নতুন আদেশে প্রবাসীদের সহায় সম্পদ রক্ষায় জটিলতা আরও বাড়বে

পৃথিবীর ১৬৮ দেশে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করেন। তারা প্রতিবছর রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। গত বছর প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন রেকর্ড সৃষ্টিকারী ২২ বিলিয়ন ডলার। প্রবাসীদের প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে দেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে পারিবারিক ও আত্মীয়তার বন্ধনে। এই প্রবাসীরা নানা জটিলতার শিকার হন স্থানীয় প্রভাবশালীদের দ্বারা, আবার কখনো প্রতারিত হন নিজের পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে।
শেষ ভরসা হিসেবে প্রবাসীরা কখনো কখনো আদালতের দ্বারস্থ হন। এই শেষ ভরসাস্থলে তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা। গতকাল মহামান্য হাইকোর্ট এক আদেশে বলেছেন, এখন থেকে মামলা করতে বাদীর জাতীয় পরিচয়পত্র লাগবে

দেশে বসবাসকারী নাগরিকদের জন্য এটি কষ্টসাধ্য নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে এর প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। কিন্তু প্রবাসীদের জন্য এই আদেশ সৃষ্টি করবে বিরাট জটিলতা। কারণ ১,৬০,০০,০০০ প্রবাসীর বেশির ভাগের কাছে নেই এনআইডি। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা প্রবাসীদের জন্য এনআইডি প্রদানের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে- তবে কাজটি অনেক কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। সুতরাং প্রবাসীরা যদি এনআইডি বা জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া আদালতের দ্বারস্থ হতে না পারে তাহলে তাদের সহায় সম্পত্তি রক্ষার শেষ আশ্রয়স্থলটিতে পৌঁছাতে সৃষ্টি হবে জটিলতা। এই সুযোগে প্রভাবশালীরা প্রবাসীদের সম্পত্তি দখলের চেষ্টায় আরও বেশি সফল হবে।
সামগ্রিক বিবেচনায় প্রবাসীদের আপাতত এই আদেশটি থেকে বাইরে রাখা যায় কিনা বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা দরকার।

এক বছরে এমিরেটসের লোকসান ৫৫০ কোটি ডলার

করোনা মহামারির কারণে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় মধ্যপ্রাচ্যের সর্ববৃহৎ বিমান সংস্থা এমিরেটসের গত এক বছরে নেট লোকসান হয়েছে ৫৫০ কোটি ডলার। এ সময়ে রাজস্ব আয় কমে গেছে শতকরা ৬৬ ভাগেরও বেশি। অনলাইন আইরিশ এক্সামিনার এ খবর দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এক বছরে তাদের রাজস্ব আয় হয়েছে ৮৪০ কোটি ডলার কম। ২০২০ সালের মার্চে এবং চলমান ভ্রমণ বিধিনিষেধের কারণে এই যাত্রীবাহী ফ্লাইটের এই ঘটনা ঘটেছে। এমিরেটস বলেছে, গত এক বছরে তাদের মোট যাত্রী এবং কার্গো ক্যাপাসিটি কমেছে শতকরা ৫৮ ভাগ। গত বছর এমিরেটসের লাভ কমে গিয়েছিল। তবু তারা ২৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার লাভ পেয়েছিল।

এমিরেটস গ্রুপ বলেছে, তাদের মোট লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৬০০ কোটি ডলার। তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথমবার এই বিমান সংস্থা লোকসান গুনলো।

টিকটক, লাইকি যুবসমাজের জন্য ক্ষতি, বন্ধ করা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মত

টিকটক, লাইকি অ্যাপ যুবসমাজের জন্য ক্ষতির কারণ। এসব অ্যাপ ব্যবহার করে স্কুল-কলেজের ছাত্রী, এমনকি যুবতী গৃহবধূকে টার্গেট করা হয়। তাদেরকে ফুসলিয়ে পাচার করা হয় অন্য দেশে। সেখানে নিয়ে তাদেরকে বিক্রি করা হয় অথবা জোরপূর্বক দেহব্যবসায় নিয়োজিত করা হয়। এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ র‌্যাব এসব অ্যাপ বন্ধ করে দেয়ার পক্ষে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যাপ বন্ধ করে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ, ভিপিএন ব্যবহার করে এসব সাইটে প্রবেশ করতে পারবেন ব্যবহারকারীরা। ফলে এই অ্যাপ ব্যবহার বন্ধ না করে দিয়ে উন্নত মনিটরিংয়ের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ খবর দিয়েছে তুরস্কের অনলাইন টিআরটি ওয়ার্ল্ড।

