেষ। সিঁড়ি বেয়ে উঠার পথে পাহাড়ের ওপর বৌদ্ধমূর্তির দেখা পেলাম। দু‘জন একের পর এক সিঁড়ি বেয়ে চলছি। ঘামে আমাদের টি-শার্ট ভিজে একাকার। দু‘জন টি-শার্ট খুলে কাঁধে রেখে আবার চলা শুরু করলাম। বড় বিপদে পড়েও কখনো আমার হাঁটু কাঁপেনি। কিন্তু এক হাজার সিঁড়ি উঠার পর আমার দু‘হাঁটু কাঁপতে শুরু করল। হাঁটুতে কোনো বল পাচ্ছিলাম না। তাই এক হাত সিঁড়ির র‌্যালিংয়ে আর অন্য হাত হাঁটুতে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে পা থেকে হাঁটু খুলে পড়ে যাবে। হাসানের মুখেও কোনো হাসি নেই। আমাদের এ অবস্থা দেখে এই পথে ফিরে আসা পর্যটকরা বললেন, ‘তোমরা প্রায় এসে গেছ। আর একটু কষ্ট কর।’

শরীর যখন প্রায় শক্তিশূন্য তখন পৌঁছলাম পাহাড়ের চূড়ার মূল মন্দিরে। হাসান ব্যাগ রেখেই মন্দিরের পাশে রাখা একটা কাঠের বেঞ্চিতে শুয়ে পড়ল। আমি পাশে বসে হা করে নি:শ্বাস নিচ্ছি।

একটু পর লক্ষ্য করলাম হাসান প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছে। যেখানে সেখানে ঘুমের জন্য হাসানের বেশ খ্যাতি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ক্লাসেই সে শেষের বঞ্চে শুয়ে ঘুমিয়ে যেত।

আমি হাসানকে ডেকে তুলে বললাম, ‘এখানে বিনামূল্যে খাবার পানির ব্যবস্থা আছে। হাতমুখ ধুয়ে গলা ভিজিয়ে নেই।’

হাসানের সাথে আমিও তৃষ্ণা মিটিয়ে নিলাম। মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষায় দু‘জনেই জুতো খুলে মন্দিরে প্রবেশ করলাম। এটি সম্ভবত ক্রাবির সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থিত কোন মন্দির। এখান থেকে গোটা ক্রাবি শহরকে ছবির মতো দেখা যাচ্ছে। দূরের পাহাড়গুলোকে মনে হচ্ছে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আমাদের চোখের সামনে দূর দিগন্তে সূর্য পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে গেল। এ চূড়ায় মূলত গৌতম বৌদ্ধের বিশালাকৃতি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। পুরো মন্দিরে রয়েছে ছোট-বড় আরও বেশ কিছু মূর্তি। আমি এবং হাসান স্বল্প সময়ে মন্দিরের প্রায় সব অংশ বিচরণ করলাম।

এবার নামার পালা। উচ্চতার কথা চিন্তা করতেই দু‘জনের গলা শুকিয়ে গেল। খাঁড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠার চেয়ে নামা অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ। দু‘জনেই বেশ সাবধানে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসলাম। এভারেস্ট জয়ের মতো আনন্দে আমাদের ক্লান্তি অনেকটা কমে গেল। চালক তখন আমাদের অপেক্ষায় ছিল। গাড়িতে চড়ে তাকে বললাম নতুন কোথাও নিয়ে যেতে।

গোধুলীর আলোতে গাড়ি ছুটে চলছে। চালক আমাদের নিয়ে দাঁড়ালেন ভিউ পয়েন্ট নামে একটি দর্শনীয় স্থানে। ক্রাবি শহরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদীর বুকে জেগে উঠা দুটি পাহাড় মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে থাকার অপরূপ দৃশ্য এখান থেকে উপভোগ করা যায়। পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য এখানে রয়েছে গ্রাউন্ড ব্ল্যাক ক্রাব বা ধাতবের তৈরি বৃহদাকৃতির কাঁকড়া। আছে ঈগলের বিশাল স্ট্যাচু। ঈগলের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার ক্ষেত্রে হাসান কোন অনুভূতি প্রকাশ করল না। তবে কাঁকড়ার সাথে বিভিন্ন ভঙ্গিতে ছবি তুলতে তুলতে সে বলল, ‘জীবনে কাঁকড়ার অনেক চিমটি খেয়েছি। আজ ছবি তুলে উসুল করে নিলাম।’

