মহাকাশে মাকড়সা!

স্পেস স্টেশন বা মহাকাশ স্টেশনে বসবাস করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না মাকড়সা। কিন্তু ইঁদুর নিজেকে মানিয়ে নেয়। গবেষণায় এমন তথ্য মিলেছে। অনলাইন দ্য কসমিক কমপ্যানিয়নে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, বিজ্ঞানের দিক থেকে মাকড়সাকে মহাশূন্যে পাঠানোটা দৃশ্যত একটি ভাল ধারণা হতে পারে। কিন্তু মহাশূন্যে বসবাস করার ক্ষেত্রে তার নিজস্ব একটি রীতি আছে। ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসা প্রথমবারের মতো মহাশূন্যে পাঠায় মাকড়সা। উদ্দেশ্যটা ছিল, হাইস্কুল ভিত্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিজ্ঞান বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি।

২০০৮ সালে এসে দেখা গেল, ওই পরীক্ষা যৌক্তিক। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে কিছু মাকড়সাকে মহাশূন্যে পাঠানোর মধ্যে একটি ভুল বা ত্রুটি দেখা দেয়, যা বিজ্ঞানের কাছে প্রত্যাশিত ছিল না। এ পরীক্ষায় আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে কয়েক জোড়া মাকড়সা পাঠিয়ে দেয়া হয় বসবাস করার জন্য। প্রায় শূন্য অভিকর্ষের অধীনে কিভাবে তারা নিজেদের জীবন মানিয়ে নেয় তা নিয়ে গবেষণা করতে চেয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা।
আলাদা একটি পরীক্ষায় আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল ইদুর। দেখা গেল, কয়েক দিনের মধ্যে সেখানে ইদুররা তাদেরকে মানিয়ে নিয়েছে এবং দ্রুতই তাদের মতো করে খেলা আবিষ্কার করে তাদের মতো করে খেলা শুরু করেছে। কিন্তু ইঁদুরের থেকে অনেক দিক দিয়ে মাকড়সা ভিন্ন। ইঁদুররা খেলা শুরু করলেও মাকড়সার মধ্যে সে রকম প্রতিক্রিয়া দেখা যায় নি।
পৃথিবীতে মাকড়সারা একই রকম জাল বা ওয়েব সৃষ্টি করে। মাকড়সার এসব জালের মধ্যভাগের পরিবর্তে এর কেন্দ্র থাকে উপরের প্রান্তের দিকে। এরপর আট পায়ের এই প্রাণি তার জালের উপরের অর্ধাংশের ওপরের দিকে অবস্থান করে। তবে এ সময় তার মাথা থাকে নিচের দিকে। অভিকর্ষ এভাবে মাকড়সাকে তার শিকার ধরতে সহায়তা করে। যে শিকার তার জালে আটকে পড়ে। কিন্তু মহাশূন্যে মাকড়সারা এই অভিকর্ষজ সুবিধা পায় না। ফলে তাদের স্বাভাবিক জীবনধারা বিঘ্নিত হয়।
বিজ্ঞানীরা যেসব মাকড়সা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পাঠিয়েছিলেন তার মধ্যে ছিল একটি মেটেপিয়েরা ল্যাবিরিন্থিয়া এবং ল্যারিনয়েডস প্যাটাগিয়াটাস প্রজাতির। প্রথম প্রজাতির মাকড়সাকে মূল সাবজেক্ট হিসেবে ধরা হয়। দ্বিতীয়টিকে ব্যাকআপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু ব্যাকআপ মাকড়সা সম্ভবত ওই অবস্থায় নিজেকে মানিয়ে নিতে পছন্দ করেনি। বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে যায় সে। প্রবেশ করে পরীক্ষার মূল চেম্বারে। কিন্তু নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় মূল চেম্বার খুলতে পারছিলেন না জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। তারা ওই দুটি মাকড়সাকে মহাশূন্যে আলাদা করতে পারছিলেন না। বেশ কিছুদিন পরে মাকড়সারা