এই সময়ে ভ্রমণ কতটুকু নিরাপদ?

এই সময়ে ভ্রমণ কতটুকু নিরাপদ?

বিশ্বব্যাপী লাফিয়ে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ সরকারও হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু মানুষের মধ্যে সচেতনতার বালাই নেই। সংক্রমণ কমানোর জন্য সরকার ৫ এপ্রিল থেকে লকডাউন ঘোষণা করেছে।

এরমধ্যে ভ্রমণ করা কতটুকু নিরাপদ, সে বিষয় আজ আপনাদের জানাবো-

পর্যটকদের কি করতে হবে?

হঠাৎ করে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় এই মুহূর্তে দর্শনার্থীদের ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না। এর আগে মনে করা হচ্ছিল, করোনা ভ্যাক্সিনেই কাটবে এই মহামারি। চলতি বছরের ৫ মার্চ সিনেট ডট কমের খবরে উল্লেখ করা হয়, পর্যটন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এই এই মুহূর্তে ভ্রমণ করা সম্পূর্ণ নিরাপদ। কিন্তু সংক্রমণের গতি বেড়ে গেলে ভ্রমণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বিভিন্ন দেশের সরকার লকডাউন ঘোষণা করে। এতে দর্শনীয় স্থানগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সংক্রমণ কমে যাওয়ায় আবার খুলে দেওয়া হতে থাকে সেসব দর্শনীয় স্থান। কিন্তু গত মার্চের পর থেকে দেশে করোনা সংক্রামণ হু হু করে বাড়ছে। তাই মহামারি শেষ না হওয়া অবধি পর্যটকদের অপেক্ষা করাই উচিত।

মহামারির সময়ে ভ্রমণের ঝুঁকি

করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ায় এ মুহূর্তে ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। কারণ এমন পরিস্থিতিতে কোথাও ঘুরতে বের হলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে ঘুরার পরিকল্পনা মহামারি শেষ হওয়ার পর করলে সংক্রমণের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।

ঘরবন্দী জীবনযাপনই শ্রেয়

এ মুহূর্তে ঘরবন্দী জীবনের বিকল্প কিছু নেই। এসময় ঘরে বসে পরিবারকে সময় দেওয়া যেতে পারে। ফোনে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে পারেন। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কথা বলুন। এছাড়া পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একসঙ্গে ঘরের কাজ করুন। সময় কাটাতে পারেন বিভিন্ন ধরনের বই পড়ে। প্রয়োজনীয় কাজে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মাস্ক পরুন ও নিয়মিত স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন।

করোনায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে ভ্রমণ করুন

করোনায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে ভ্রমণ করুন

স্বাস্থ্যবিধি মেনে ধীরে ধীরে ভ্রমণ করা শুরু করছেন অনেকে। রেস্তোরাঁ ও কিছু দর্শনীয় স্থান খুলে দেওয়া হচ্ছে। গ্রিস, ইতালিসহ কয়েকটি দেশ পর্যটকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে।

এ বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) বলেছে, করোনার এমন পরিস্থিতিতে যদি কোনো ব্যক্তি এক দেশ থেকে অন্য দেশে যান তাহলে তাকে ১৪ দিন সেলফ আইসোলেশনে থাকতে হবে। গত বছরের ১৪ মে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভ্রমণের পরিকল্পনা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে কোথাও ভ্রমণ করা কতটুকু নিরাপদ সেটিও ভেবে দেখতে হবে। এসব নিয়েই আজকের আয়োজন-

বিমান ভ্রমণ

হার্ভার্ড টি. এইচ. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের হেলদি বিল্ডিং প্রোগ্রামের সহকারী অধ্যাপক জো অ্যালেন বলেন, অনেকেই মনে করেন বিমানে ভ্রমণ করলে তারা অসুস্থ হয়ে যাবেন। প্রকৃতপক্ষে বিমানে পর্যাপ্ত বাতাসের ব্যবস্থা রয়েছে।

পার্কে ভ্রমণ

সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ জয়সি স্যাঞ্চেজ বলেন, গরমের সময় করোনা সংক্রমণ বেশি হচ্ছে। তাই ভ্রমণের সময় স্যানিটাইজার নিতে হবে এবং মাস্ক পরে থাকতে হবে।