আমি বললাম, ‘সিঁড়ি বেয়ে ক্ষুধা লেগেছে চল কোথাও খেয়ে নেই।’

হাসান বলল, ‘ক্রাবিতে খেতে হলে পিয়ারের এখানেই খাবো।’

খাবারের অজুহাতে এমন সুন্দরীর দেখা পাওয়া মন্দ নয়। আমিও কোনো আপত্তি করলাম না।

দ্বিতীয় দফায় আমাদের দেখে পিয়ার বেশ আনন্দিত হলো। সে বলল, ‘তোমরা চাইলে কাঁকড়া দিয়ে তৈরি এখানকার জনপ্রিয় খাবার পরিবেশন করতে পারি।’

দু‘জনেই হাসি দিয়ে জানিয়ে দিলাম আমরা রাজি।

পিয়ার জানতে চাইলো সিদ্ধ নাকি টাটকা?

ওরে বাবা। জ্যান্ত কাঁকড়া খাবো নাকি? আমাদের উল্টো খেয়ে ফেলবে। তুমি সিদ্ধ করেই দাও। আমি বললাম।

তাই হবে বলে হেসে কিচেনে চলে গেল পিয়ার। কিছুক্ষণ পর পেঁয়াজ কাঁচামরিচসহ খুব সুন্দরভাবে সে খাবার পরিবেশন করল। বরাবরের মতোই হাসান মুখে দিয়েই বলল আহা।

আমিও খেয়ে দেখলাম বেশ সুস্বাদুই হয়েছে। বেশ আয়েশ করে দু‘জন কাঁকড়া ভোজন করলাম। বিল পরিশোধের পর বিদায় নেয়ার পালা। পিয়ার বেশ উৎসাহ নিয়ে আমাদের সাথে ছবি তুলল। আমরা বিদায় নিয়ে চলে আসলাম।

রাত প্রায় ৮টা। চালককে নতুন কোথাও নিয়ে যেতে বললাম। তিনি আমাদের ক্রাবি কালচারাল ওয়াকিং স্ট্রিটে নিয়ে আসলেন। সড়কের দু‘পাশে পসরা করে সাজানো বিভিন্ন খাবারের দোকান। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। একটা জায়গায় মঞ্চ বানিয়ে তাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে। আমি এবং হাসান সেখানে বসে স্থানীয় এক শিল্পীর গান উপভোগ করলাম। সকালে আমাদের ব্যাংকক যাওয়ার ফ্লাইট। তাই ফিরে আসতে হলো হোটেলে। ক্রাবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য এখানে একটু রাত হলেই নীরবতা নেমে আসে। শান্ত এই নগরী বলতে গেলে অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়ে।

হাতির মায়ায় পাবলাখালি রিজার্ভ ফরেস্টে

 

হাতির মায়ায় পাবলাখালি রিজার্ভ ফরেস্টে

চারদিক সুনসান। একটানা ডেকে চলা ঝিঝির ডাক আর থেকে থেকে নাম না জানা পাখির কুজন, এছাড়া আর কোনো শব্দের অস্তিত্ব নেই। জনমানুষ তো দূরের কথা, কোনো পশুপাখির ছায়া পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।

আকাশছোঁয়া গাছগুলো তাদের পত্র-পল্লবে আকাশকে এমনভাবে ঢেকে রেখেছে যেন আমাদের নজর লেগে আকাশের সর্দি লেগে যাবে। সুর্যদেবও পাতার বেষ্টনী পাড়ি দিয়ে আসতে বোধহয় সাহস করছেন না। আধো আলো আর আধো অন্ধকারের এই সুনসান পরিবেশে আমরা এগিয়ে চলেছি ১২ জন পাবলাখালি বনের মধ্য দিয়ে। মনে অজানা ভয় কখন কি হয়। মাঝে মাঝে তো নিজের নিশ্বাসটাকেই বড় ভয় হচ্ছে। চারদিকে কেমন একটা গা ছমছমে অনূভুতি। কখন জানি হাতির পালের সামনে পড়তে হয়।

পাবলাখালি আসার মূল উদ্দেশ্য হাতি দেখা। হাতি মানে পালা হাতি নয়, রীতিমতো তাণ্ডব চালানো একপাল বুনোহাতি। সামনে পড়লে আর রক্ষা নেই। কী পরিমাণ তাণ্ডব চালাতে পারে তার কিছুটা নমুনা কিছুক্ষণ আগে পরিলক্ষিত করে এসেছি নদীর ঘাটের কাছের এক বাংলোর বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে।

