এবার বন্যায় ৭৫ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে

 

পদ্মার পানি বাড়ায় রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের ছয়টি গ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অনেকে নৌকায় করে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটে যাচ্ছেন। গতকাল আমবাড়িয়া গ্রামে।  ছবি: প্রথম আলো

তিন দিন ধরে দেশের উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীগুলোতে বন্যার পানি নামছে। কিন্তু এর মধ্যেই উজানে ভারতীয় অংশে ভারী বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। আর তা ঢল হয়ে আগামী দুই দিনের মধ্যে দেশে আরেক দফা বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে। সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে এমন পূর্বাভাসই দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চল এবং সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি কাল থেকেই অবনতি হওয়ার আশঙ্কা আছে।

জাতিসংঘের নেতৃত্বে উন্নয়ন সংস্থাগুলো বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে একটি যৌথ জরিপ করেছে। গত শনিবার প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে মৌসুমি বন্যার প্রভাব’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ২১ জেলার ৭৫ লাখ ৩০ হাজার মানুষ চলতি বন্যার কবলে পড়তে পারে। এদের মধ্যে ৩৮ লাখই নারী। পুরোপুরি বাস্তুচ্যুত হতে পারে ২ হাজার ৮৩৩ জন।

দেশের কোন এলাকার মানুষ কী পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তার একটি ধারণাও দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে রাজধানী ঢাকার মানুষ। এই শহরের ১৬ লাখ ৪৮ হাজারমানুষ বন্যার কবলে পড়তে পারে। এরপরই রয়েছে বগুড়া, জামালপুর, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ জেলা। এসব জেলায় তিন লাখের ওপরে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

জানতে চাইলে ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যাক্টরস বাংলাদেশের (নাহাব) উপদেষ্টা ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ আবদুল লতিফ প্রথম আলোকে বলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আসন্ন ঈদের আগে বন্যার পানি নামছে না। এখন বন্যার্তরা যে খাদ্য ও ত্রাণসহায়তা পাচ্ছে, ঈদের ছুটির মধ্যে তা পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। কারণ, সরকারি অফিস ও স্বেচ্ছাসেবকদের বড় অংশ তখন ছুটিতে থাকবে। তাই ওই সময়ের কথা চিন্তা করে বন্যাপ্রবণ এলাকায় ত্রাণের মজুত করতে হবে।

এদিকে জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত সংস্থা ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো বন্যার্তদের সহযোগিতায় একটি কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। এ সপ্তাহের মধ্যে এই সংস্থাগুলোকে নিয়ে সরকারের একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বন্যা মোকাবিলায় উন্নয়ন সংস্থাগুলো সামনের দিনে কী ধরনের কাজ করবে, তা আলোচনা হবে এ বৈঠকে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আতিকুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন পর্যন্ত সরকার একাই কাজ করছে। উন্নয়ন সংস্থাগুলো কীভাবে এ কাজে এগিয়ে আসতে পারে, তা নিয়ে আমরা দ্রুত বৈঠকে বসছি। দরকার হলে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নেওয়া হবে।

সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, বর্তমানে দেশের ১৮ জেলায় বন্যার পানি আছে। উজানে ও দেশের ভেতরে বৃষ্টি বেড়ে যাওয়ায় আগামীকাল থেকে এসব জেলার বন্যা পরিস্থিতির তো অবনতি হবেই, একই সঙ্গে আরও কয়েকটি নতুন জেলার পানি প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকা, পদ্মা ও হাওর এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি সবচেয়ে বেশি হতে পারে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূইয়া প্রথম আলোকে বলেন, আগামী দু-এক দিনের মধ্যে পানির যে ঢল আসছে, তাতে দেশের উত্তর থেকে মধ্যাঞ্চল এবং হাওর এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

