যত দূর চোখ যায় পানি আর পানি

নৌকায় করে বন্যার্তরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে যাচ্ছেন। ছবিটি গতকাল মঙ্গলবার সকালে জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার বাবনা গ্রাম থেকে তোলা। ছবি: আব্দুল আজিজ

জামালপুরে পানি বাড়তে থাকায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। কোনো কোনো এলাকার ঘরবাড়ি–রাস্তাঘাট তলিয়ে দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। তেমনই একটি দুগর্ত এলাকা ইসলামপুর উপজেলা। সেখানে যত দূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। কোথাও বুকসমান, কোথাও কোমরসমান পানি। এলাকার লোকজন খাদ্য ও আশ্রয়ের সন্ধানে এখন মরিয়া।

ইসলামপুর উপজেলায় সড়ক যোগাযোগ আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। এখন ইসলামপুর থেকে দেওয়ানগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত ট্রেন যোগাযোগও বন্ধ হয়ে গেছে। প্রথম দফার রেকর্ড ভেঙে বিপৎসীমার ১২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাবিত হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পানি পরিমাপের নিয়ন্ত্রক আব্দুল মান্নান বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ৩০ সেন্টিমিটার পানি বেড়ে বিপৎসীমার ১২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দ্বিতীয় দফায় অস্বাভাবিকভাবে পানি বাড়ছে।

দুর্গত এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, চারপাশে শুধু পানি আর পানি। পানি বাড়তে থাকায় ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে লোকজন ছুটছেন। নৌকার অভাবে নারী-পুরুষ গলাসমান পানিতে হেঁটে সেতুর ওপর বা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে যাচ্ছেন। অনেকেই জলমগ্ন বাড়ি থেকে নৌকা দেখে তাঁদের বহন করার জন্য ইশারায় ডাকছেন।
দুর্গত এলাকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। দুই দফার বন্যায় দুর্গত এলাকার মানুষের মধ্যে পানিবাহিত রোগও দেখা দিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৩৯টি মেডিকেল টিম প্রস্তুতের কথা বলা হলেও দুর্গত এলাকার লোকজনের অভিযোগ, প্রথম দফার বন্যায়ও তাঁরা মেডিকেল টিম দেখেননি, এবারও দেখেননি। বেশির ভাগ এলাকায় এখনো ত্রাণসামগ্রী পৌঁছায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ইসলামপুরের পূর্ব বাবনা গ্রামের কয়েকজন নারী-পুরুষ ত্রাণসামগ্রী বিতরণ নিয়ে নানা অভিযোগ তুলে জানালেন, দ্বিতীয় দফার বন্যা তাঁদের এলাকায় কোনো ধরনের ত্রাণসামগ্রী পৌঁছায়নি। কোনো জনপ্রতিনিধির দেখা পাননি তাঁরা। প্রথম দফার বন্যার সময় অল্প কিছু খাবারের প্যাকেট বিতরণ করে জনপ্রতিনিধিরা চলে যান। ত্রাণ বিতরণেও পক্ষপাত হয়। জনপ্রতিনিধি বা নেতাদের আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনেরাই বেশি ত্রাণসামগ্রী পান।
দুর্ভোগের শিকার ব্যক্তিরা সরকারের ত্রাণসামগ্রী জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে না দিয়ে সরাসরি সরকারি লোকজন দিয়ে বিতরণের দাবি জানান।

জামালপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো.নায়েব আলী প্রথম আলোকে বলেন, দ্বিতীয় দফার বন্যায় সাতটি উপজেলার ৩৯টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে। একই সঙ্গে ছয়টি পৌরসভাও বন্যাকবলিত হয়েছে। ওই ইউনিয়ন ও পৌরসভার ২৭৯টি গ্রামের ৩ লাখ ২১ হাজার ২৬৯ জন মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে।

তিনি জানান, বন্যাদুর্গত এলাকায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ শুরু হয়েছে। মেডিকেল টিমের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, প্রতিদিন টিমগুলো দুর্গত এলাকায় যাওয়ার কথা। এ ব্যাপারে তিনি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।

ত্রাণসামগ্রী বিতরণে জনপ্রতিনিধিদের পক্ষপাতের বিষয়ে ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো.মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ত্রাণসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম নিয়ে জনপ্রতিনিধিদের আগেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তারপরও কোথাও অব্যবস্থাপনা থাকলে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাঁদের প্রয়োজন, তাঁরাই ত্রাণ পাবেন।’

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.