আমরা আপাতত এসেছি মাইনি মুখ থেকে। দুই দিন আগে ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে রাঙামাটি হয়ে ট্রলারে ছুটেছিলাম কর্ণফুলীর উৎসমুখের সন্ধানে। কাপ্তাই লেক পাড়ি দিয়ে হরিণা আর কাট্টলি বিল হয়ে লংগদু দিয়ে সড়ক পথে গতকাল সন্ধ্যায়ই পৌঁছেছি মাইনিতে, যেখানে অপরূপ রূপসী মাইনি নদী মিলিত হয়েছে কাপ্তাই লেকে। মাইনি ঘাট, কাপ্তাই লেকের মাছ ব্যবসায়ীদের হাব বলা চলে। এখান থেকে সারা দেশে কাপ্তাই লেকের মাছ পৌঁছে দেয়া হয়। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভয় আর বন্যপ্রাণীর হামলার ভয় মাথায় নিয়েও রাতের ঘুমটা বেশ ভালোই দিয়েছি।

ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাকীবিল্লাহ ভাই আর ওসমান ভাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম মাইনি ঘুরে দেখতে। মেঠোপথ ধরে কখনও হালকা চড়াই আবার কখনো ছোট ছোট উতরাই, তিন দিকে কাপ্তাই লেক আর মাইনি নদী, সব মিলিয়ে যেন কোনো স্বর্গোদ্যানে এসে পৌঁছেছি। মাঝে মাঝেই চোখ কচলে দেখে নিচ্ছি স্বপ্ন দেখছি না তো। না স্বপ্ন না, আমার সোনার দেশের এই অপরূপ রূপে আবার মুগ্ধ না হয়ে পারলাম না। ভোরের হালকা শীতে হাঁটতে বেশ ভালোই লাগছিল আর সাথে থেমে থেমে ক্যামেরার ক্লিক তো চলছিলই। পাশের বিজিবি ক্যাম্পের জাওয়ানরা এই ভোরবেলাতেই মর্নিং ড্রিলে বেড়িয়েছে। সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি আর সাদা হাফ প্যান্টে সারি বেধে তাদের ড্রিল মুগ্ধতা ছড়ালো আরেকবার। মাইনি বিজিবি ক্যাম্পটা একেবারে লেকের গা ঘেঁষে তৈরি।

ছোট্ট একটা টিলার উপর অপরূপ নৈসর্গিক পরিবেশ চারদিকে। হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম রাবেতা এ ইসলামীর হাসপাতালে। আমাদের দলের কয়েকজনের রাতের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল এখানে। মাইনিতে আসলে থাকার সেইরকম ভালো কোনো হোটেল নেই। দুই-তিনটা ছোট বোডিংয়ের মতো রয়েছে আর বন বিভাগের বাংলো বন বিশ্রাম। রাবেতা হাসপাতালের পিছন দিকেই রেস্ট হাউস। লাল টালির দুইতলা রেস্ট হাউসটাও অসম্ভব সুন্দর লোকেশনে অবস্থিত। তিন দিকেই কাপ্তাই লেক আর মাইনি নদী আর বিভিন্ন ধরনের গাছপালা চারদিকটাকে আরো মোহনীয় করে তুলেছে। রেস্ট হাউসের ব্যাক ইয়ার্ডে একটা শিউলি তলা ফুলে ফুলে বিছিয়ে আছে। কাঠগোলাপ তলায় বিছিয়ে থাকা সাদা কাঠ গোলাপ মনে পড়িয়ে দিল সেই বিখ্যাত গান “কাঠ গোলাপের সাদার মায়ায়”।