বাংলাদেশের বন্যাবিষয়ক জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আগামী ১০ দিনে পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি ধারণা দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বন্যার পূর্বাভাস দেওয়া প্রতিষ্ঠান ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ১০ দিনের মধ্যে ভারতের আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে প্রায় এক হাজার মিলিমিটার বৃষ্টি হতে পারে। এতে তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র দিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ওই পানি বাংলাদেশে থাকতে পারে। এখন পর্যন্ত চলমান বন্যা ১৯৮৮ সালের মতো ক্ষতিকর হওয়ার আশঙ্কা আছে। তবে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বন্যার পানি থাকলে তা হবে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বর্তমানে ২৪ লাখ মানুষ বন্যায় আক্রান্ত। ৫ লাখ ৪৮ হাজার ৮১৬টি পরিবার অর্থাৎ প্রায় ২৮ লাখ মানুষের বাড়িঘর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বন্যার্তদের জন্য ১ হাজার ১০০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে সমাজের দুর্বল অংশের জনগোষ্ঠীর ক্ষয়ক্ষতির একটি সম্ভাব্য হিসাব দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এই বন্যায় ১১ হাজার প্রতিবন্ধী, ২৪ হাজার নবজাতক, ২৪ লাখ ৮০ হাজার শিশু-কিশোর (৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী), ৬১ হাজার বয়স্ক মানুষ ও ২২ হাজার গর্ভবতী নারী ক্ষতির মুখে পড়বে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত প্রথম আলোকে বলেন, ফি বছর বন্যায় আক্রান্ত জেলাগুলোর বেশির ভাগই দারিদ্র্যের দিক থেকে সবচেয়ে নিচের দিকে থাকা এলাকা। এসব জেলার মানুষেরা বন্যায় একবার ক্ষতির মুখে পড়লে তা পূরণ করার সামর্থ্য তাদের থাকে না। এ জন্য বন্যার্ত মানুষের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা এখন থেকেই এমনভাবে করতে হবে, যাতে পানি নেমে যাওয়ার পর তারা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।

দেশে ৭৮ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে

 

প্রতীকী ছবি।

২০১৮ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় যে পাঁচটি দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি অভ্যন্তরীণভাবে ঘরবাড়িছাড়া বা বাস্তুচ্যুত হয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ। ওই বছর মূলত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৭৮ হাজারের বেশি মানুষ। তাদের বেশির ভাগ শহরের বস্তি এলাকায় এসে বসবাস করছে। বাস্তুচ্যুতদের অধিকার ও উন্নয়নবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টারের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

গত শুক্রবার প্রকাশিত ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট (গ্রিড)-২০১৯’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৮ সালে বিশ্বের ১৪৮টি দেশের ২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যার ৬০ শতাংশই ফিলিপাইন, চীন ও ভারতে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতে ২৮ লাখ ৪৪ হাজার, আফগানিস্তানে ৮ লাখ ৭ হাজার, শ্রীলঙ্কায় ১ লাখ ১ হাজার ১০০, বাংলাদেশে ৭৮ হাজার ৩০০ ও নেপালে ১২ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

তিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গত জুনে হাওরাঞ্চলে হঠাৎ বন্যার কারণে ১২ হাজার ও শরীয়তপুরের নড়িয়ায় নদীভাঙনের কারণে ৪৪ হাজার মানুষ ঘরবাড়িছাড়া হয়েছে। বাকিরা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে নদীভাঙন, উপকূলীয় এলাকায় জলোচ্ছ্বাসে বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অন্যত্র চলে গেছে। এর বাইরে সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৩০০ জন।

ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘নদীভাঙন ও নানা দুর্যোগে যারা বাড়িঘরছাড়া হয়, তাদের আমরা অন্যত্র বাড়িঘর করে দিই। কিন্তু তাদের অনেকে সেখানে থাকতে চায় না। আমরা পুনর্বাসন এলাকায় জীবিকার ব্যবস্থা করছি।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুতরা মূলত বড় বস্তিগুলোতে ওঠে। ভোলা থেকে নদীভাঙনের শিকার হয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকার মিরপুরে ভোলা বস্তিতে উঠেছে। এ ছাড়া কড়াইল বস্তিসহ রেললাইনের পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছে। যেসব বস্তি এলাকায় বাস্তুচ্যুতরা থাকে, সেই এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছে। ফলে সেখানে নানা ধরনের রোগবালাই দেখা দিচ্ছে।

