পথে পথে ছড়িয়ে আছে সৌন্দর্য

পথে পথে ছড়িয়ে আছে সৌন্দর্য
www.tourism-bd.com

ভ্রমণের ব্যবহারিক অর্থ নানানরকম। যেমন প্রাতকালীন ভ্রমণ, বৈকালীন ভ্রমণ, নদীর পারে ভ্রমণ, জ্যোৎস্নার আলোয় ভ্রমণ, ট্রেনে-বাসে-উড়োজাহাজে-জলযানে ভ্রমণ, ইত্যাদি। আক্ষরিক অর্থে আমরা যেটা বুঝি ভ্রমণ অর্থ বেড়ানো, ঘোরাঘুরি এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যাওয়া, অর্থাৎ পর্যটন করা। অন্য অর্থে দেশভ্রমণ। ভ্রমণ শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বিদেশ ভ্রমণও সমানভাবে উলেস্নখযোগ্য। তবে এটাও ঘটনা, মানুষের মধ্যে ভ্রমণের আবশ্যিক দিক নিজের দেশকে জানার, বোঝার, দেখার। নিজের জন্মস্থানের গাঁ-গঞ্জ-শহর-নগর থেকে বেরিয়ে দেশের ও বিদেশের অন্যত্র ভ্রমণের মাধ্যমে জানাটা ভ্রমণের মুখ্য উদ্দেশ্য। তা ছাড়া দিনের পর দিন একই পরিবেশের জীবনযাপন থেকে ক্ষণিকের মুক্তি।

এই ভূখন্ডকে জানার জন্য প্রয়োয়জন দেশ ভ্রমণ। হৃদয়ের প্রসারতা ও মনের গতি আনে ভ্রমণ। তারই প্রেক্ষাপটে বেরিয়ে পড়লাম নেপাল ভ্রমণে। নেপাল হচ্ছে ভগবান বুদ্ধের জন্মদেশ। এজন্য এই দেশকে ইংরেজিতে বলে, ঘবঢ়ধষ, :যব ইরৎঃয ঢ়ষধপব ড়ভ খড়ৎফ ইঁফফযধ. তাছাড়া তুষারশুভ্র পর্বতমালা, ঘনসবুজ বনানীর উপত্যকা, জীববৈচিত্র্য আর ঐতিহ্যময় সংস্কৃতিতে ঘেরা দেশ নেপাল। মন্দিরময় শহর কাঠমান্ডু। ৭২৩ খ্রিষ্টাব্দে রাজা গুণ কামদেব কাঠমান্ডু শহরটি গড়ে তোলেন। কলকাতা থেকে বিমানে সোজা কাঠমান্ডু। কাঠমান্ডু নেপালের রাজধানী ও জনপ্রিয় শহর। কাঠমান্ডুর হোটেলে রাত্রিনিবাস। ভোরবেলায় মাউন্ট এভারেস্ট দর্শনে বেরিয়ে পড়লাম। ৮৮৪৮ মিটার উচ্চতা। এয়ারপোর্ট থেকে গুণা এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট। ডান-দিক ও বাঁ-দিক মিলে দশজন-দশজন মোট কুড়িজন যাত্রী। একজন এয়ারহোস্টেস ও একজন পাইলট। ফ্লাইটটি উঠে গেল মাউন্টেন এভারেস্টের চূড়ায়। ফ্লাইটের জানালা দিয়ে অপূর্ব দৃশ্য। প্রত্যেকটা পাহাড়ের চূড়ার দৃশ্য হৃদয়ে লেগে থাকার মতো। প্রতিটা ধাপে ধাপে বোঝাচ্ছিলেন এয়ারহোস্টেস ম্যাডাম। খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য এই প্রথম। হিমালয়ের দৃশ্য দেখে অভিভূত।

এত সুন্দর হিমালয়ের রূপ, সেটা ভোরের সকালে অনেকটাই উপলব্ধি করতে পারলাম। প্রাতঃরাশ সেরে বেরিয়ে পড়লাম পশুপতি মন্দিরের উদ্দেশে। শোনা যায়, পশুপতি দেবতা নাকি খুব জাগ্রত। মন্দিরটি বলা চলে কাঠমান্ডু শহরের মধ্যেই। মূলত প্রভু শিবের মন্দির। এটি একটি হিন্দুদের পবিত্র মন্দির। কথিত আছে, একবার শিব ও পার্বতী হিমালয়ের কোলে অবস্থিত বাগমতী নদীর তীরে ভ্রমণ করতে এসেছিলেন যেটা মৃগস্থলি নামে পরিচিত। নদী তারবর্তী উপত্যকায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে দুজনে হরিণের বেশ ধরে এলাকায় ঘুরে বেড়াতে থাকেন। এখানে ভগবান শংকর মৃগরূপ ধারণ করেন। নেপাল মাহাত্ম্যে যেটা বলা হয়েছে সেটা বাংলায় তর্জমা করলে দাঁড়ায়, এই শ্লেষ্মাত্মক বনক্ষেত্রে আমি ঈশ্বর মৃগরূপ ধারণ করে বিচরণ করেছি। সেহেতু ভবিষ্যতে এই বিচরণ ক্ষেত্র পশুপতি নামে বিশ্বমাঝারে পরিচিত হবে। আজ সেই পশুপতি মন্দিরে দূরদূরান্ত থেকে অনেক দর্শনার্থী ভিড় করছেন এবং পূজা দিচ্ছেন। একটা হৃদয় ছোঁয়া পরিবেশ! তারপর গেলাম পাঠান দরবারে। রাজা প্রতাপ মলেস্নর সময়ে কাঠমান্ডু দরবার ক্ষেত্র ব্যাপকভাবে নির্মিত হয়। রাজা প্রতাপ মলস্ন ছিলেন ধার্মিক ও পন্ডিত ব্যক্তি। তিনি ছিলেন শিল্পের প্রতি অনুরাগী। এ ছাড়া তিনি পনেরোটি ভাষা জানতেন। ভাষা জানাটা তার গর্বের জায়গা। প্রতাপ মলস্ন স্থাপনা নির্মাণের প্রতিও আগ্রহী ছিলেন।