আমাদের হাঁকডাকে রোমেল আর আরাফসহ বাকিরা দ্রুতই শয্যা ছাড়ল। সবাই মিলে রেস্ট হাউসের ছাদে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে এখানকার ম্যানাজারের সাথে এখানকার ব্যাবস্থাপনা নিয়ে হালকা আলাপ সেরে পাশের ছোট টং দোকানে চা নিয়ে বসলাম। নিজেদের বাল্যকাল ফিরিয়ে আনতেই কিনা আরাফ ব্যাস্ত হয়ে পড়লো বনরুটি কেটে তার মধ্যে কনডেন্সড মিল্ক ঢেলে বাটারবন বানাতে। খেতে অবশ্য খুব খারাপ লাগলো না। খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে ইঞ্জিন নৌকায় মাইনী নদী পাড়ি দিয়ে আবার ফিরে আসলাম আমাদের আপাত বাসস্থান মাইনি মুখ রিজার্ভ ফরেস্টের বন বাংলোয়। এতক্ষণে সকালের ব্রেকফাস্ট তৈরি হয়ে গিয়েছে। খিচুড়ি ডিম ভাজা আর আলুর ভর্তা দিয়ে ভরপেট খেয়ে আর এক কাপ চা নিয়ে লেকের পাড়ের বারান্দায় বসে সকালের রোদ উপভোগ, এর চেয়ে অপার্থিব আর কি হতে পারে।

জীবনে সুখী হতে খুব বেশি কিছু কি লাগে। তন্ময় হয়ে উপভোগ করলাম কাপ্তাই লেকের সৌন্দর্য, কোথায় পড়ে রইলো ট্র্যাফিক জ্যামে ক্লিষ্ট নগর জীবন। এভাবে কতক্ষণ কেটেছে জানিই না। রেস্ট হাউসের ম্যানেজারের ডাকে আবার বাস্তবে ফিরে এলাম, পাবলাখালি যাওয়ার ট্রলার রেডি। দেরি না করে পথে খাওয়ার জন্য কিছু রসদ নিয়ে রওনা হয়ে গেলাম। নিরপত্তার অজুহাতে তিনজন মাইনীতেই থেকে গেল। অবশ্য তাদের দোষও দিতেও পারি না। কাল রাতে রেস্ট হাউসের গানম্যান বিচ্ছিনতাবাদীদের নৃশিংষতার কথা জানালেন আর সাথে এও জানাতে ভুললেন না পাবলাখালি রিজার্ভ ফরেস্টে তাদের দলবদ্ধ অবস্থানের কথা। প্রাণের মায়া সবারই থাকে। সবাই তো আর আমার মতো উম্মত্ত ষাড়ের চোখে লাল কাপড় বাঁধতে ঘর ছাড়ে নাই। তার উপর রাতে এনএসআই থেকে ফোন আসায় অনেকেই আরো ঘাবড়ে গিয়ে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। আসলে এনএসআই থেকে আমার এক পূর্ব পরিচিত লোক ফোন করে খোঁজ নিয়েছিলেন আর কিছু সাবধানতা অবলম্বন করতে বলেছিলেন, তাতেই অনেকের সাহস উবে গিয়েছিল।

যাই হোক, আমাদের যাত্রা শুরু হলো কাপ্তাই লেকের বুক চিড়ে। বর্ষা শেষের কারণে এখনো পানি নেমে যায়নি। তার ওপর গত তিন দিনের টানা বর্ষণে লেকের পানি কিছুটা বেড়েছে। চারদিকে যেদিকে তাকাই শুধু পানি আর পানি, কোথাও পানির উপর কিছু গাছ মাথা তুলে আছে, কোথাওবা ঘড়ের টিনের চাল দেখা যাচ্ছে। আশেপাশে লোকালয়ের কোনো চিহ্ন নেই। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর লোকালয়ের দেখা মিললো। কয়েক ঘর পরিবার নিয়ে ছোট্ট গ্রাম। শহরের কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপের মত গ্রামের এক মাত্র যোগাযোগ ব্যাবস্থা নৌকা। লেকের পানিতে মাছ ধরে আর বনের কাঠ কেটেই তাদের জীবন চলে যায়। এই গ্রামের অধিকাংশ লোকই কখনও শহরের আলো দেখেনি। এখানেই জন্ম এখানেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ। আরো কিছুদূর এগিয়ে দেখা মিললো ঝাকে ঝাকে বকের। অনেকদিনপর এত বড় বকের ঝাক দেখলাম, কিছুদূর গিয়ে দেখা মিলল বালি হাস, পানকৌড়ি, চখা, মাছরাঙা, ঘুঘু, শালিক সহ আরো নাম না জানা পাখির।