 এ বছর যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা সংস্থা এনভায়রনমেন্টাল জাস্টিস ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাস্তুচ্যুত হয়ে রাজধানীতে আসা মানুষের বেশির ভাগই দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় জেলা খুলনা, বরিশাল ও সাতক্ষীরার বাসিন্দা। এরা রাজধানীর অনানুষ্ঠানিক খাত যেমন রিকশা চালানো ও দিনমজুরের কাজ করছে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত প্রথম আলোকে বলেন, এই প্রতিবেদনে মূলত যাঁরা স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, তাঁদের গণনা করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতিবছর উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ নদীভাঙন ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে অস্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। প্রথমে পরিবারের পুরুষ মানুষ যায়, পরে পরিবারের অন্যদের নিয়ে যায়। এভাবে আস্তে আস্তে অনেকে প্রতিবছর বাস্তুচ্যুত হয়ে যায়। ফলে তাদেরও হিসাবে আনতে হবে। তাদেরও জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে।

আগস্ট পর্যন্ত বন্যা স্থায়ী হবে

বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। ২১ জেলায় ৩০ লাখের বেশি মানুষ এখন পানিবন্দী। আগস্ট পর্যন্ত বন্যার পানি থাকবে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। ইতিমধ্যে বন্যার্ত মানুষের মধ্যে বিপদ হয়ে হাজির হয়েছে রোগবালাই। সরকারি হিসাবেই গত তিন সপ্তাহে বন্যার পানিতে ডুবে ও সাপের কামড়ে ৮৬ জন মারা গেছে। এরই মধ্যে পানিবাহিত নানা রোগে ৬ হাজার ৩৮০ জন আক্রান্ত হয়েছে।

 

প্রথম আলো ফাইল ছবি

বাংলাদেশ, ভারত, নেপালে মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা। করোনার কারণে তিন মাস ধরে অর্থনৈতিকভাবে বিপদে থাকা মানুষ এখন দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কবলে

বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। ২১ জেলায় ৩০ লাখের বেশি মানুষ এখন পানিবন্দী। আগস্ট পর্যন্ত বন্যার পানি থাকবে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। ইতিমধ্যে বন্যার্ত মানুষের মধ্যে বিপদ হয়ে হাজির হয়েছে রোগবালাই। সরকারি হিসাবেই গত তিন সপ্তাহে বন্যার পানিতে ডুবে ও সাপের কামড়ে ৮৬ জন মারা গেছে। এরই মধ্যে পানিবাহিত নানা রোগে ৬ হাজার ৩৮০ জন আক্রান্ত হয়েছে।

দেশের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগও বাড়ছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা দুদিন আগে বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে উৎকণ্ঠা জানিয়ে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা রেডক্রসের এশিয়া কার্যালয় থেকে গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, বন্যায় বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। এই অঞ্চলে এখন পর্যন্ত ৯৬ লাখ মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে সংস্থাটি বলেছে, করোনার কারণে তিন মাস ধরে অর্থনৈতিকভাবে বিপদে থাকা এসব মানুষ এখন দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কবলে পড়েছে। এতে গ্রামীণ জনপদে দারিদ্র্য আরও বেড়ে খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে।

‘ডুবে থাকা ৯৬ লাখ মানুষের মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হচ্ছে’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩ দেশে বন্যায় এরই মধ্যে ৫৫০ জন মারা গেছে। বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা পানিতে ডুবে আছে। বন্যার্ত মানুষের সহায়তায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে রেডক্রস।

তবে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মহসিন এ ব্যাপারে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটি একটি স্বাভাবিক বন্যা। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছে। আমরা সব বন্যার্ত মানুষের পাশে আছি। নিয়মিত ও প্রয়োজনীয় খাদ্যসহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। ফলে মানবিক বিপর্যয়ের কোনো আশঙ্কা নেই।’

রেড ক্রিসেন্ট বাংলাদেশের দুর্যোগে সাড়াদান বিভাগের পরিচালক মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, করোনা আর বন্যা ছাড়াও দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের মানুষ ঘূর্ণিঝড় আম্পানেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরপর তিনটি দুর্যোগে তাদের মধ্যে খাদ্যের পাশাপাশি আশ্রয়ের সংকট দেখা দিতে পারে।