সমুদ্র ভ্রমণ

সমুদ্রে ভ্রমণের সময় অনেকেই নিরাপদ দূরত্ব মেনে চলেন না। মনে রাখতে হবে, করোনা থেকে বাঁচার জন্য নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা বাঞ্ছনীয়। ভ্রমণের সময় স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে হবে এবং মাস্ক পরে থাকতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে করোনা মহামারি দূর করা সম্ভব হবে। ডা. লিন চেন বলেন, হাত পরিষ্কারের মাধ্যমে করোনা থেকে নিরাপদ থাকা যায়।

আবাসিক হোটেলের নিরাপত্তা

স্যাঞ্চেজ বলেন, হোটেলের লিফট ব্যবহার না করে সিঁড়ির মাধ্যমে যাতায়াত করতে হবে। হোটেলের রেস্তোরাঁর চেয়ে রুমগুলো অনেক বেশি নিরাপদ। কারণ রেস্তোরাঁয় বাইরে থেকে অনেক মানুষ আসেন।

কাপড়ের মাস্ক ব্যবহারে যেসব সতর্কতা জরুরি

মাস্ক এখন নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যে পরিণত হয়েছে। যে হারে সংক্রমণ এবং মৃত্যু বেড়ে চলেছে গোটা বিশ্বে, তাতে আগামী কয়েক বছর মাস্ক ব্যবহার অপরিহার্য মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু কাপড়ের মাস্ক না সার্জিক্যাল মাস্ক, সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে কোনটা বেশি ভালো, তা নিয়ে এখনও দ্বিধা রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। শ্বাসকষ্টের সমস্যা থাকায় বহু মানুষ আবার কাপড়ের মাস্কই বেছে নিচ্ছেন। কাপড়ের মাস্ক পরার ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু সতর্কতা মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

সংস্থাটি জানিয়েছে, যে কোনও সময় মাস্ক ধরার আগে হাত ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে। মাস্কের কোথাও কোনও ছিদ্র বা ছেঁড়া রয়েছে কি না তা ভালোভাবে দেখে নিতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, মাস্ক পরার পর মুখের দু’পাশে ফাঁক রয়েছে। তা কোনও ভাবেই হতে দেওয়া যাবে না। মাস্ক পরার পর মুখ, নাক এবং থুতনি সম্পূর্ণভাবে ঢাকা থাকতে হবে।

গ্রীষ্মের দাবদাহে অনেকেই মাস্ক পরে হাঁফিয়ে উঠছেন। এ কারণে নিজের অজান্তেই অনেকের মাস্কে হাত চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ টানাটানি করে মাস্ক আলগা করছেন, অস্বস্তি হলে উপরের অংশ ধরে মাস্ক ঠিক করতেও দেখা যায় অনেককে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘন ঘন মাস্ক না ছোঁয়াই ভাল। আর যদিও বা মাস্ক খুলতে হয় বা ঠিক করতে হয়, তা কানের পাশে অথবা মাথার পিছন দিক থে‌কে মাস্কের ফিতা ধরেই খুলতে বা পরতে হবে। খোলার পরই মুখের কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে মাস্ক।

সার্জিক্যাল মাস্কের ক্ষেত্রে এক বার পরার পরই তা ফেলে দিতে হয়। তবে কাপড়ের মাস্ক আবারও ব্যবহার করা যায় বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। মাস্ক ভিজে না গেলে, নোংরা না হলে খোলার পর পরিষ্কার থলিতে রেখে দেওয়া যাবে। ফের ব্যবহার করতে চাইলে সাবান বা ডিটারজেন্টে ভিজিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। দিনে এক বার গরম পানিতে সাবান মিশিয়ে মাস্ক ধুয়ে নিলে ভালো হয়।

