পোড়া কপাল প্রবাসীদের, সনদ নিয়ে ভোগান্তি আর অপদস্ত

পোড়া কপাল প্রবাসীদের। যেদিকে যাই সেদিকে ভোগান্তি আর অপদস্ত। ন্যূনতম সম্মানটুকুও যেন প্রাপ্য নই। অথচ নামে রেমিট্যান্স যোদ্ধা। এমনভাবে আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকার রেমিট্যান্স যোদ্ধা আবুল বাশার।
সোমবার ভোর তখন সাড়ে তিনটা। হঠাৎ বেজে ওঠে মুঠোফোন। রিসিভ করতেই বলে ওঠেন, আমি আবুল বাশার বলছি চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল থেকে।

কি হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে সকাল ৮টার ফ্লাইটের যাত্রী আমি। যাব দুবাইয়ে। কিন্তু করোনা বা কোভিড-১৯ সনদ না পাওয়ায় আমি চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে অবস্থান করছি এখনো।

তার পাশ থেকে একই মুঠোফোনে শফিউল আলম নামে আরেকজন বলে ওঠেন, আমি আমিরাত প্রবাসী। আমিও বসে আছি সনদের জন্য। শাহ আমানত বিমান বন্দর থেকে সকাল ৬টার ফ্লাইটের যাত্রী আমি। তিনি বলেন, শুধু আমি নই, আমার সাথে কমপক্ষে আড়াইশো বিদেশগামী হাসপাতালের সামনে রাতভর অবস্থান করছে। নাওয়া-খাওয়া নেই, চোখে ঘুম নেই। সে কি অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। আমাদের জন্য যদি বিন্দুমাত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে মনে করেন তাহলে একটু এসে দেখে যান।
তার পাশ থেকে জরিপ আলী নামে ওমান প্রবাসী একজন বলেন, আমি সকাল ৬টার ফ্লাইটের যাত্রী। এখানে যারা আছেন সবার কারো ৬টায়, কারো ৮টায়, কারো ৯টায় ফ্লাইট। কিন্তু এখনো করোনার সনদ মেলেনি কারোই। অথচ ফ্লাইট ছাড়ার অন্তত ৬ ঘন্টা আগে করোনার (কোভিড-১৯) সনদ পাওয়ার কথা। সে হিসেবে আমাদের হাতে আছে ৩-৪ ঘন্টা। সে এক শ্বাসরুদ্ধকর অপেক্ষা, সঙ্গে টেনশন। ফ্লাইট যদি মিস হয়, তাহলে অনেক টাকা গচ্চা যাবে, সঙ্গে টিকেটের টাকাও মার যাবে।
বিদেশগামীরা বলেন, বিমানের টিকেট নিশ্চিত করে ৩৫০০ টাকায় দু‘দিন আগে পরীক্ষার জন্য নমুনা দিই। তখনও ৩-৪ ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। যার রিপোর্টের সনদ রোববার বিকেলে দেয়ার কথা। কিন্তু রাত ১২টায়ও রিপোর্ট না পেয়ে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে অবস্থান নেয় বিদেশগামীরা। বলা হচ্ছে-সার্ভারের সমস্যা। সার্ভারও এখন আমাদের দুর্ভোগের কারণ।
বিদেশগামীদের মতে, প্রায় ২৫০ জন বিদেশগামী সিভিল সার্জন অফিসের সামনে রাতভর দাঁড়ানো। এরমধ্যে অনেকের করোনা পজিটিভ পাচ্ছে, যারা আশেপাশেই দাঁড়ানো। সবকিছুর একটা লিমিট থাকে। তাদের এ সমস্যার কারণে অনেক প্রবাসীর বিদেশ যাত্রাও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে।
ভোগান্তির বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. শেখ ফজলে রাব্বি বলেন, সার্ভার ডাউনের কারণে রোববারের রিপোর্ট দিতে বিলম্ব হয়েছে। এতে বিদেশগামীরা কষ্ট পেয়েছেন। ওইদিন ২৮১ জন বিদেশগামীর করোনা সনদ দিতে হয়েছে। এতে আমাদেরও কষ্ট হয়েছে। উনারা ঘুমাননি, আমরা ঘুমিয়েছি তা নয়। তবুও এ জন্য আমি দু:খিত। এরপরও সবাইকে আমরা রাতের শেষের দিকে করোনা সনদ দিতে পেরেছি। আশা করি বিমানে উঠতে কারো অসুবিধা হয়নি।
প্রসঙ্গত, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বিদেশ যাত্রার ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই যাত্রীকে করোনা পরীক্ষার সনদ সংগ্রহ করতে হচ্ছে। আর এ ৭২ ঘণ্টায় তাদের পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এক্ষেত্রে চট্টগ্রামে শুধু ফৌজদারহাটে অবস্থিত বিআইটিআইডি হাসপাতালের পরীক্ষাগারে বিদেশগামীদের করোনা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
গত সোমবার থেকে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রবাসীদের করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ করা শুরু হয়। মঙ্গলবার থেকে বিআইটিআইডি প্রবাসীদের করোনার নমুনা পরীক্ষা শুরু করে। চট্টগ্রামে শনিবার পর্যন্ত পাঁচ দিনে ৬৬৩ জন বিদেশযাত্রীর নমুনা সংগ্রহ করেছে সিভিল সার্জন কার্যালয়। এ পর্যন্ত ১১ জন প্রবাসীর করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে।
জানা গেছে, বিদেশগামী প্রায় সব ফ্লাইটই ছাড়ছে ঢাকা থেকে। ফলে যাত্রী যদি চট্টগ্রাম, সিলেট বা অন্যান্য জেলার বাসিন্দা হয় তার ঝুঁকি অনেক বেশি বেড়ে যায়। এ ধরনের যাত্রীকে নিজ শহর থেকে করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে নিয়েই ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন বিপত্তি যাত্রীর ইন্স্যুরেন্স পলিসি (বীমা)।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.