এদিকে জাতিসংঘ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশবিষয়ক সংস্থা নাসার সহায়তায় বাংলাদেশের বন্যায় আক্রান্ত এলাকাগুলোর ওপর একটি মানচিত্র প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে আগামী সপ্তাহে বন্যা কত এলাকায় ছড়াবে এবং কত দিন থাকতে পারে, তার একটি ধারণা দেওয়া হয়েছে। ওই প্রতিবেদন ধরে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ দল মনে করছে, বাংলাদেশের বন্যার পানি নামতে আগস্ট মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। এই বন্যা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে যাচ্ছে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে বৈঠক

গতকাল দেশের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে জরুরি বৈঠক হয়। দেশের বন্যা বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানেরা এতে উপস্থিত ছিলেন। বন্যা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উপস্থিত বাংলাদেশ সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) নির্বাহী পরিচালক মালিক ফিদা আবদুল্লাহ বলেন, এই বন্যা বেশি এলাকাজুড়ে না হলেও স্থায়িত্বের দিক থেকে দীর্ঘ হবে বলে মনে হচ্ছে। তাই এই সময়ে পানিবন্দী মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও ত্রাণের ব্যবস্থাপনাকে আগে গুরুত্ব দিতে হবে।

বৈঠকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বন্যা মোকাবিলায় আমরা অবকাঠামো নির্মাণের কথা বেশি চিন্তা না করে বাঁধগুলো যাতে টেকসই হয়, সেদিকে মনোযোগ দিতে পারি। কারণ, বন্যার্ত মানুষের বেশির ভাগই আশ্রয়কেন্দ্রে না গিয়ে বেড়িবাঁধে অবস্থান করছে।’

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের চেয়ারপারসন ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, করোনার মতোই বন্যার ক্ষেত্রেও সরকার শুরু থেকেই আমলাদের দিয়ে সংকীর্ণ পথে এগোচ্ছে। সরকারি সংস্থা ও দলীয় কর্মীদের দিয়ে বন্যা মোকাবিলার এই প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি উৎসাহিত হচ্ছে এবং অব্যবস্থাপনা বাড়ছে। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে ত্রাণ চুরি ও অনিয়মের যেসব খবর আমরা পাচ্ছি, তাতে দলীয় লোকদের সম্পৃক্ততার তথ্য বেরিয়ে আসছে। এভাবে চললে সামনের দিনের পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।’

হোসেন জিল্লুর আরও বলেন, ঐতিহাসিকভাবে সামাজিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিশ্বে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। ফলে এই বন্যাতেও সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিপর্যায়ের উদ্যোগকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে হবে।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে গত ৩০ জুন থেকে গতকাল পর্যন্ত ৮৬ জন বন্যায় মারা গেছে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে জামালপুরে। এ জেলায় ২৩ জন বন্যার পানিতে ডুবে ও অন্যান্য কারণে মারা গেছে। সেখানে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছে ২৮৯ জন। কুড়িগ্রাম জেলা অবশ্য আক্রান্তের দিক থেকে শীর্ষে (৬৫৬ জন); আর মারা গেছে ১৮ জন। এরপরই গাইবান্ধায় ৪৩৬ জন রোগে আক্রান্ত ও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। রোগের মধ্যে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাই বেশি, আর মৃত্যু হওয়া ৮৬ জনের মধ্যে ৭১ জন পানিতে ডুবে মারা গেছে।

সোমবার পর্যন্ত পানি বাড়বে

দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের গ্রামগুলো একেকটি পানির মধ্যে জেগে থাকা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো জেগে আছে। বন্যার্ত দুর্গম এলাকায় খাদ্যের পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানিরও সংকট দেখা দিয়েছে; বিশেষ করে চর এলাকার বেশির ভাগ ডুবে গেছে। এসব এলাকায় ত্রাণও কম পৌঁছাচ্ছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, আগামী সোমবার পর্যন্ত পানি বাড়তে পারে। তারপর ধীরে ধীরে কমতে পারে।