কাপড়ের মাস্ক ব্যবহার করার ক্ষেত্রে এর আগে ত্রিস্তরীয় মাস্কের উপর গুরত্ব দিয়েছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটি জানিয়েছে, দোকান থেকে কিনে বা বাড়িতে তৈরি করা মাস্ক পরা যাবে। তবে সংক্রমণ প্রতিরোধের ক্ষমতা মাস্কের কাপড়ের উপর যেহেতু নির্ভর করে, তাই তিনটি স্তরে আলাদা রকমের কাপড় দিতে হবে। মাস্কের যে অংশটি ভিতরের দিকে থাকবে, তাতে সুতির কাপড় ব্যবহার করলে ভালো। কারণ তা মুখ থেকে নির্গত ড্রপলেটস দ্রুত শুষে নিতে পারে। মাঝের স্তরে থাকবে পলিপ্রোলাইনের মতো এমন উপকরণ, যা ফিল্টারের কাজ করবে। বাইরের স্তরটি তৈরি হবে পলিয়েস্টারের মতো উপকরণ দিয়ে, যা মুখের ভিতর থেকে সংক্রমণ বাইরে ছড়াতে দেবে না, আবার বাইরে থেকেও সংক্রমণ মুখে প্রবেশ করা আটকাবে।

দোকান–শপিং মল খুলেছে, রাস্তায় বেড়েছে ভিড়

রাস্তায় আজ মানুষের ভিড় বেড়েছে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে চলা লকডাউনের মধ্যেই সারা দেশে আজ রোববার দোকানপাট ও শপিং মল খুলেছে। টানা ১১ দিন বন্ধ থাকার পর আজ খুলল দোকান ও শপিং মল। রাজধানীর রাস্তাগুলোয় আজ সকাল থেকেই ভিড় বেশি। স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রেও মানুষের মধ্যে উদাসীনতা দেখা গেছে।

সকাল ১০টার দিকে নিউমার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, দোকানগুলো খোলা শুরু হয়েছে। যাঁরা খুলেছেন, তাঁরা ঝাড়ামোছার কাজ করছেন। এরই মধ্যে কোনো ক্রেতা এলে তাও সামলাচ্ছেন কেউ কেউ।

ফেয়ার সুজ নামের দোকানের মালিক বিল্লাল হোসেন ঠিক ১০টাতেই দোকান খুলেছেন। তিনি বলেন, ‘রোজার মধ্যে এসে দোকান খুলল। কতটা ব্যবসা করতে পারব জানি না। কারণ, এখন অনেক গরম। বিকেল পাঁচটায় বন্ধ করতে হবে। ইফতারের পরেই আসলে মানুষ বেশি আসে। তারপরও কিছু বেচাবিক্রি হয়তো হবে।’

চাঁদনী চকের মৌমি ফ্যাশনের বিক্রেতা মো. রবিন বলেন, গণপরিবহন বন্ধ। কাছের মানুষ যারা, তারাই আসবে। দূরের ক্রেতারা আসতে পারবে না। বাস চলাচল শুরু হলে হয়তো বেচাবিক্রি বাড়বে।

নিউমার্কেটের দোকানগুলো সকালের দিকে ফাঁকা ছিল।

নিউমার্কেটের দোকানগুলো সকালের দিকে ফাঁকা ছিল। 
ছবি: সুহাদা আফরিন

পুলিশ জানিয়েছে, শপিং মল ও দোকানে যেতে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মুভমেন্ট পাস নিতে হবে। এ বিষয়ে নিউমার্কেট, চাঁদনী চক, গাউছিয়া মার্কেটের দোকানিরা জানান, কাউকে কোনো কিছু দেখাতে হয়নি। পুলিশও কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। এ ছাড়া তারা সবাই আশপাশেই থাকেন।

আমিনা আহমেদ একটি বড় ব্যাগ নিয়ে গাউছিয়ায় ঘুরছেন। প্রথম আলোকে বলেন, তিনি কাপড় কিনে এবার কিছু পোশাক বানাবেন। তাই সকাল সকাল চলে এসেছেন ভিড় এড়াতে।

বসুন্ধরার শপিং মলে দেখা যায়, ক্রেতার সমাগম এখনো শুরু হয়নি। রাইসা ফ্যাশন নামের দোকানের বিক্রয়কর্মী মো. সাব্বির বলেন, রোজার মাঝামাঝি সময়ে দোকান খুললেও কিছুটা ব্যবসা হবে বলে আশা করছেন।

চাঁদনীচকে খুলেছে দোকানপাট।

চাঁদনীচকে খুলেছে দোকানপাট। 

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী মোড়ে সকাল ১০টার সময় শত শত মানুষকে পরিবহনের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। গাদাগাদি করে ভ্যানে করে অনেকেই গন্তব্যস্থলে রওনা দিয়েছেন। একই চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর সুপারমার্কেটের সামনে। সেখানে রীতিমতো যানজট দেখা দিয়েছে। গুলিস্তান ফিরে গেছে পুরোনো রূপে। ফুটপাতে পসরা সাজিয়ে বসে আছেন হকাররা।