এতে বলা হয়েছে- বাংলাদেশে যৌনতার উদ্দেশ্যে পাচার নতুন কিছু নয়। এক দশকে ১২ থেকে ৩০ বছর বয়সী প্রায় ৫ লাখ বাংলাদেশি বালিকা ও নারীকে যৌনতা বিষয়ক চক্র পাচার করেছে ভারতে। কিন্তু টিকটকের মতো জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকে পাচারের ঘটনা প্রথম জানা গেছে। এই চক্রের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মে মাসের শেষের দিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ২২ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি যুবতীর ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ে। তাকে ভারতের ব্যাঙ্গালুরু শহরে নির্যাতন ও যৌন হয়রানি করা হয়েছে। এ ঘটনায় বাংলাদেশের রিফাদুল ইসলাম ওরফে টিকটক হৃদয় ও তার অন্য ৫ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে ভারতীয় পুলিশ। তারা সবাই ওই যুবতীর ভিডিও ধারণের সঙ্গে জড়িত।

এর কয়েকদিন পরেই আরেক বাংলাদেশি নারীকে ভারতে পাচার করার পর তিনি পালান। ৭৭দিন পরে তিনি দেশে ফিরে এসে দেশের পাচার প্রতিরোধ ও নির্যাতন বিরোধী আইনের অধীনে মামলা করেন।

এই দুটি ঘটনা বাংলাদেশ পুলিশকে বৃহত্তর অনুসন্ধানে উদ্বুদ্ধ করে। সেই তদন্ত থেকে দেশের ভিতরে মানবপাচারকারী চক্রের কুখ্যাত নেটওয়ার্কের তথ্য বেরিয়ে আসে। তাতে দেখা যায়, যুব শ্রেণি- বিশেষ করে সহজ সরল টিনেজ মেয়েদের ফুসলিয়ে পাচার করতে ব্যবহার করা হয় টিকটক। এরপর তাদেরকে ভারতে নিয়ে দেহব্যবসা করতে বাধ্য করা হয়। টিআরটি ওয়ার্ল্ড আরো লিখেছে, বাংলাদেশ পুলিশ ফেসবুকে আরো একটি গ্রুপের সন্ধান পেয়েছে, টিকটকে থাকা যুবক বা যুবতীদের এই গ্রুপে যুক্ত করা হয়। এসব টিনেজার মেয়েকে ভারতে ভাল বেতনে চাকরি পাইয়ে দেয়ার টোপ ফেলা হয়। তারপর সীমান্ত দিয়ে পাচার করা হয়। এমন গ্রুপের সন্ধান পাওয়ার পর বাংলাদেশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো টিকটক ও লাইকি’র মতো অন্যসব প্লাটফর্মে নজরদারি বৃদ্ধি করেছে। এমনকি তারা এসব প্লাটফরম নিষিদ্ধ করার কথাও বিবেচনা করছে। র‌্যাবের মুখপাত্র খন্দকার আল মঈন টিআরটি ওয়ার্ল্ডকে বলেছেন, তারা টিকটক এবং লাইকি বন্ধের একটি প্রস্তাব জমা দেয়ার পর্যায়ে আছেন। তিনি বলেন, এগুলোর মতো অন্য অ্যাপ থেকে যুবসমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সম্প্রতি আমরা মানব পাচারের চক্রের সন্ধান পেয়েছি, যারা টিকটক ব্যবহার করে যুবতীদেরকে প্রলুব্ধ করতো। তাদেরকে ভাল বেতনের কাজ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হতো। তারপর ভারতে নিয়ে যৌনকর্মী হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হতো।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেছেন, আন্তঃদেশীয় এই চক্রের সঙ্গে জড়িত কমপক্ষে ৫০ জন সদস্য। তারা গত ৫ বছরে ১৮ থেকে ২২ বছর বয়সী প্রায় ৫০০ মেয়েকে ভারতে পাচার করেছে। এ বিষয়টি সম্প্রতি উদঘাটন হয়েছে। আমরা টিকটক ও লাইকি’তে নজরদারি বৃদ্ধি করেছি। আমরা মনে করি এসব প্লাটফরম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করার এখনই উপযুক্ত সময়। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বিটিআরসি)। আমরা শুধু তাদের কাছে প্রস্তাব পাঠাতে পারি।

টিকটকের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে এটাই প্রথম কোনো পদক্ষেপ নয়। ২০১৮ সালের নভেম্বরে টিকটকে প্রবেশ ব্লক করে দেয় বাংলাদেশ সরকার। ২০২০ সালের আগস্টে এই মাধ্যম থেকে কর্তৃপক্ষ ১০টি ভিডিও মুছে দেয়। এসব ভিডিও দেশের ভিতর থেকে আপলোড করা হয়েছিল।