পূর্বাভাস কেন্দ্রের হিসাবে, আজ বৃহস্পতিবার তিস্তা অববাহিকার ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। ঢাকা জেলার ডেমরায় আজকের মধ্যে বন্যার পানি ঢুকে পড়বে।

র্জাতিক উদ্বেগও বাড়ছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা দুদিন আগে বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে উৎকণ্ঠা জানিয়ে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা রেডক্রসের এশিয়া কার্যালয় থেকে গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, বন্যায় বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। এই অঞ্চলে এখন পর্যন্ত ৯৬ লাখ মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে সংস্থাটি বলেছে, করোনার কারণে তিন মাস ধরে অর্থনৈতিকভাবে বিপদে থাকা এসব মানুষ এখন দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কবলে পড়েছে। এতে গ্রামীণ জনপদে দারিদ্র্য আরও বেড়ে খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে।

দেশে তিন মাস ধরেই বৃষ্টি বেশি

চলতি বছরে বৃষ্টি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হচ্ছে। ছবি: প্রথম আলো

বর্ষাকালে বৃষ্টি হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এবার বৃষ্টি বুঝি একটু নির্দয়ভাবেই ঝরছে। একদিকে উজান থেকে আসা বন্যা, অন্যদিকে উজান-ভাটিতে সমানতালে তুমুল বৃষ্টি। বাংলাদেশ তো বটেই, ভারত-নেপাল থেকে চীন পর্যন্ত এই বৃষ্টির দাপট শুরু হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, তুমুল বৃষ্টি আরও দুই দিন হতে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, চলতি বছরে বৃষ্টি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হচ্ছে। গত মে মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ১৭ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। জুনে তা একটু কমলেও স্বাভাবিকের চেয়ে ২ শতাংশ বেশি ছিল। আর জুলাই মাস এখনো শেষ না হলেও এ পর্যন্ত যা বৃষ্টি হয়েছে, তা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩০ শতাংশ বেশি।

এই বাড়তি বৃষ্টি মে-জুন মাসে ফসলের জন্য শক্তি জুগিয়েছে, এবার প্রায় সব ফসলেরই বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু জুলাই মাসের বাড়তি বৃষ্টি বন্যার তীব্রতাকেই শুধু বাড়াচ্ছে না, একই সঙ্গে রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোতে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ তৈরি করছে। আবার মাঠে থাকা সবজিসহ অন্যান্য ফসলের জন্য বিপদ ডেকে এনেছে।

আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, সাধারণত দুই থেকে তিন বছর পরপর মৌসুমি বায়ু অনেক শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তখন বৃষ্টি বেশি হয়। এ বছরটা সেই শক্তিশালী মৌসুমি বায়ুর মধ্যে পড়েছে। মৌসুমি বায়ু ভারত ও বাংলাদেশে প্রবেশ করে সাধারণত আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগর দিয়ে। আরব সাগরের বায়ু ভারতের গুজরাট ও মহারাষ্ট্র দিয়ে প্রবেশ করে মধ্যপ্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে বৃষ্টি ঝরায়। আর বঙ্গোপসাগর থেকে আসা মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের টেকনাফ, ভারতের মিজোরাম ও মিয়ানমারের আরাকান উপকূল দিয়ে প্রবেশ করে। সাধারণত মৌসুমি বায়ুর এই দুটি ধারা একসঙ্গে শক্তিশালী হয় না, সংযুক্তও হয় না। যে বছর তা ঘটে, সেই বছর বাংলাদেশ, ভারত, নেপালসহ পুরো অঞ্চলে টানা বৃষ্টি ও বন্যা হয়।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক প্রথম আলোকে বলেন, আরব সাগর থেকে আসা মৌসুমি বায়ু ভারতের গুজরাট থেকে আশপাশের এলাকায় বিস্তৃত হয়েছে। একই সময়ে বঙ্গোপসাগরের মৌসুমি বায়ুও বেশ শক্তিশালী অবস্থায় আছে। এ কারণে এবারের বৃষ্টি ও বন্যাটা প্রকোপ একটু বেশি হবে।