গুলিস্তান মোড়ে যান চলাচল বেড়েছে। পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডে মানুষের ভিড় বেড়েছে অনেক। দোকানপাটও খোলা রয়েছে।

যাত্রাবাড়ীর তাজ সুপারমার্কেটে শতাধিক দোকান খোলা দেখা গেছে। তবে ক্রেতার সংখ্যা কম। সেখানকার বিক্রয়কর্মী ইব্রাহিম বলেন, টানা ১১ দিন বন্ধের পর আজ তাঁরা দোকান খুলেছেন। এখনো ঈদের বাকি আছে অনেক দিন। আশা করছেন বাকি দিনগুলোতে ক্রেতা পাবেন।

যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে কোনো পরিবহন না পেয়ে একটি ভ্যানে উঠেছেন আব্দুল হাকিম। ওই একই ভ্যানে আরও ছয়জন উঠে পড়েন। পরে ভ্যানটি পুরান ঢাকার দিকে রওনা হয়।

দোকানপাট খুলেছে আজ।

দোকানপাট খুলেছে আজ। 

আব্দুল হাকিম প্রথম আলোকে বলেন, টানা ১১ দিন বন্ধ থাকার পর দোকান খুলেছে। মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু রাস্তায় বাসসহ যানবাহনের সংখ্যা কম। বাধ্য হয়েই তিনি স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে ভ্যানে করে গন্তব্যে যাচ্ছেন। এতে তিনি নিজেও করোনায় সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা তিনি দেখছেন না।

রাজধানী বঙ্গবাজারে এনেক্স সুপারমার্কেটে দেখা গেল, দোকানপাট সব খোলা, কিন্তু ক্রেতা নেই। সেখানকার হাওলাদার গার্মেন্টসের বিক্রয়কর্মী সাগর প্রথম আলোকে বলেন, অনেক দিন বন্ধ থাকার পর আজ আবার তাঁরা দোকান খুলেছেন।

 

সকালের দিকে দোকানে তেমন ভিড় ছিল না।

সকালের দিকে দোকানে তেমন ভিড় ছিল না। 

তবে কোনো ক্রেতা নেই। এটি পাইকারি বাজার। তাই তিনি আশা করছেন, দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল শুরু হওয়ার পর ক্রেতার সংখ্যা বাড়বে। তাঁদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে দেখা গেছে। তাঁরা মাস্ক পরেছেন। হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করছেন। ক্রেতারাও যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কেনাকাটা করেন, সে ব্যাপারে তাঁরা সতর্ক রয়েছেন।

পরিবহন না পেয়ে ভ্যানে গাদাগাদি করে যাচ্ছেন অনেকে।
পরিবহন না পেয়ে ভ্যানে গাদাগাদি করে যাচ্ছেন অনেকে। 

বিশ্বে করোনা সংক্রমণের কেন্দ্র হয়ে উঠছে ভারত

বিশ্বে করোনা সংক্রমণের কেন্দ্র হয়ে উঠছে ভারত

অনেক হাসপাতালেই শয্যা খালি নেই। রোগীর স্বজনেরা ছুটছেন এ হাসপাতাল থেকে ও হাসপাতালে। গুরুতর অসুস্থ যেসব রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছেন, তাঁদের অনেককেই আবার পড়তে হচ্ছে অক্সিজেন-সংকটে। হাসপাতালগুলোয় এসব সংকট প্রতিদিনই প্রকটতর হচ্ছে। সর্বোপরি বলা যায়, করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায় ভারতের স্বাস্থ্যব্যবস্থা যেন খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। দিনরাত চিতা জ্বলছে শ্মশানগুলোয়। সব মিলিয়ে ক্রমেই বিশ্বে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কেন্দ্র হয়ে উঠছে ভারত।

ভারতে গত বছরের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি করোনার সংক্রমণের প্রথম ঢেউ চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। তখনো রোগী শনাক্তের সাপ্তাহিক সর্বোচ্চ গড় ছিল ৯৩ হাজারের আশপাশে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি একেবারেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত শনিবার থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ভারতে নতুন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন প্রায় সাড়ে তিন লাখ, যা যেকোনো দেশে এক দিনে সর্বোচ্চ রোগী শনাক্তের নতুন রেকর্ড।

গতকাল সকাল পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, ভারতে করোনায় সংক্রমিত মোট রোগী শনাক্ত হয়েছেন প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি। অর্থাৎ উপসর্গহীন, মৃদু, মাঝারি ও গুরুতর অসুস্থ—সব মিলিয়ে ভারতে গতকাল পর্যন্ত চিকিৎসাধীন করোনা রোগী ছিলেন প্রায় ২৯ লাখ। অথচ তিন দিন আগেও, গত বৃহস্পতিবার চিকিৎসাধীন করোনা রোগী ছিলেন প্রায় ২৩ লাখ। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, ভারতে করোনা পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

রোগী বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত শনিবার থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ভারতে করোনায় মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ৭৬৭ জনের। এ নিয়ে ভারতে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা দুই লাখের কাছাকাছি হলো।

পরিস্থিতি ক্রমেই শোচনীয় হচ্ছে

আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেট-এর করা ভবিষ্যদ্বাণীকে এরই মধ্যে পেছনে ফেলেছে করোনা মহামারি। ল্যানসেট বলেছিল, ভারতে করোনায় দৈনিক মৃত্যু আগামী জুন মাসের গোড়ার দিকে ২ হাজার ৩০০ ছাড়াবে। গত শনিবার ২২ এপ্রিলই সে সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে। অথচ গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি ভারতে আক্রান্তের সাপ্তাহিক গড় ছিল খুবই কম, ১১ হাজারের আশপাশে। সবার মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, ভারত হয়তো করোনামুক্ত হতে চলেছে। কিন্তু তা যে হয়নি, ভেতরে-ভেতরে টের পাওয়া যাচ্ছিল। যেমনটা টের পেয়েছিলেন মহারাষ্ট্র রাজ্যের মুম্বাইয়ের সাংবাদিক দিলনাজ বোগা।

দিলনাজ বলেন, ‘বাবার অসুস্থতার জন্য গত কয়েক মাসে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ঘোরাঘুরি করছিলাম। হঠাৎ লক্ষ করলাম, হাসপাতালগুলোয় বেডের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। নার্সরা বললেন, তাঁরা করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি লক্ষ করছেন। অথচ সবাই তখন ভাবছিলেন, কোভিড বুঝি চলেই গেছে। সংবাদমাধ্যমেও কোনো লেখালেখি হচ্ছিল না।’

দিলনাজের অভিজ্ঞতার এক মাসের মধ্যে ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, মহারাষ্ট্রের অবস্থা সাংঘাতিক। ভারতের প্রায় ২৩ লাখ করোনা রোগীর ৩০ শতাংশই মহারাষ্ট্রের। সেখানে গত শুক্রবার থেকে শনিবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন প্রায় ৬৭ হাজার। মারা গেছেন ৭৭৩ জন।

শুধু মহারাষ্ট্রই নয়, রোগী বাড়ছে দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গসহ অন্যান্য রাজ্যেও। রাজধানী নয়াদিল্লিসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে অনেক হাসপাতালেই শয্যার পাশাপাশি রয়েছে অক্সিজেন-সংকট। দিল্লিতে সমস্যা এতটাই প্রকট আকার ধারণ করেছে যে একটি হাসপাতালে ২০ জন করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছে অক্সিজেন-সংকটে।

মুম্বাইয়ের একটি বেসরকারি বিমা প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অমিতাভ ব্যানার্জি। সপ্তাহ তিনেক আগে তাঁর মা করোনায় সংক্রমিত হন। তাঁকে ভর্তি করা হয় দক্ষিণ মুম্বাইয়ের কোলাবা অঞ্চলে নৌবাহিনীর হাসপাতাল আইএনএইচএস অশ্বিনীতে। সেই সময় অশ্বিনীর অবস্থা দেখে ঘাবড়ে যান অমিতাভ। তিনি বলেন, ‘অশ্বিনী দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাসপাতাল, এটি সাধারণের জন্য নয়। যাঁদের পরিবারের সদস্যরা সামরিক বাহিনীতে আছেন বা ছিলেন, তাঁরাই এখানে চিকিৎসা করাতে পারেন। সেখানেই দেখলাম অবিশ্বাস্য অবস্থা। যদি ৩০টি বেড থাকে, তাহলে রোগী ১০০ জন। সেবা দেওয়ার লোক নেই। সেনাবাহিনীর সাহায্য নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু রাতারাতি স্বাস্থ্যকর্মী তো তৈরি করা যায় না। শোচনীয় অবস্থা। যদি তিন সপ্তাহ আগে অশ্বিনীর এই অবস্থা হয়, তবে একবার ভাবুন এখন কী অবস্থা!’

