গরমে করোনার উচ্চ সংক্রমণ

করোনা সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে। একদিনের সংক্রমণ গত বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। সামনের দিনগুলোতে সংক্রমণ আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন সরকারি ও বেসরকারি সব পর্যায় থেকে। গত সোমবার সর্বোচ্চ ৫ হাজার ১৮১ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সোমবারের চেয়ে সামান্য কিছু কম ৫ হাজার ৪২ জন আক্রান্ত হয়েছে। গতকাল করোনার কারণে মৃত্যুবরণ করেছে ৪৫ জন এবং আগের দিন সোমবারও ৪৫ জন মৃত্যুবরণ করেছে। গত বছর করোনায় সর্বোচ্চ শনাক্ত ছিল ২ জুলাই ৪ হাজার ১৯ জন। সোমবারের চেয়ে গতকাল শনাক্ত কম হলেও নমুনা পরীক্ষা সাপেক্ষে সোমবারের চেয়ে গতকাল শনাক্তের হার ছিল বেশি।

গতকাল ২৬ হাজার ৬২০টি নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছে ১৮.৯৪ শতাংশ এবং মঙ্গলবার সারা দেশে ২৮ হাজার ১৯৫টি নমুনা পরীক্ষা করে শনাক্ত হয়েছে ১৮.৩৮ শতাংশ। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, দেশব্যাপী আরো বেশি নমুনা পরীক্ষা করতে পারলে এমনিতেই আরো বেশি করোনা শনাক্ত হবে। কারণ করোনা পরীক্ষার মেশিন বাড়লেও সারা দেশে নুমনা সংগ্রহ এখনো সহজ হয়নি। সবাই চাইলেও নমুনা দিতে পারছে না এখনো। এ ছাড়া গরম বাড়ার সাথে সাথে সংক্রমণ বেড়ে গেছে। এখন এটা বলা যায়, বাংলাদেশে গরমে করোনা বৃদ্ধি পায়। সামনের দিনগুলোতে গরম আরো বাড়বে এবং ধরে নেয়া যায় এখনই নিয়ন্ত্রণে কঠোর না হলে সংক্রমণ আরো অনেক বাড়বে।

ইতোমধ্যে করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকার গত সোমবার ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করেছে। নির্দেশনাগুলো না মানলে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা: মোজাহেরুল হক জানান, ‘বিপজ্জনক এ ভাইরাসটি থেকে বাঁচা এবং তা নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে। ভাইরাসটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে থাকে ফুসফুসের। এ ছাড়া ব্রেইন, হার্ট, কিডনিসহ অন্যান্য অঙ্গেরও ক্ষতি করে থাকে।’

তিনি বলছেন, ‘এমন কেউ কি আছেন যে তারা চান তাদের এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হোক? আবার ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হলে সবাইকে নয় কাউকে কাউকে কিছুদিন হাসপাতালে থাকতে হয়। নতুন করে সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় হাসপাতালে সিটও পাওয়া যাচ্ছে না এখন। এই অবস্থায় কারো উচিত হবে না এই ভাইরাসটিকে নিজের শরীরে ডেকে নিয়ে আসা এবং হাসপাতালে অবস্থান করে হাজার হাজার টাকা খরচ করা। তা না চাইলে সবারই উচিত স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলা।’

এ দিকে করোনা নিয়ন্ত্রণে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের টিকার অবশিষ্ট চালান কবে আসবে কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। গত সোমবার সকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ‘টিকার পরবর্তী চালান কবে আসবে সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন’ বলে জানান সাংবাদিকদের। যথাসময়ে টিকার পরবর্তী চালান না এলে অন্য পরিকল্পনা করার কথাও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। টিকার ব্যাপারে জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশকে টিকা দিতে পারলে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে এবং এতে দেশ থেকে করোনা বিদায় করা সম্ভব হবে।

কিন্তু বাংলাদেশে এ পর্যন্ত টিকা এসেছে মাত্র এক কোটি দুই লাখ ডোজ। এর মধ্যে ৭০ লাখ ডোজ টিকা টাকা দিয়ে কেনা আর অবশিষ্ট ৩২ লাখ ডোজ ভারত সরকারের উপহার হিসেবে পাওয়া। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সারা দেশে গত সোমবার পর্যন্ত ৫৩ লাখ ১৯ হাজার ৬৭৯ জনকে টিকা দিয়েছে। সে হিসাবে গতকাল পর্যন্ত সরকারের কাছে ৪৮ লাখ ৮০ হাজার ৩২১ ডোজ টিকা রয়েছে।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, প্রথম ডোজ টিকা নেয়ার পর শরীরে অ্যান্টিবডি সৃষ্টির জন্য অবশ্যই দ্বিতীয় ডোজ টিকা নিতে হবে। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত দ্বিতীয় ডোজ টিকা নিলেই টিকা গ্রহণকারী ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষিত থাকবেন। এই টিকা শতভাগ সুরক্ষা দেবে না। অবশ্য এ পর্যন্ত উদ্ভাবিত কোনো টিকাই গ্রহণকারীকে শতভাগ সুরক্ষা দিতে পারছে না বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে।

হঠাৎ করোনা আগের রেকর্ড অতিক্রম করায় গত সোমবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশে ভিডিও কনফারেন্স করেন দেশবাসীকে বিষয়টি অবহিত করার জন্য। এ সময় সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, প্রথম ডোজ দেয়ার পর আগামী ৮ এপ্রিল যাদের দ্বিতীয় ডোজ টিকা নেয়ার সময় হবে তাদের জন্য টিকা সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে যত মানুষ প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছেন তাদের সবার জন্য এখন দ্বিতীয় ডোজ দেয়ার মতো টিকা সরকারের হাতে নেই। সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, দ্বিতীয় ডোজ টিকা শুরু করার পর আরো চালান যেন আসে আমরা সে জন্য কাজ করছি। আমরা আশাবাদী দ্বিতীয় ডোজের টিকা শুরু করার পর আরো টিকা এসে যাবে।



গরমে ক্লান্তিহরা ডাবের পানি

ডাবের পানিতে অ্যান্টিভাইরাল ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল কার্যকারিতা থাকায় রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে

গ্রীষ্মের দুপুরে, প্রচণ্ড গরমে শরীর যখন ক্লান্ত, তখন খুব দ্রুত প্রশান্তি এনে দিতে পারে ডাবের পানি। এটি সম্পূর্ণরূপে একটি প্রাকৃতিক পানীয়। এতে কোনো কৃত্রিম রং, প্রিজারভেটিভ, ফ্লেভার—এর কিছুই থাকে না। তাই বাজারে যত কৃত্রিম পানীয় আছে, তার তুলনায় ডাবের পানি সেরা। মাটির গুণাগুণের ওপর ভিত্তি করে ডাবের পানির স্বাদ বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। ভারতের ডাবের পানি যেমন বেশ মিষ্টি হয়, তেমনি বাংলাদেশের ডাবের পানি বেশ মিষ্টি ও হালকা নোনতা স্বাদের হয়ে থাকে। আবার কোনো কোনো দেশের ডাবের পানি পানসে হয়।

ডাবের পানি অত্যন্ত উপকারী ও জনপ্রিয় একটি পানীয়। বিভিন্ন প্রাকৃতিক এনজাইম ও খনিজ উপাদানে ভরপুর এ পানীয়। ১০০ মিলি ডাবের পানিতে থাকে ১৮ ক্যালরি, ৪ মিলিগ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ১০৫ মিলিগ্রাম সোডিয়াম, ২০৫ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ২.৬ মিলিগ্রাম সুগার, ২.৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ২৪ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ০.৩ মিলিগ্রাম আয়রন ও ২৫ মিলিগ্রাম ম্যাগনেশিয়াম।

ডাবের পানির উপকারিতা :

  • ডাবের পানি তাৎক্ষণিকভাবে শরীরে প্রশান্তি দেয়। শরীরে পানির অভাব পূরণ করতে ও খনিজ পদার্থের ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে।
  • আমাদের দেহে কিছু ফ্রি-র‌্যাডিক্যাল থাকে, যা বিভিন্ন কোষকে ধ্বংস করে। ডাবের পানিতে যে অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট থাকে, তা এই কোষ ধ্বংসকে প্রতিরোধ করে।
  • গবেষণায় দেখা গেছে, ডাবের পানিতে যথেষ্ট পরিমাণে ম্যাগনেশিয়াম পাওয়া যায়, যা ইনসুলিনেরর কার্যকারিতা বাড়ায়। ফলে এটি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তাই ডায়াবেটিসের রোগীরা ডাবের পানি খেতে পারবেন।
  • কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ডাবের পানি কিডনিতে পাথর প্রতিরোধে সাহায্য করে।
  • ডাবের পানি কোলেস্টরেলের মাত্রা কমাতে বিশেষ কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
  • ডাবের পানিতে প্রচুর পটাশিয়াম থাকে, যা রক্তচাপ কমাতে ও স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। তাই উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা ডাবের পানি খেতে পারবেন।
  • ডাবের পানিতে অ্যান্টি-থ্রমবোটিক কার্যকারিতা থাকায় এটি রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধ করে।
  • ডাবের পানিতে প্রাকৃতিক এনজাইম থাকে, যা পাকস্থলীর বিভিন্ন সমস্যা, যেমন ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি দূর করতে সাহায্য করে।
  • অন্যান্য ফলের রসের তুলনায় ডাবের পানিতে কম ক্যালরি ও কম সুগার থাকে। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য যাঁরা ডায়েট করছেন, তাঁরা ডাবের পানি খেতে পারবেন।
    • ডাবের পানি হজমশক্তি বাড়ায়। ফলে এটি মেদ কমাতে সাহায্য করে। তাই ওজন কমানোর জন্য ডাবের পানি একটি উপকারী পানীয়।
    • ডাবের পানিতে পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম থাকে, যা হৃৎপিণ্ডের কার্যক্রম ঠিক রাখে এবং হৃৎপিণ্ডের সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
    • ডাবের পানিতে অ্যান্টিভাইরাল ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল কার্যকারিতা থাকায় রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
    • ডাবের পানিতে অ্যান্টি-এজিং প্রপার্টিস থাকে। ফলে ত্বকের দাগ ও বলিরেখা দূর করে এবং ত্বককে সতেজ রাখতে সাহায্য করে।

    সতর্কতা:

    কিডনি রোগী এবং যাঁদের রক্তে পটাশিয়ামের পরিমাণ বেশি, তাঁরা সপ্তাহে তিন দিন এক গ্লাস করে ডাবের পানি খেতে পারেন। তবে যেদিন ডাবের পানি খাওয়া হবে, সেদিন পটাশিয়াম আছে, এমন অন্য ফল কম পরিমাণে খাওয়া ভালো।

    এই গরমে একজন সুস্থ ব্যক্তি নিয়মিত এক গ্লাস ডাবের পানি পান করতে পারেন, যা তাঁকে সুস্থ ও সতেজ থাকতে সাহায্য করবে।