শ্রমিকদের ভাগ্য এখন সৌদি নিয়োগকর্তাদের হাতে

শ্রমিকদের ভাগ্য এখন সৌদি নিয়োগকর্তাদের হাতে
এ বছর জানুয়ারির ১০ তারিখে ছুটিতে দেশে আসেন বরিশালের রমজান সিকদার। রিটার্ন টিকিট অনুযায়ী ৩০ মার্চ সৌদিআরব ফেরার কথা থাকলেও করোনার কারণে আর যাওয়া হয়নি। এদিকে এপ্রিলের ৫ তারিখ ছুটির সাথে ফুরিয়েছে তার ভিসার মেয়াদ। শুধু কি তাই? অল্প ক’দিনেই ফুরিয়ে গেছে এই শ্রমিকের মরু রোদে পোড়া উপার্জনের সবটুকু অর্থও।

প্রতিদিনের মতো বুধবারেও বিমান ও সৌদি এয়ার টিকিটের জন্য সবাই ভিড় করলেও রমজানসহ অনেক প্রবাসীই ব্যস্ত ছিলেন কফিলের (সৌদির শ্রমিক নিয়োগকর্তা) সঙ্গে যোগাযোগে। চলমান বিক্ষোভের ৯ দিন পর হঠাৎ দৃশ্যপটে নিয়োগ কর্তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এক্সিট ও রিএন্ট্রি ভিসা ছুটি যত দিনের তত দিনের থাকে। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ফিরে যেতে হয়। কফিল ছুটি বাড়ালে ভিসার মেয়াদও বেড়ে যায়। কারও যদি আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, তাও বাড়িয়ে নিতে হয়।

রমজান জানায়, কফিল মেয়াদ বাড়ালেই কেবল ভিসার মেয়াদ বাড়াবে সৌদি কর্তৃপক্ষ। দূতাবাস থেকে তিনি এমনটাই জানতে পেরেছেন। তবে রমজানের ক্ষেত্রে মেয়াদ বাড়াতে আগ্রহ নেই তার কফিলের। তাই ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ায় এখন তার ভাগ্য নির্ভর করছে কফিলের উপর। কিন্তু কোনোভাবেই মেয়াদ বাড়াতে রাজি হচ্ছে না কফিল। বলছেন তার জায়গায় নাকি অন্য লোক নিয়োগ করা হয়েছে।

রমজানের মতো এমন ৫০ হাজার

প্রবাসীর ভিসার মেয়াদ শেষ হচ্ছে এই বুধবারেই। যদিও পরবর্তীতে আরও ২৪ দিন মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা হলেও এখন এসব শ্রমিকের ভাগ্য নির্ধারণ করবে সে দেশের নিয়োগকর্তারা। দূতাবাস ও ভিসা এজেন্সিগুলোও বলছে কফিলের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাড়িয়ে নিতে হবে ভিসার মেয়াদ।

কিন্তু করোনার জন্য লাখো কর্মী আটকা পড়েছেন। তাদের সবারই ছুটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। অন্তত ৫০ হাজার কফিলকে আলাদা করে আবেদন করতে হবে, তবে কফিলদের পক্ষ থেকে সৌদি সরকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

প্রবাসীরা বলছেন, সবার কফিল ভালো নয়। তাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে না বাড়ালে সবার মেয়াদ বাড়বে না। আকামার জন্য সৌদি সরকারের বিভিন্ন ফি আছে। আবার অনেক প্রবাসী টাকার বিনিময়ে কফিলের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকেন। এক বছরের আকামার জন্য অনেক প্রবাসী কফিলকে ২ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা দিয়ে থাকেন। তাই কর্মীর অনুপস্থিতিতে আকামার মেয়াদ বাড়ানোর ঝুঁকি নিতে চাইবেন না কফিলরা।

প্রবাসীদের দাবির প্রেক্ষিতে ভিসা ও আকামার মেয়াদ আরও ২৪ দিন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু এজেন্সি ও বাংলাদেশ দূতাবাসের সূত্র জানায়, প্রত্যেক প্রবাসীর আলাদা করে কফিলের সঙ্গে যোগাযোগ করে মেয়াদ বাড়িয়ে নিতে হবে। তাই এই ঘোষণাকে শুভংকরের ফাঁকি বলে মনে করেন এই প্রবাসীরা।

এদিকে বুধবার বিকেলে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিদের সাথে বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রীও একই কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, যিনি চাকরি দিবেন সে যদি না চায় তাহলে কীভাবে শ্রমিকরা যাবে। তারা লোক না নিলে আপনি কি করতে পারেন। অনেকেই ক্লিয়ারেন্স পাচ্ছে, কেউ কেউ পাচ্ছে না। প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার প্রবাসী ক্লিয়ারেন্স নিয়েই গিয়েছে। মন্ত্রী এসময় এসব প্রবাসীর নতুন চাকরি খোঁজা এবং কফিল রাজি না হলে নতুন কফিল খোঁজার পরামর্শ দিয়েছে।

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে আটকে পড়া প্রায় ২৫ হাজার সৌদি আরব প্রবাসীকে নতুন করে ভিসা নিতে হবে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন জানিয়েছেন।

এ পর্যন্ত দেশে আটকা পড়েছে প্রায় ৮০ হাজারে প্রবাসী। এর মধ্যে ৫০ হাজারের বেশি প্রবাসীর মেয়াদ গতকাল শেষ। বাকিদের শেষ হবে এই অক্টোবরেই। এয়ারলাইন্স সূত্র বলছে, সপ্তাহে ২০টি ফ্লাইট চালানো হলেও এই সময়ে ২৫ হাজার যাত্রী যেতে পারবে। রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকদের সংগঠন বায়রা বলছে, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে সৌদি আরব থেকে দেশে এসেছেন ৮০ হাজারের বেশি প্রবাসী। করোনা সংক্রমণ রোধে বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ বন্ধ করে দেয় দেশটি। শর্তসাপেক্ষে ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের ফেরার দরজা খুলে দেয় সৌদি আরব।

এ বিষয়ে অভিবাসন খাতের বেসরকারি সংগঠন রামরুর নির্বাহী পরিচালক সি আর আবরার বলেন, সঠিক তথ্য কোনটি বা সত্য জানা যাচ্ছে না। একটা আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগে বিষয়টি সুরাহার আলামত দেখা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের অব্যবস্থাপনায় অনিশ্চয়তা তৈরি করে প্রবাসীদের হয়রানি করা হচ্ছে।

এর আগে গত সপ্তাহ থেকে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ করছেন সৌদি প্রবাসীরা। সচিবালয়ের সামনে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, ঢাকায় সৌদি দূতাবাসের সামনেও বিক্ষোভ করেছেন তারা।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.