মুম্বাইয়ের চিকিৎসক ও চিকিৎসাবিষয়ক একটি সাময়িকী ইন্ডিয়ান জার্নাল অব মেডিকেল এথিকস-এর সম্পাদক সঞ্জয় নাগরাল মনে করছেন, অবস্থাটা কোথায় পৌঁছাবে বা কত মৃত্যু হবে, তা বুঝতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।

১৮ এপ্রিল ডা. নাগরাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘সপ্তাহ দুয়েক আগে মুম্বাইয়ে ১০ থেকে ২০ জন দৈনিক মারা যাচ্ছিলেন। এখন মৃত্যু হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ জনের। এবার যে হারে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, সেই অনুপাতে মৃত্যুর সংখ্যা এখনো কম। দু-তিন সপ্তাহ গেলে বোঝা যাবে আক্রান্ত ও মৃতের অনুপাত কী দাঁড়ায়।’

ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, মৃত্যুহার ১ দশমিক ৭ শতাংশের নিচে থাকলে তা খুব খারাপ নয়। কিন্তু যদি তা ২ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, তাহলে পরিস্থিতি ভয়ংকর আকার নেবে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এই হার ছিল ১ দশমিক ১৬ শতাংশ। ডা. নাগরাল বলেন, অল্প বয়স্করা, বিশেষত শিশুরা এবার আক্রান্ত হচ্ছে। এটা প্রবল চিন্তার। কারণ, মানুষকে রাখার জায়গা থাকবে না। ডা. নাগরাল এই কথা বলার পাঁচ দিনের মধ্যে মুম্বাইয়ের অনেক হাসপাতালেই তৈরি হয়েছে শয্যাসংকট।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও উঠে আসছে মানুষের আর্তি। কেবলই মৃত্যুসংবাদ সেখানে। দিল্লি, উত্তর প্রদেশ ও মধ্য ভারতের ছত্তিশগড়েও একই অবস্থা। মানুষ হন্যে হয়ে ঘুরছেন অক্সিজেন, ওষুধ, হাসপাতালের শয্যার জন্য। কলকাতাতেও অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটছে। এক আইনজীবী জানালেন, তিন হাজার টাকার অক্সিজেন সিলিন্ডার সেখানে বিক্রি হচ্ছে ১৫ হাজারে। কলকাতার অনেক হাসপাতালেই শয্যা খালি নেই।

অক্সিজেনের জোগানকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে মহারাষ্ট্রের শিবসেনা-ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি ও কংগ্রেসের জোট সরকারের সঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপির) সরকারের বিরোধ শুরু হয়েছে। মহারাষ্ট্র বলছে, কেন্দ্র তাদের অক্সিজেনের জোগান নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে বিজেপি।

চরম আতঙ্কে শ্রমজীবীরা

মুম্বাইসংলগ্ন মীরা-ভয়ন্দর অঞ্চলের বাসিন্দা অমিতাভ বললেন, ‘রোজ সকালে যখন হাঁটতে বেরোই, তখন এই অঞ্চলের সার সার বহুতল ভবনের গেটে একই ধরনের বোর্ড চোখে পড়ে। তাতে লেখা থাকে, এই ভবনে কোভিডে আক্রান্ত রোগী রয়েছেন। এটা এত বেশি সংখ্যায় আগেরবার চোখে পড়েনি।’

না পড়ারই কথা। অতীতের সঙ্গে এবারের সংক্রমণের একটা বড় ফারাক হলো সমাজের নিম্নবিত্ত খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে আপাতদৃশ্যে সংক্রমণের হার কম। ডা. নাগরাল বললেন, ‘এই পর্যবেক্ষণে হয়তো কিছুটা সত্যতা রয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালে, যেখানে উচ্চবিত্তরা যান, সেখানে চাপ অনেক বেশি। সরকারি হাসপাতালে রোগী যাচ্ছেন কম। তবে আবারও বলব, কিছুদিন পর আমরা প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারব।’

শনাক্ত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত ৩,৪৯,৬৯১ জন মোট শনাক্ত ১,৬৯,৬০,১৭২ জন চিকিৎসাধীন চিকিৎসাধীন করোনা রোগী ২৮,৭৫০,৬২ জন ২২ এপ্রিল চিকিৎসাধীন ছিলেন ২২,৯১,৪২৮ জন ৩ দিনে রোগী বেড়েছে ৫,৮৩,৬৩৪ জন মৃত্যু ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু ২,৭৬৭ জন মোট মৃত্যু ১,৯২,৩১১ জন তথ্যসূত্র: ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়

২০১১-এর আদমশুমারি মোতাবেক ভারতে যাঁরা এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে গিয়ে কাজ করেন, এমন শ্রমিকের সংখ্যা ৪৫ কোটির আশপাশে। অর্থাৎ জনসংখ্যার ৩৭ শতাংশ। তাঁদের একটা বড় অংশ রয়েছেন শিল্প শহর মুম্বাইয়ে।

মুম্বাইয়ে এমন শ্রমিকের একটা হিসাব দিলেন বিলাল খান, যিনি ‘ঘর বাঁচাও ঘর বানাও’ বলে একটি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। সংস্থাটি শ্রমিকদের স্থায়ী আবাসনের দাবিতে কাজ করে। তিনি বলেন, ‘মুম্বাইয়ের দুই কোটি মানুষের মোটামুটি অর্ধেক এমন শ্রমিক, বস্তিতে থাকেন। তাঁরা এখন এক বেলা খেয়ে রয়েছেন। জানি না শেষ পর্যন্ত তাঁদের কী হবে।’

দক্ষিণ-পূর্ব মুম্বাইয়ের মান্ডালা-মানখুর্দ এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ ওমর শেখ চামড়ার ব্যাগ বানাতেন। এখন অবশ্য তাঁর কারখানা বন্ধ। বড় বিপদের ইঙ্গিত দিলেন ওমর শেখ। তিনি বলেন, ‘বস্তির বাসিন্দারা করোনা পরীক্ষা করাতে উৎসাহী নন। যদি আক্রান্ত হন, তবে যেটুকু কাজ আছে, সেটাও বন্ধ হয়ে যাবে। করোনা থেকে সেরে ওঠার পরও কেউ কাজে ডাকবে না, এমন আতঙ্কও রয়েছে। এ ছাড়া বস্তিতে যেহেতু সবাই ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকেন, তাই প্রতিবেশীরাও চলে যেতে বলবেন।’

বিলালের বক্তব্য, ভারতে অসংগঠিত ও ঠিকা শ্রমিকের যে বিরাট সমস্যা, তা পুরোপুরি অনাবৃত করে দিয়েছে মহামারি। তিনি বলেন, ‘এখানে ও গোটা ভারতে ৯০ শতাংশের ওপরে শ্রমিকের কাজের কোনো নিশ্চয়তা নেই। ঠিকা শ্রমিক যেদিন কাজে যাবে, সেদিনই টাকা পাবে, না গেলে পাবে না। ১৫ দিন কোয়ারেন্টিনে (সঙ্গনিরোধ) থাকলে রুজি-রোজগার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে, খাবে কী?’

সবকিছু বন্ধ করে দেওয়ারও তীব্র বিরোধিতা করলেন বিলাল। বললেন, ‘যখন সরকারের হাতে কোনো রাস্তা থাকে না, তখন তারা প্রথমেই লকডাউন দেয়। কিন্তু সমস্যা অন্যত্র ও অনেক গভীরে। ঠিকা শ্রমিকেরা দৈনিক সরকারি মজুরির সাধারণত এক-তৃতীয়াংশ পান। তাঁদের হাতে কোনো জমানো টাকাই থাকে না। আর গত বছরের লকডাউনের ফলে অনেককেই সংসার চালাতে ধারদেনা করতে হয়েছে। এখন ধার শোধ করতে হচ্ছে। মহারাষ্ট্র সরকার এখন কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ফলে বাঁচার সব রাস্তা বন্ধ।’