বন্যা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত-নেপাল ও চীনের বৃষ্টির বড় অংশ ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বাংলাদেশে বন্যার পানি ৯৩ শতাংশ উৎস হচ্ছে ওই উজানের বৃষ্টির ঢল। বাংলাদেশের ভেতরের বৃষ্টি বন্যায় মাত্র ৭ শতাংশ পানির জোগান দেয়। আর এই পুরো অঞ্চলের বৃষ্টির পানি বঙ্গোপসাগরে নামার সবচেয়ে বড় পথ হচ্ছে বাংলাদেশ। এবার মৌসুমি বায়ু শক্তিশালী হওয়ায় এবং বৃষ্টি বেশি হওয়ায় নদ-নদীগুলো আগে থেকেই পানিতে পরিপূর্ণ ছিল। এক মাস ধরে থেমে থেমে ভারী বৃষ্টির ফলে তা বন্যায় রূপ নিয়েছে।

গতকাল দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় ৮০ থেকে ১২২ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে সিরাজগঞ্জে, ১২২ মিলিমিটার। রাজধানীতে বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ৮৭ মিলিমিটার। এই বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন অংশে জলাবদ্ধতার কারণে গতকাল দুপুর পর্যন্ত যান চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। এতে নগরবাসীকে দুর্ভোগে পড়তে হয়।

বন্যা পরিস্থিতি

দেশের ২০টি জেলার ৩০ লাখের বেশি মানুষ বন্যার কারণে এখন পানিবন্দী অবস্থায় আছে। বন্যায় এখন পর্যন্ত মারা গেছে ২২ জন। বন্যার ভয়াবহতা বাড়লেও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানুষের উপস্থিতি বাড়েনি। গত তিন দিনে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।

সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আজ বুধবার ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, যমুনা ও পদ্মা অববাহিকায় পানি দ্রুত বাড়তে পারে। এতে নদীতীরবর্তী ২০টি জেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। সংস্থাটি দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর ১০১টি পয়েন্টে পানির উচ্চতা মাপে, তাতে দেখা গেছে, গতকাল ২৮টি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, বন্যার যে আরেকটি ঢল শুরু হয়েছে, তাতে আগামী তিন-চার দিন ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার পানি বাড়বে। দেশের ভেতরেও ভারী বৃষ্টি শুরু হওয়ায় উজানের পানির সঙ্গে মিশে তা বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাতে পারে।

হোটেলে বাস আর নয়, সরকারি প্রতিষ্ঠানে থাকবেন চিকিৎসক–নার্স

হোটেলে বাস আর নয়, সরকারি প্রতিষ্ঠানে থাকবেন চিকিৎসক–নার্স

কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসাসেবার সঙ্গে জড়িত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসিক হোটেলে থাকতে হবে না। ঢাকা মহানগরে কর্মরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নির্ধারিত ছয়টি সরকারি প্রতিষ্ঠানে থাকতে পারবেন। আর ঢাকা মহানগরের বাইরের জেলা–উপজেলার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে সরকারি প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে অবস্থান করবেন।

তবে কেউ সরকারি আবাসন সুবিধা গ্রহণ করতে না চাইলে ভাতা পাবেন। ঢাকা মহানগরের একজন চিকিৎসক দৈনিক ২ হাজার টাকা, নার্স ১ হাজার ২০০ টাকা এবং অন্যরা ৮০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। ঢাকার বাইরের চিকিৎসকেরা দৈনিক পাবেন ১ হাজার ৮০০ টাকা, নার্স ১ হাজার টাকা এবং অন্যরা পাবেন ৬৫০ টাকা করে। কেউ এক মাসে ১৫ দিনের বেশি এ ভাতা পাবেন না।

কোভিড–১৯ চিকিৎসার জন্য সারা দেশে নির্ধারিত হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রে ৫ হাজার ৭২৬ জন চিকিৎসক, ১০ হাজার ৪ জন নার্স, ৭ হাজার ৫১৬ জন স্বাস্থ্যকর্মীসহ মোট ২৩ হাজার ২৮৫ জন সম্পৃক্ত রয়েছেন। সবাই ভাতা নিতে চাইলে মাসে প্রায় ৪০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে এ–সংক্রান্ত আদেশ জারির জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি চেয়ে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমতি পেলে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।

