সুন্দরবনে বেড়েছে বাঘের বিচরণ

সুন্দরবনে বেড়েছে বাঘের বিচরণ

২০১৫ ও ২০১৮ সালে বাঘ জরিপে পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে বাঘের সংখ্যা কম ছিল। গত দুই-এক বছরে বনে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইদানীং ওই এলাকায় বাঘের অবস্থান দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের সময় পুরো সুন্দরবন পানিতে ডুবে

যায়। তখন বনের অভ্যন্তরে বনবিভাগের পুকুরপাড়ে বাঘের অবস্থান দেখা গেছে। এ ছাড়া কাছাকাছি সময়ে বাঘের আক্রমণে পশ্চিম সুন্দরবনের কয়েকটি স্থানে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। এতে বাঘের সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করেন সুন্দরবন পশ্চিম বনবিভাগের কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেন।

তিনি বলেন, ২০১৫ সালে ‘ক্যামেরা ট্র্যাপিং’ পদ্ধতিতে বনবিভাগের জরিপে সুন্দরবনে ১০৬টি বাঘ দেখা যায়। এরপর ২০১৮ সালে ইউএসএইড বাঘ প্রকল্পের আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ের জরিপে বনে ১১৪টি বাঘ দেখা যায়। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেন বলেন, ২০১৫ সালের জরিপকে বেজলাইন (ভিত্তি) ধরে গবেষণায় ৪২ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প যাচাই-বাছাই পর্যায়ে রয়েছে। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাঘের সংখ্যা বেড়েছে। চলতি বছর তৃতীয় পর্যায়ে জরিপ হওয়ার কথা রয়েছে। ওই জরিপে বনে বাঘের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে। নতুন গবেষণায় বাঘ জরিপ ছাড়াও বাঘের শিকার হরিণ ও শূকর কি পরিমাণ আছে তা দেখা হবে। বাঘের আবাসস্থল নিয়েও গভীর পর্যবেক্ষণ থাকবে। যেখানে সুন্দরি গাছ বেশি আছে, সেখানে বাঘ থাকতে পছন্দ করে নাকি কেওড়া গাছ বেশি সেখানে থাকে। ট্র্যাপিংয়ের জন্য কিছু ক্যামেরাও কিনতে হবে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য বাঘের বর্ধিত সংখ্যাটা ধরে রাখা, ন্যূনতম বাঘ যেন না কমে। বন কর্মকর্তারা বলছেন, সুন্দরবনের করমজল ও কলাগাছিয়ায় যেভাবে হরিণ, কুমির, কচ্ছপের ব্রিডিং গ্রাউন্ড হয়েছে একইভাবে বনে একটি বড় এলাকাকে বাঘের অভয়ারণ্য করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সেক্ষেত্রে বনের কটকা ও নীলকমল অংশকে বাঘের ব্রিডিং গ্রাউন্ড বিবেচনায় রাখা হয়েছে। তবে এটি এখনো প্রস্তাবনা আকারে নেওয়া হয়নি। জানা যায়, ২০১৫ সালে জরিপে দেখা গেছে, একটি বাঘ সুন্দরবনে ১৫-১৭ স্কয়ার কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত ঘোরে। ফলে ব্রিডিং গ্রাউন্ডের জন্য নদী ও খাল থাকায় বিশাল এলাকাকে কীভাবে আটকানো যায় বা ‘ন্যাচারাল ব্রিডিং’-এর জন্য কীভাবে বাঘ-বাঘিনীকে একই জায়গায় রাখা যায় সে নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।  জানা যায়, এ বছর ১৬ মার্চ পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের পায়রাটুনি এলাকায় বাঘের আক্রমণে আবুল কালাম নামে এক বাওয়ালি নিহত হয়েছেন। পায়রাটুনি এলাকায় গোলপাতা কাটার সময় রয়েল বেঙ্গল টাইগার আক্রমণ করে তাকে। এরপর ১৪ এপ্রিল বনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের হোগলদড়া খাল এলাকায় মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে হাবিবুর রহমান নামে এক মৌয়াল নিহত ও হলদিবুনিয়ার আমড়াতলি এলাকায় আরেকটি বাঘের আক্রমণে রবিউল ইসলাম শেখ আহত হন। এদিকে সুন্দরবনে বাঘ টিকিয়ে রাখতে নানারকমের চ্যালেঞ্জের কথা বলছেন বাঘ গবেষকরা। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. নাজমুস সাদাত জানান, সুন্দরবনের ভিতরে ভেসাল চলাচল ও মুভমেন্ট বন্ধ করতে হবে। বাঘ নিরিবিলি থাকতে পছন্দ করে। পিকনিক পার্টি বনের মধ্যে উচ্চশব্দে মাইক বাজাতে থাকে- এসব নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তিনি বলেন, প্রথমত. বন থেকে চোরা শিকারি তাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত. পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষা করতে হবে। ইকো সিস্টেমে কোনো একটা অংশে ব্যাঘাত হলে তার প্রভাব বাঘের ওপর পড়ে। এ ছাড়া বনে মিষ্টি পানির প্রবাহ রাখতে হবে। মিষ্টি পানির অভাবে লবণাক্ততা বাড়লে গরান বনের আধিক্য বাড়বে, পরিবেশ পরিবর্তন হবে। ফলে বাঘের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হবে। জানা যায়, জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রতি বছরের মতো আগামীকাল বিশ্ব বাঘ দিবস পালিত হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠানসূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.