পাখি দেখতে দেখতেই পৌঁছে গেলাম পাবলাখালি বাজারে। মনে পড়ে গেল বন বাংলোর ম্যানেজারের সতর্কবানী, বনের বেশি গভীরে যাওয়া যাবে না। পাবলাখালির কথা পরেছিলাম আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগে পত্রিকায় এক আর্টিকেলে। পাবলাখালি রিজার্ভ ফরেস্টের রহস্যময়তার কথা, পদে পদে বিপদের হাতছানি, শ্বাপদের হিংস্র দাতের করাল গ্রাস আর মানুষরূপী কিছু শ্বাপদের মুখ ব্যাদান আর সেই সাথে পাগলা হাতির কথা, মনের গভীর কোনে একটা আচড় কেটে রেখেছিল। এতগুলো বছর গেল কিন্তু সেই আচড়ের দাগ আজো মিটেনি। আজ বুঝি দাগ মেটানোর দিন। এর আগে অনেকবারই পাবলাখালি, মাইনি, লংদু, কাসালং আসার প্ল্যান করেছি কিন্তু কিছুতেই ব্যাটে বলে মিলছিল না।

ঘাটে নামতেই নৌকার মাঝির আরেকদফা সর্তকতা, কিছুতেই বনের গভীরে যাওয়া যাবে না। আমাদের সময় বেধে দিলেন তিন ঘন্টা, এর মধ্যেই ফিরে আসতে হবে। সময়ের বাধনে কি মনকে বেধে রাখা যায়। পরের চিন্তা পরে করা যাবে। দলবেধে হাটা শুরু করলাম মেঠো পথ দিয়ে। লেকের পার ধরেই আস্তে আস্তে চড়াই ভেঙ্গে চলে আসলাম পাবলাখালি রিজার্ভ ফরেস্টের বন বাংলোয়। ছোট্ট একটা টিলার উপর লেকের পাড়ে অসম্ভব সুন্দর এই বন বাংলো। একটা ছোট পেভমেন্টের উপর এই বাংলো। কিন্তু চার দিক সুনসান আশপাশে কোনো লোকজনের ছায়াও দেখা যাচ্ছে না। কী আর করা বাংলোর সামনের ঘাসের লনে বসেই কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিলাম। সেই সাথে গ্রুপ ফটো তোলার পালাও চুকালাম। বেশ কিছুক্ষণ পর দেখি সাত-আট বছরের এক বালক আরেক কিশোরের হাত ধরে মাটির রাস্তা দিয়ে এগিয়ে আসছে। কাছে ডাকলাম। জিজ্ঞেস করে জানা গেল, এ রাস্তা ধরে কিছুদুর এগিয়ে গেলেই একটা ছোট বাঙ্গালী পাড়া আছে, তারা সেই গ্রামের বাসিন্দা। আর গ্রামের পাশ দিয়েই বনে ঢোকার রাস্তা চলে গেছে। আমরা আর দেরি না করে দুই বালককে গাইড সাবস্ত্য করে অজানার পথে পা বাড়ালাম।

মাটির রাস্তা ধরে কিছুটা চড়াই পার হতেই দেখা মিলল বনের পথের। লোকালয় ছেড়ে পা বাড়ালাম বনের রাস্তা ধরে। চারদিকে নাম না জানা গাছের সারি। দলের এক বিজ্ঞ লোক মোবাইলের অ্যাপ বের করে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন গাছের নাম আর চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধারে। হায়রে প্রযুক্তি, ইট কাঠ পাথরের ক্লেদাক্ত পৃথিবী ছেড়ে লোকালয়ের মায়া মাড়িয়ে প্রযুক্তিকে ঝেড়ে ফেলে দুদণ্ড শান্তিতে থাকতে এসেছিলাম এখানে, কিন্তু প্রযুক্তি এখানেও পিছু ছাড়ছে না। যাই হোক প্রযুক্তিবিদের প্রযুক্তি গাছের ডালে বাড়ি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়লো, কারন নেটওয়ার্ক ছাড়া এইখানে প্রযুক্তি অচল।