মুম্বাইয়ে বেঁচে থাকাটা যে একেবারেই কঠিন হয়ে উঠেছে, তা ফুটে উঠল বিলালের সহকর্মী অখিলেশ রাওয়ের কথায়ও। অখিলেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ভাড়া দেওয়ার জন্য তিনটি গাড়ি কিনেছিলেন। ব্যাংকের ঋণ শোধ করতে গাড়িগুলো সস্তায় বিক্রি করে দিয়েছেন। গাড়ি বিক্রির টাকায় এবং আবার একটি ঋণ নিয়ে ও স্ত্রীর গয়না বিক্রি করে তিনি তৈরি পোশাকের একটি কারখানা চালু করেন। এখন সেই কারখানাও বন্ধ। চরম হতাশা নিয়ে তিনি বলেন, ‘কর্মচারীদের বাড়ি চলে যেতে বলেছি। জানি না কী হবে!’

গত বছর যখন সংক্রমণ বেড়েছিল, তখন রাজ্য সরকার, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও সুশীল সমাজের একটা বড় অংশ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল টাকাপয়সা, খাবারদাবার জোগাড় করে মুম্বাইয়ে এবং সারা ভারতে অবস্থা সামাল দিতে। এবার তা হচ্ছে না। এবার এমন অনীহার কারণ হিসেবে মুম্বাইয়ের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার এক কর্মী বললেন, অনেকেরই চাকরিবাকরি নেই।

বিদেশি বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা বলছে, দ্রুত প্রবৃদ্ধির যে গল্প গত দেড় দশকে ভারতে শোনা যাচ্ছিল, তা ইতিহাস হয়ে গেছে করোনা মহামারির কারণে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিইডব্লিউ জানিয়েছে, করোনা পরিস্থিতির কারণে ভারতে অন্তত ৩ কোটি ২০ লাখ মধ্যবিত্ত ইতিমধ্যে নিম্নবিত্তে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটির জ্যেষ্ঠ গবেষক জেনিফার নুজো বলেছেন, ভারত মানবিক বিপর্যয়ের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। অন্য দেশের ভারতের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।

কেন দারিদ্র্য বাড়ছে, তার একটা উদাহরণ দিলেন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মী অখিলেশ রাও। তিনি বলেন, ‘একজন ঠিকা নির্মাণশ্রমিকের
দৈনিক রোজগার মুম্বাইয়ে এক হাজার টাকা। তাঁকে রোজ সকালে নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দাঁড়াতে হয়, যেখান থেকে ঠিকাদারেরা নিয়ে যান। পুলিশ কাউকে রাস্তায় দাঁড়াতে দিচ্ছে না, রোজগার বন্ধ। সরকার খালি ইউরোপ-আমেরিকার লকডাউন দেখায়। ওখানে একটা সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা রয়েছে। এখানে নেই।’

ডা. নাগরাল অবশ্য বললেন, যেভাবে গত বছর পুরোপুরি লকডাউন করা হয়েছিল, তা এখনো মুম্বাইয়ে হয়নি, অনেক ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে।

মুম্বাইয়ে সরকারি খাতায় নথিভুক্ত শ্রমিকদের জন্য সরকারি সাহায্যের একটা ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু এই শহরে অন্য রাজ্য থেকে আসা শ্রমিকদের অধিকাংশই সেই খাতায় নাম তোলেন না। বিলাল খান বলেন, অনেকেই গ্রামের পরিচয়টাও ছাড়তে চান না। হয়তো ভাবেন, পরিচয়টা ছেড়ে দিলে শহরে উদ্বাস্তু হয়ে যাবেন। এটা দুই ভারতের পরস্পর বিরোধিতার গল্প—একটা ক্রমশ বিত্তবান হওয়া ভারত, অপরটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ভারত। এই ফারাকটাকে সামনে এনেছে করোনা মহামারি।

ভারতের নামকরা একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বললেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবকাঠামো নির্মাণের কাজ না করে গত এক বছরে এই ধ্বংসের গোটা দায়িত্বটা মানুষের ঘাড়ে চাপিয়েছে সরকার। এর মূল্য দিতে হবে।

আর সাংবাদিক দিলনাজ বোগার মতে, করোনার এই দ্বিতীয় ঢেউ জীবিকা বাঁচানোর সঙ্গে জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।