ঢাকা মহানগরে ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে আবাসন সুবিধার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন) একাডেমি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যানেজমেন্ট, জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমি, ন্যাশনাল একাডেমি অব এডুকেশনাল ম্যানেজমেন্ট, টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ও জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউট।

ঢাকা মহানগরের বাইরে জেলা–উপজেলার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে সেখানে অবস্থিত বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান বা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে এমন ব্যবস্থা করা হবে।

প্রস্তাব পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক প্রথম আলোকে বলেন, ‘একেকজন একেক রকম হোটেলে থাকেন, তাতে সমালেচনা হয়। আবার সব জেলা-উপজেলায় হোটেলও নেই। তাই আমরা ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেই ভাতা তাঁরা যেভাবে চান, ব্যবহার করতে পারবেন। তাঁরা বাসায় থাকুন বা হোটেলে থাকুন, সেটা তাঁদের বিষয়।’ বিল নিয়ে সমালোচনার কারণে কি এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? জবাবে মন্ত্রী বলেন, হোটেল থেকে আসলে তেমন বিল আসেনি। তাঁদের ভাতা দিয়ে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। আর ভাতা না নিলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে থাকতে পারবেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সূত্র জানায়, তাঁদের আলাদাভাবে থাকার জন্য ভাড়ার ভিত্তিতে আবাসিক হোটেল ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু হোটেলে থাকার যে বিল আসছে, তাতে করে সরকারের ব্যয় বেশি হচ্ছে। গত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাসে কোয়ারেন্টিন খাতে অর্থ বিভাগ থেকে ছাড় করা অর্থের পরিমাণ ছিল ১০৩ কোটি ৯ লাখ টাকা। এত বিপুল বরাদ্দ সত্ত্বেও সব স্বাস্থ্যকর্মী এর সুবিধা পাননি। এ নিয়ে সমালোচনা হয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সরকারি আবাসিক স্থাপনা, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ইত্যাদিতে চিকিৎসকদের আবাসন ব্যবস্থা করার সুযোগ রয়েছে। ঢাকা শহরের বিয়ামসহ অন্য কয়েকটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে একজনের খাওয়া–থাকাসহ তিন হাজার টাকা প্রয়োজন হবে। বড় বড় নগরীতে, এমনকি জেলা সদরেও এ ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই এর শতভাগ ব্যবস্থাপনা ও সন্তুষ্টি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। সে ক্ষেত্রে একটি বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে যেসব স্বাস্থ্যকর্মী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার আবাসন সুযোগ গ্রহণ করবেন না, তাঁদের কমর্কালীন দৈনিক ভাতা দেওয়া হবে।

মন্ত্রণালয়ের দুজন ঊর্ধ্বতন কমর্কর্তা জানান, করোনা চিকিৎসার সঙ্গে সম্পৃক্ত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য একটি নীতিমালা ও কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থাপনার একটি পদ্ধতি নির্ধারণ করা হবে। তাঁরা সাধারণভাবে একাধারে ১৫ দিনের বেশি দায়িত্ব পালন করবেন না। প্রতি মাসে ১৫ দিন দায়িত্ব পালন শেষে পরবর্তী ১৫ দিন তাঁরা সঙ্গনিরোধ ছুটিতে থাকবেন।

ঢাকার নিম্নাঞ্চলে বাড়ছে পানি

দুই দিন আগেও এ আঙিনায় হেঁটেই চলাচল করা যেত। এখন নৌকাই একমাত্র ভরসা।

পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিতে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে ঢাকার চারপাশে নদীর পানি বাড়ছে। সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকার মধ্যে পানি চলে আসতে পারে। উজানের ঢলে ও বৃষ্টিতে ইতিমধ্যে পানি বাড়তে শুরু করেছে রাজধানী ঢাকার নিম্নাঞ্চলগুলো। ছবিতে সাঁতারকুল, নন্দীপাড়া, নওয়াজবাগ এলাকার পানিবন্দী মানুষের জীবনযাত্রা।