এ কারণে রাজা হিসেবে অভিষেকের পরেই তিনি তার প্রাসাদ সম্প্রসারণের কাজ শুরু করেন। রাজা প্রতাপ তার প্রাসাদ নির্মাণের সময় একটি ছোট প্রবেশ পথ নির্মাণ করেন। প্রবেশ পথের দরজাটি বিভিন্ন কারুকার্যমন্ডিত ছিল। তাতে বিভিন্ন দেবতার প্রতিমা স্থান পেয়েছিল। দরজাটি পরে মোহান চকে স্থানান্তরিত হয়। এর সামনে একটি হনুমানের মূর্তি স্থাপিত হয়, কারণ ভাবা হয়েছিল হনুমান রাজার সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করবে এবং তার আবাসকে রক্ষা করবে। এই প্রবেশ পথ দিয়ে নাসাই চকে যাওয়া যেত, নাসাই চকে সব ধরনের রাজকীয় অনুষ্ঠান, পরিবেশনা ইত্যাদি হতো। এই নাসাই চক দীর্ঘদিন পর্যন্ত রাজকীয় উঠোন ছিল। ধারণা করা হয়, এই উঠোনের নিচে অনেক সম্পত্তি ছিল। সে সময় রাজা প্রতাপ ‘সুন্দরী চক’ নামেও একটি উঠোন নির্মাণ করেন। এখানে তিনি প্রস্তরখন্ডে পনেরোটি ভাষায় লিখিত খন্ড স্থাপন করেন। রাজা প্রতাপ কেবল তার ঐশ্বর্য প্রকাশের জন্যই এত স্থাপনা নির্মাণ করেননি, তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল দেব-দেবীর প্রতি আরাধনা। তিনি নতুন মন্দির নির্মাণে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। এ ছাড়া পুরনো অনেক মন্দিরকে সম্প্রসারিত ও সংস্কার করেন। প্রাসাদের পাশেই তিনি একটি কৃষ্ণ মন্দির নির্মাণ করেন ১৬৪৯ সালে, যার নাম ভামসাগোপালা। এই মন্দিরটি তিনি তার দুই স্ত্রীকে উৎসর্গ করেন, একজন রূপমতি এবং অন্যজন রাজামতি। এই দুইজনেই একই বছরে মারা যান। মূল চককে তিনি সম্পূর্ণরূপে সংস্কার করেন।

১৬৭০ সালে তালেজু মন্দিরের জন্য তিনি বেশ কয়েকটি ধাতুর দরজা নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। ১৬৭৪ সালে রাজা প্রতাপ মলস্ন মারা যাওয়ার পর দরবার ক্ষেত্র উন্নয়নের গুরুত্ব কমে যায়। তার উত্তরাধীকারীরা ক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হন এবং সে সময়কার মন্ত্রীরা ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তাদের হাতে ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর শিল্প ও সংস্কৃতির ওপর গুরুত্ব হ্রাস পায়। রাজার মৃতু্যর পরের এই তিন দশকে সাংস্কৃতিক উন্নয়নের ধারা ক্রমেই হ্রাস পেতে থাকে। এ সময় শহরে অল্প কয়েকটি স্থাপনা নির্মিত হয়। এর মধ্যে উলেস্নখযোগ্য পার্থিভেন্দ্র মলস্ন নির্মিত দাসাভাতারা মন্দির, যা ভগবান বিষ্ণুকে উৎসর্গ করে নির্মিত। পরে গারুদার একটি বিশালাকার মূর্তি এর সামনে স্থাপিত হয়। এ ছাড়া পার্থিভেন্দ্র মলস্ন তার পরিবারের ছবিসহ একটি স্তম্ভ তালেজু মন্দিরের সামনে নির্মাণ করেন। ১৬৯২ সালে রাজা প্রতাপ মলেস্নর বিপত্নীক স্ত্রী রাণী রাধিলাসমি ভগবান শিভাকে উৎসর্গ করে একটি মন্দির নির্মাণ করেন। এটি মাজু দেভাল নামে পরিচিত এবং দরবার ক্ষেত্রের গারুদা মূর্তিটির পাশে অবস্থিত। মন্দিরটি নয়টি পস্ন্যাটফর্মের ওপর অবস্থিত এবং এটি দরবারের অন্যতম শীর্ষ স্থাপনা। এখন শহরের অন্যতম জায়গায় অবস্থিত এই পাঠান দরবার। জনগণের দর্শনের জন্য উন্মুক্ত। তবে দরবারে সংস্কারের কাজ এখনো পুরোদমে চলছে। প্রচুর দর্শনার্থীর সমাগম। তারপর গেলাম বৌদ্ধনাথ স্তূপে। বৌদ্ধনাথ স্তূপের চোখ দুটি অভিনব। বৌদ্ধনাথ নেপালের কাