এই সময়ে ভ্রমণ কতটুকু নিরাপদ?

এই সময়ে ভ্রমণ কতটুকু নিরাপদ?

বিশ্বব্যাপী লাফিয়ে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ সরকারও হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু মানুষের মধ্যে সচেতনতার বালাই নেই। সংক্রমণ কমানোর জন্য সরকার ৫ এপ্রিল থেকে লকডাউন ঘোষণা করেছে।

এরমধ্যে ভ্রমণ করা কতটুকু নিরাপদ, সে বিষয় আজ আপনাদের জানাবো-

পর্যটকদের কি করতে হবে?

হঠাৎ করে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় এই মুহূর্তে দর্শনার্থীদের ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না। এর আগে মনে করা হচ্ছিল, করোনা ভ্যাক্সিনেই কাটবে এই মহামারি। চলতি বছরের ৫ মার্চ সিনেট ডট কমের খবরে উল্লেখ করা হয়, পর্যটন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এই এই মুহূর্তে ভ্রমণ করা সম্পূর্ণ নিরাপদ। কিন্তু সংক্রমণের গতি বেড়ে গেলে ভ্রমণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বিভিন্ন দেশের সরকার লকডাউন ঘোষণা করে। এতে দর্শনীয় স্থানগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সংক্রমণ কমে যাওয়ায় আবার খুলে দেওয়া হতে থাকে সেসব দর্শনীয় স্থান। কিন্তু গত মার্চের পর থেকে দেশে করোনা সংক্রামণ হু হু করে বাড়ছে। তাই মহামারি শেষ না হওয়া অবধি পর্যটকদের অপেক্ষা করাই উচিত।

মহামারির সময়ে ভ্রমণের ঝুঁকি

করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ায় এ মুহূর্তে ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। কারণ এমন পরিস্থিতিতে কোথাও ঘুরতে বের হলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে ঘুরার পরিকল্পনা মহামারি শেষ হওয়ার পর করলে সংক্রমণের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।

ঘরবন্দী জীবনযাপনই শ্রেয়

এ মুহূর্তে ঘরবন্দী জীবনের বিকল্প কিছু নেই। এসময় ঘরে বসে পরিবারকে সময় দেওয়া যেতে পারে। ফোনে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে পারেন। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কথা বলুন। এছাড়া পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একসঙ্গে ঘরের কাজ করুন। সময় কাটাতে পারেন বিভিন্ন ধরনের বই পড়ে। প্রয়োজনীয় কাজে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মাস্ক পরুন ও নিয়মিত স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন।

ভারতের প্রথম ইগলু ক্যাফে

ভারতে এই প্রথম এবং এশিয়ার সবচেয়ে বৃহৎ ইগলু ক্যাফে তৈরি হলো কাশ্মীরে। এমনিতেই পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দু ভূস্বর্গ কাশ্মীর। শীত থেকে গ্রীষ্ম সব সময়তেই পর্যটকদের হাতছানি দেয় জায়গাটি। সেই গুলমার্গকে পর্যটকদের কাছে দিগুণ আসক্তি করতে ভারতে এই প্রথম তৈরি হয়েছে একটি ইগলু ক্যাফে। যেখানে বরফের বাড়ির ভিতরে বসে আপনি ধোঁয়া ওঠা গরম চা বা কফিতে চুমুক দিতে পারবেন।

ইগলু বাড়ি, ক্যাফে সাধারণত শীতপ্রধান দেশে যেমন ফিনল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, কানাডাতে দেখা যায়। ভারতের মতো গ্রীষ্মপ্রধান দেশে এসব যেন কল্পনাতীত। কিন্তু সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখালেন ওখানকার এক বিখ্যাত হোটেলের মালিক ওয়াসিম শাহ।

কাশ্মীরের বারমুলা জেলার গুলমার্গে বহু সিনেমার শ্যুটিং হয়‌। শীতের সময় পর্যটকরা এখানে বেড়াতে গিয়ে স্কি খেলাতে মজেন। এই ক্যাফের মালিকের ধারণা, এবারে তার পাশাপাশি এই ইগলু ক্যাফেতে বসে চা, কফি খেয়ে, আরও মজা পাবেন পর্যটকরা। ক্যাফের মধ্যে থাকবে বরফের তৈরি চেয়ার, টেবিল। ভাবছেন বরফের তৈরি চেয়ারে কীভাবে বসবেন! তার জন্যেও আলাদা ব্যবস্থা থাকছে এখানে। ভেড়ার চামড়া, কিংবা মোটা কম্বল পেতে এমন চেয়ারে বসলে, কোনও অসুবিধাই হবে না বলে জানিয়েছেন ওয়াসিম শাহ।

ক্যাফের মালিক জানিয়েছেন, এমন ক্যাফে তৈরি করার শখ তাঁর বহুদিনের। হঠাৎই বহুদিনের পরিকল্পনা মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে এই শীতেই বাস্তবায়িত করেছেন তিনি। তবে গরমে এই ক্যাফে কিন্তু থাকবে না। শুধু শীতকালে বেড়াতে এলেই এই ক্যাফের দেখা পাবেন পর্যটকরা। ভিতরে ১৬ জনের বসার ব্যবস্থাও রেখেছেন। ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়ের বেগে ভাইরাল হয়েছে এই ইগলু ক্যাফের ছবি। বলাই বাহুল্য, পরের শীতে এখানে বসে চা, কফি খাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন লক্ষ লক্ষ ভ্রমণপিপাসু মানুষ।

করোনায় পর্যটন খাতে বেহাল দশা

করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে বিপর্যস্ত দেশের পর্যটন খাত। বৈশ্বিক মহামারীর কারণে এ খাতের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৪০ লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। আর টানা কয়েক মাসে এ খাতের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকায়। গত তিন মাসে দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকার হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্টসহ সংশ্লিষ্ট ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকায় প্রতিদিনই ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। এ অবস্থায় ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন পর্যটন খাতের ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা। খাতটি কবে নাগাদ চাঙ্গা বা স্বাভাবিক হবে তা অনিশ্চিত।

পর্যটন খাত নিয়ে এরই মধ্যে সংশ্লিষ্টরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান বলেন, ‘আমরা টোয়াবে এখন পর্যন্ত কোনো কর্মচারীকে ছাঁটাই করিনি। তবে কোনো কাজও আমরা করতে পারছি না। কোনো ভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি।’

পর্যটন খাতের সঙ্গে ট্যুর অপারেটর, ট্রাভেল এজেন্সি, হোটেল-মোটেল ছাড়াও পর্যটন স্থানকেন্দ্রিক নানা ব্যবসা জড়িত। আর এ মানুষদের সামনে এখন ঘোর অমানিশা। স্থানীয় ১ কোটি পর্যটক ছাড়াও বাংলাদেশে প্রতি বছর ৮ থেকে ১০ লাখ বিদেশি পর্যটক ঘুরতে আসেন। কিন্তু করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে বর্তমানে দেশের পর্যটন স্পটগুলোয় নেই পর্যটকের আনাগোনা। মার্চে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর থেকে পর্যটন কেন্দ্রগুলো একরকম বন্ধ রয়েছে।

প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন (পাটা) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের এক সমীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে সার্বিক পর্যটন শিল্পে ৯ হাজার ৭০৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর ফলে প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার ৫০০ জন চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। এ হিসাব করোনা সংক্রমণের আগে থেকে হওয়ায় টোয়াবের পরিমাণের থেকে কিছুটা বেশি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পর্যটননগর সিলেটে পর্যটনের সঙ্গে জড়িত প্রায় ১০ হাজার মানুষ করোনার জন্য বর্তমানে বেকার জীবন যাপন করছেন।

সেখানে অবস্থিত ১০০-এরও বেশি হোটেল, মোটেল এখন পর্যটনশূন্য। সিলেট ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হুমায়ুন কবির লিটন বলেন, ‘করোনা সংক্রমণে পর্যটক না থাকায় গত কয়েক মাসে আমাদের প্রায় ৬০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। আমরা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলকে পর্যটনের সঙ্গে জড়িত প্রান্তিক মানুষগুলোকে তৎক্ষণাৎ সহযোগিতা প্রদানের কথা বললেও এখন পর্যন্ত কোনো সহযোগিতা তাদের দেওয়া হয়নি।’

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার সভাপতি ইলিশ পার্কের উদ্যোক্তা রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, মার্চের পর থেকে সেখানকার ছোট-বড় মিলিয়ে অর্ধশতাধিক হোটেল-মোটেল বন্ধ থাকায় প্রতিদিন তাদের লোকসান হচ্ছে অর্ধ কোটি টাকা আর তিন মাসে অন্তত ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। কুয়াকাটার হোটেল-মোটেলগুলোয় অন্তত ২ হাজার শ্রমিক কাজ করছেন। তাদের বেতনসহ আনুষঙ্গিক আরও খরচ আছে কয়েক লাখ টাকা।

ভালো নেই দেশের আরেক গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্পট কক্সবাজারের হোটেল মালিক ও কর্মচারীরাও। করোনা সংক্রমণের পর কক্সবাজারে পর্যটনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত অর্ধলক্ষাধিক মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত বলে জানান কক্সবাজার হোটেল, মোটেল ও গেস্টহাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাসেম সিকদার বলেন, পর্যটনের সঙ্গে জড়িত এ মানুষগুলোর পক্ষে অন্য কোনো পেশায় যাওয়া সম্ভব নয়।

পর্যটক না আসায় অনেক হোটেলের অব্যবহৃত দামি ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী নষ্ট হতে শুরু করেছে। আবার একটি টু স্টার মানের হোটেলে গড়ে প্রতিদিন কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৩ লাখ আর পাঁচ তারকা মানের হোটেলের খরচ ১০ লাখ টাকা। কিন্তু পর্যটক না থাকলে এ খরচ হোটেলগুলোর পক্ষে দীর্ঘদিন বহন করা সম্ভব নয়। তিনি জানান, স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও সংসদ সদস্যের উদ্যোগে শিগগির যদি হোটেলের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের রেশনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয় তাহলে এ বিপদে তাদের বাঁচানো যাবে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী বলেন, ‘আমরা হোটেল-মোটেলের সব মালিকের কাছে সংকটের এই সময়ে কর্মী ছাঁটাই না করার জন্য অনুরোধ করেছি। সরকার সেবা খাতের জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দিয়েছে। এই বিপদের সময় পর্যটন খাত কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে তার জন্য চিন্তভাবনা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে আমরা করণীয় বিষয়ে ভার্চুয়াল বৈঠক করেছি।


এর বাইরে পর্যটন খাতে বিনিয়োগকারী ট্যুর অপারেটরসহ আরও ২০০ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা রয়েছেন, তাদের প্রতিদিন লোকসান হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। লকডাউনের সময় বাড়লে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। আর পর্যটন খাতের এ ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে অনেক সময় প্রয়োজন দাবি করে এ খাতে