যে জাল তৈরি করলো তা ক্রমশ এলোমেলো দেখাতে লাগে। দুটি মাকড়সা একে অন্যের পথে চলতে থাকে। ফলের মাছিগুলো বাড়তে লাগলো। কারণ, অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মাকড়সার জন্য দেয়া খাদ্য। এর ফলে অপ্রত্যাশিত হারে প্রজনন বেড়ে গেল তাদের। লার্ভায় ভরে গেল। তারা তাদের ব্রিডিং কন্টেইনার থেকে বেরিয়ে এলো। মেঝে ভরে গেল। সহসাই লার্ভায় ঢাকা পড়ে গেল পরীক্ষামূলক চেম্বারের জানালা। এর ফলে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ওই মাকড়সা বা তাদের জাল দেখতে পারছিলেন না আর।
২০১১ সালের পরীক্ষায় দেখা গেল চার রকম জাল সম্পর্কিত তথ্য।
১. মহাশূন্যে একই রকম জাল তৈরি করে তারা। ২. আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে একই রকম জাল তৈরি করে মাকড়সা। ৩. আন্তর্জাতিক মহাকাশ সেন্টারে পৌঁছার পর ২৩ দিনে তারা এমন জাল তৈরি করে। এবং ৪. পৃথিবীতে মাকড়সা জাল তৈরি করে নিয়ন্ত্রিত। এবারও ২০০৮ সালের পরীক্ষাগুলোর ধরন যাচাই করতে করা হয়েছিল। এ সময়ে তারা একই প্রজাতির চারটি মাকড়সা ব্যবহার করেছিলেন। এগুলো সাধারণত ব্যানানা মাকড়সা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে দুটিকে উড়িয়ে নিয়ে রাখা হয় আলাদা চেম্বারে। অন্য জোড়াটি ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো বোল্ডার-এর বায়োসার্ভ স্পেস টেকনোলজির ল্যাবে আরো মাকড়সার সঙ্গে রাখা হয় মহাশূণ্যের পরিবেশে। কিন্তু সমস্যাটি হলো, নারী মাকড়সা দুটি যখন তার পুরুষ সঙ্গীর দিকে অগ্রসর হয়, তখনই। যখন টিনেজ বয়সে তখন এসব প্রাণিতে সংগ্রহ বা বাছাই করা হয়েছিল, যখন মাকড়সাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন কঠিন থাকে। এই প্রজাতির মাকড়সার নারী ও পুরুষের আকার আকৃতি এবং শারীরিক গঠনে উল্লেখযোগ্য ভিন্নতা রয়েছে। দৈবক্রমে একই স্থানে সাধারণ পরিবেশে একটি নারী ও একটি পুরুষ মাকড়সাকে রাখা হলো পরীক্ষা চালাতে। তিনটি ক্যামেরা বসানো হলো। তাদের কাজ হলো প্রতি ৫ মিনিট পর পর মাকড়সাদের ছবি তোলা। এ সময়ে তোলা মাকড়সার জালের শতাধিক জাল নিয়ে পরে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ১৪৫০০ ছবি নিয়ে গবেষণা করে দেখা হয়েছে পৃথিবীতে তৈরি করা মাকড়সার জালের সঙ্গে অভিকর্ষবিহীন পরিবেশে এসব জাল সৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য কতটুকু। তাতে দেখা গেছে, আলোর ধরনের ওপর ভিত্তি করে উল্লেখযোগ্যভাবে জালের ডিজাইন পরিবর্তন করে মাকড়সারা। ল্যাম্পলাইটের নিচে যেসব মাকড়সা জাল সৃষ্টি করে তা দেখতে সাধারণ জালের মতোই। এসব ক্ষেত্রে মাকড়সারা তাদের মাথা, মুখ নিচের দিকে রাখে। অপেক্ষা করে তাদের জালে উড়ন্ত কোনো প্রাণি ধরা পড়লে তাকে শিকার করার জন্য। ইউনিভার্সিটি অব ব্যাসেলের ড. স্যামুয়েল জকোকে বলেন, আমরা এটা বলতে পারি না যে, মহাশূন্যে মাকড়সার জীবনধারার ওপর আলো বড় কোন প্রভাব ফেলে। এতে এমনটাই ধরা পড়ে যে, মাকড়সার জীবনে আলোর একটি ব্যবহার আছে। তা হলো, আলো ব্যবহার করে সে বুঝতে পারে জালের কোন দিক নিচে আর কোন দিন উপরে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.