এবার শান্তিতে বনের পথ পাড়ি দিতে থাকলাম। চারদিক কেমন একটা গা ছমছমে অনুভূতি। কেমন একটা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা অনুভূতি আর চারদিকে মাতাল করা কেমন একটা বুনো গন্ধ। সামনে এগিয়েই পাশে পেলাম কাপ্তাই লেকের একটা ক্ষুদ্র নালার মতো অংশ; যেটা অনেকক্ষণ আমাদের সঙ্গ দিল। আকাশছোঁয়া গাছগুলোর অধিকাংশেরই নাম জানি না, তবে একেকটা একেকরকম। সৌন্দর্যে কে কাকে ছাপিয়ে যাবে সেই প্রতিযোগিতা যেন চলছে। আর আমার অবস্থা যেন সৌন্দর্যগ্রস্ত বানপ্রস্থ সেই পথিকের ন্যায় যে সব হারিয়ে পথকেই বানিয়েছে তার ঠিকানা। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো সম্ভব না হলেও আপাতত পথকেই ঠিকানা বানিয়ে বনের পথ ধরে এগিয়ে চললাম। মনের মধ্যে অজানা ভয় কখন কী হয়। দলের কয়েকজন তো মতামত দিয়েই ফেললো আর বোধহয় সামনে আগোনো ঠিক হবে না। আশপাশে কোন জনমানুষের দেখা নাই। বিপদে পড়লে চিৎকার করলেও কেউ শুনবে না। দুর্বৃত্তের ভয় তো আছে, সেই সাথে কখন হাতির পালের সামনে পড়ি তার ঠিকানা নেই। পাবলাখালি নেমেই হাতির উন্মত্ততার যে নমুনা দেখে এসেছি তার রেশ মনে রয়ে গেছে এখনো। তাই আমার মনেও কু-ডাক ডেকে উঠলো। যতই প্রকৃতি প্রেমিক হই,নিজের জানের ভয় সবারই আছে। এর মধ্যে আমাদের দুই পথপ্রদর্শক ঘোষণা দিয়ে বসল এর আগে তারা আর কিছুতেই যাবে না। সামনে নাকি বিপদ হতে পারে। কী আর করা বাস্তবতার কাছে প্রেমকে জলাঞ্জলি দিয়ে ফিরতি পথ ধরলাম।

কুতুবদিয়া দ্বীপকে রক্ষা করছে ঝিনুকের বাঁধ

কুতুবদিয়া দ্বীপ ঝিনুকের বাঁধ

বাংলাদের দক্ষিণে কুতুবদিয়া দ্বীপকে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা থেকে রক্ষা করছে ঝিনুকের বাঁধ। এ দ্বীপটি অতি দ্রুত সাগরগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছিল। ফলে হাজার হাজার মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পড়ছিল। বলা হয়ে থাকে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তু হয়ে যাবে। মানচিত্র থেকে এ সময়ের মধ্যেই হারিয়ে যাওয়ার কথা ছিল কুতুবদিয়ার।

তীব্র ঢেউ এর মাঝেও কুতুবদিয়ায় এক নতুন আশা দেখা দিয়েছে। সেখানে ঢেউয়ের মাঝে সূর্যালোককে চুমু খাচ্ছে ঝিনুকে মোড়া প্রাচীর। এই প্রবাল প্রাচীরগুলো সাগরের প্রাণের এক স্বর্গে পরিণত হয়েছে।

সাগরতীরে এই ধরনের প্রাচীর ধারণা জন্ম নেয় ২০১২ সালে। সেসময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব মেরিন সায়েন্সের সদস্য ছিলেন মোহাম্মদ শাহ নেওয়াজ চৌধুরী। ধারণাটি ছিল খুব সহজ। ঝিনুকের প্রাচীর সাগরের ঢেউকে তীরে আঘাত হানার আগেই গতি কমিয়ে ভাঙন ঠেকাতে পারবে। এর আগে নেদারল্যান্ডে এই ধারণা কাজে এসছিল। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানায় এই সাফল্যের গল্প আছে।

তবে শাহ নেওয়াজ চৌধুরী আর তার দল নেদারল্যান্ডসের ওয়াগেনিনগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কাজ করে এই পদ্ধতিটিকে  ব্যাপক ব্যবহারের উপযোগী করে তুলেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন এই পদ্ধতি সাগর পাড়ের মানুষের জীবিকা নির্বাহ বাড়িয়ে তুলবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন এই ধরনের বাঁধ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা থেকে কুতুবদিয়া দ্বীপ রক্ষা করবে।

শাহ নেওয়াজ জানিয়েছেন বাংলাদেশের পরিস্থিতি নেদারল্যান্ড আর লুইজিয়ানার মতো সহজ ছিলো না। তিনি বলেন, ‘নদী প্রবাহের কারণে আমাদের প্রাকৃতিক লবণাক্ততা মোকাবিলা করতে হয়েছে। আমরা মোকাবিলা করেছি ঝড় ও বর্ষার প্রভাব।’