বাংলাদেশে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়েছে টিকটক। ২০২১ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে চীনের ভিডিও শেয়ারিং এই প্লাটফরম ব্যবহার করেন প্রায় ৭০ কোটি মানুষ। এর ব্যবসায়িক ধারণা অন্য অ্যাপগুলোতে ফিচার যোগ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। লাইকি অ্যাপও বিশ্বজুড়ে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছ। এই অ্যাপটি বিশ্বে ব্যবহার করেন কমপক্ষে ১৫ কোটি মানুষ।

টিকটক, লাইকি, বিগো লাইভের মতো প্লাটফরম যুবসমাজের ক্ষতি করছে মর্মে এসব অ্যাপ বন্ধ করে দিকে গত ডিসেম্বরে হাইকোর্টের আছে একটি রিট আবেদন করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী। উল্লেখ্য, ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও পাকিস্তান সহ বিভিন্ন দেশে বন্ধ রয়েছে টিকটক। কর্তৃপক্ষ পর্নোগ্রাফি, অসামঞ্জস্য কন্টেন্ট এবং ধর্ম অবমাননাকর কন্টেন্টের জন্য ২০১৮ সালের জুলাইয়ে অস্থায়ী ভিত্তিতে ইন্দোনেশিয়ায় নিষিদ্ধ করে টিকটক। কিন্তু এই অ্যাপের পক্ষ থেকে সেখানে কন্টেন্ট সেন্সর করতে ২০ জন স্টাফকে মোতায়েন করা হবে- এমন ঘোষণা দেয়ার পর নিষেধাজ্ঞার ৮ দিন পরে তুলে নেয়া হয়।

পাকিস্তানেও টিকটক অস্থায়ী সময়ের জন্য বন্ধ ছিল। টিকটক তাদের অ্যাপ থেকে আপত্তিকর কন্টেন্ট মুছে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর ওই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। অন্যদিকে ২০২০ সালের ২৯ শে জুন থেকে ভারতে টিকটক বন্ধ আছে।

বাংলাদেশেও কি নিষিদ্ধ হবে?
সামাজিক যোগাযোম মাধ্যম বিষয়ক বিশ্লেষক আশ্রফ উল জুবায়ের টিআরটি ওয়ার্ল্ডকে বলেছেন, এই ছোট্ট মনোযোগ আকর্ষণের যুগে টিকটক এবং লাইকি হয়ে উঠেছে অপরিহার্য এক উপাদান। তিনি বলেন, টিকটকের কন্টেন্টে খুব বেশি সেট-আপ প্রয়োজন হয়না। এতে শুধু একটি স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই হলো। অন্যদিকে যারা ইউটিউবার তাদের অনেক সরঞ্জাম প্রয়োজন হয়। ফলে টিকটক ব্যবহার করে প্রান্তিক মানুষগুলো বিশ্বের সাইবার-বিনোদনে অংশ নেন এবং কন্টেন্ট তৈরি করেন। এর ফলে বহু যুবতী এই অ্যাপ ব্যবহার করে ভিডিও আপলোড দেন। কিন্তু পরে তারা যৌনতার উদ্দেশে পাচারের শিকারে পরিণত হন। এই অ্যাপে কোনো নোংরামি বিষয়ক কন্টেন্টের বিষয়ে কোনো রাখঢাক নেই। এতে যৌনতা বিষয়ক কন্টেন্ট এখনও আপলোড হয় এবং তা শেয়ার হয়।

তিনি মনে করেন টিকটক বা লাইকি’র মতো অ্যাপের বিরুদ্ধে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দেয়া হলে তা এখন আর কাজে আসবে না। কারণ, জনগণ ভিপিএনের সাহায্য নিয়ে এসব অ্যাপের নাগাল পেয়ে যায় সহজেই। বাংলাদেশ ন্যাশনাল ওমেন লয়ার্স এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট এবং হিউম্যান ট্রাফিকিং মনিটরিং সেলের উপদেষ্টা সালমা আলি বলেছেন, ঢাকা ভিত্তিক মেয়েদের ভারত পাচারের বিষয়টিকে একটি ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে এক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর বড় ব্যর্থতাও ঘেঁটে দেখা উচিত। এই পাচারকারী চক্র সহজেই এর মাধ্যমে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী  এমনকি কখনো কখনো তারা যুবতী গৃহবধূকেও টার্গেট করে। এতে বাংলাদেশে ডিজিটাল শিক্ষা ও ডিজিটাল নিরাপত্তার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান ফুটে উঠেছে। টিকটক এবং লাইকি’র মতো অ্যাপ বন্ধ করার পরিবর্তে সরকার এসব প্লাটফরমে নজরদারি বাড়াতে অন্য উন্নত উপায় অবলম্বন করতে পারে।