কুয়াকাটা সৈকতে ভেসে এলো বিরল প্রজাতির কচ্ছপ

পর্যটন নগরী কুয়াকাটা সৈকতে ভেসে এসেছে একটি বিরল প্রজাতির কচ্ছপ। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট থেকে পূর্ব দিকের সৈকতে স্থানীয় লোকজনের নজরে আসে কচ্ছপটি। ডান পায়ে ক্ষত নিয়ে আসা কচ্ছপটি দেখতে স্থানীয় লোকজন ভিড় জমাচ্ছে সৈকতে।

স্থানীয়রা জানান, আজ সকালে কচ্ছপটি ভেসে আসে। কচ্ছপটি অসুস্থ এবং ডান পায়ে ক্ষত রয়েছে।

জেলে মোঃ বেলাল বলেন, কচ্ছপটি জেলেদের জালে আটকা পড়ে এবং এক পর্যায়ে জাল ছিঁড়ে মুক্ত হয়ে পায়ে ব্যাথা পাওয়ায় অসুস্থ হয়ে তীরে চলে আসে। কচ্ছপটির ওজন আনুমানিক ২০ কেজি।

কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক (এসআই) মাহামুদ হোসেন মোল্লা জানান, স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে দ্রুত তিনি সৈকতে গেছেন। কচ্ছপটির ডান পায়ে ক্ষত রয়েছে এবং অসুস্থ কচ্ছপটি এখন নড়াচড়া করতে পারছে না। তিনি বিষয়টি বন বিভাগে অবহিত করেছেন।

অর্থনৈতিক মন্দায় দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান

অর্থনৈতিক মন্দার মুখে পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) প্রভাবে ধস নেমেছে অর্থনীতিতে। ৫৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে এসেছে দেশটির রপ্তানির হার। দেশটির অর্থনীতির প্রায় ৪০ শতাংশই রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এশিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির এই দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) গত বছররের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে ২.৯ শতাংশ। ১৯৯৮ সালের পর জিডিপিতে সবচেয়ে বড় পতন এটি। এ খবর দিয়েছে বিবিসি।

খবরে বলা হয়, সম্প্রতি প্রকাশিত সরকারি উপাত্ত অনুসারে, দক্ষিণ কোরিয়ার পাশাপাশি মন্দার মুখে পড়েছে জাপান ও সিঙ্গাপুরও।

তবে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থমন্ত্রী হং নাম-কি প্রত্যাশা প্রকাশ করেছেন যে, দ্রুতই এই অবস্থা থেকে উত্তরণ করতে পারবে দেশটি। তিনি বলেন, মহামারিটির সংক্রমণ কমছে, স্কুল ও হাসপাতাল ফের খুলছে। ফলে মোট উৎপাদন বাড়ছে। তৃতীয় প্রান্তিকে চীনের মতো উত্তরণ দেখা সম্ভব আমাদের পক্ষে।

উল্লেখ্য, এখন অবধি করোনা মহামারির প্রভাব কাটিয়ে উঠতে ২৩ হাজার ১০০ কোটি ডলার প্রণোদনা দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার। করোনার প্রভাবে অর্থনৈতিক মন্দার মুখে পড়েছে আরো অনেক দেশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রপ্তানি হার সর্বনিম্নে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ায়। জুনে শেষ হওয়া অর্থবছরে ৬ হাজার ১৩০ কোটি ডলার বাণিজ্য ঘাটতির মুখে পড়েছে দেশটি। দেশটির অর্থমন্ত্রী জশ ফ্রাইডেনবার্গ জানিয়েছেন, এই ঘাটতি আরো বাড়বে।

এদিকে, মে মাসে ২০১৫ সালের পর প্রথমবারের মতো অর্থনৈতিক মন্দায় পতিত হয়েছে জাপান। গত সপ্তাহে প্রকাশিত সরকারি উপাত্তে দেখা গেছে, বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে মন্দার মুখে পড়েছে সিঙ্গাপুরও। তবে গত সপ্তাহে চীন জানিয়েছে, মন্দায় পড়া ঠেকাতে পেরেছে তারা। দ্বিতীয় প্রান্তিকে তাদের অর্থনীতি বেড়েছে ৩.২ শতাংশ।