ঝিনুকের মাধ্যমে পরিবেশগত প্রকৌশল কি গতিশীল উপকূলরেখা রক্ষা করতে পারে? এটি অনুসন্ধান করতে পরবর্তী ৬ বছর, ৬০০ দিনের বেশি তিনি তার ২৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে কুতুবদিয়া দ্বীপে থেকে অনুসন্ধান করেছেন।

এই ধরনের বাস্তু প্রকৌশল প্রকৃতির কোনো ক্ষতি না করেই একটি জনপদকে রক্ষা করতে পারে। এত খরচও খুব বেশি হয় না। বাংলাদেশে যে নতুন নতুন ভূমি জেগে উঠছে, সেখানেও এই পদ্ধতি প্রয়োগ হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের আয়তন বস্তুত বাড়ছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ঝিনুকের প্রাচীর জলজ প্রাণীর আবাস তৈরি করে, পানির মান বাড়ায়, সাগর ঘাসের বৃদ্ধিতে সহায়ক এবং বেশ সস্তা। প্রাকৃতিক ব্রেকওয়াটার হিসেবেও এর তুলনা নেই বললেই চলে। এটি প্রকৃতির ক্ষতির কারণও হচ্ছে না। এজন্য ব্যবহার করা হচ্ছে সিমেন্টের তৈরি রিং। যা একসময় অদৃশ্য হয়ে যাবে। পড়ে থাকবে শুধু ঝিনুকের বর্ম।

তবে এই দেওয়াল আসলে নিরাপত্তার প্রথম ঢাল। এরপরেই থাকছে ম্যানগ্রোভ বন। যা পুরো উপকূলজুড়েই ছড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। প্রকৃতিকে শাসন করেনি বাংলাদেশ, বরং তার সঙ্গে জোট বেধেছে। এ কারণেই বাংলাদেশের আয়তন কমছে না, বছর বছর বাড়ছে।

দেয়ালের ভেতরে পাওয়া গেল স্বর্ণমুদ্রাভর্তি বাক্স

প্রতীকী ছবি

ফ্রান্সের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি পুরোনো ভবন সংস্কারের সময় দেয়ালের ভেতর থেকে কয়েক শ দুর্লভ স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গেছে। ওই স্বর্ণমুদ্রাগুলো চলতি মাসেই নিলামে তোলা হবে বলে জানিয়েছে একটি নিলামকারী সংস্থা। গতকাল বৃহস্পতিবার তারা এ কথা জানায়।

২০১৯ সালে ভবনটি থেকে ২৩৯টি স্বর্ণমুদ্রা উদ্ধার করা হয়। ভবনের মালিক এগুলো বিক্রি করতে নিলামকারী প্রতিষ্ঠানকে জানালে বিষয়টি কিছুদিন আগে প্রথমবারের মতো জানাজানি হয়। এর মধ্যে ফরাসি বিপ্লবের আগে ফরাসি শাসক ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ লুইয়ের সময়ের মুদ্রাও রয়েছে। ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলের ব্রিটানি প্রদেশের কুইমপারের ওই প্রাসাদমালিক ভেতরের তিনটি ভবন একত্র করার উদ্যোগ নেন। এ কাজে ভবনমিস্ত্রিদের ডাকা হলে কাজ করতে গিয়ে এ মুদ্রার সন্ধান পাওয়া যায়।

কাজের সময় লোকজন একটি ধাতব বাক্স পান, যেটি স্বর্ণমুদ্রায় পূর্ণ ছিল। ভবনমালিক ফ্রাসোঁয়া মিন বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, পাথরবেষ্টিত দেয়ালের মধ্যে বাক্সটি পাওয়া যায়। এর কয়েক দিন পরে কাজ করতে গিয়ে একটি কাঠের বিমের ভেতরে থাকা একটি থলে থেকে আরও কিছু মুদ্রা পাওয়া যায়। নিলামে তোলা এসব প্রাচীন মুদ্রার আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছে আড়াই থেকে তিন লাখ ইউরো। এ অর্থ ভবনমালিক ও সংস্কারকাজে নিয়োজিতদের মধ্যে বণ্টন করা হবে বলে জানা গেছে। এসব মুদ্রার মধ্যে বেশ কিছু ফরাসি লুইয়ের মুদ্রা রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ১৬৪৬ সাল থেকে চতুর্দশ লুইয়ের সময়ের মুদ্রা। এর একেকটি মুদ্রার মূল্য ১৫ হাজার ইউরো।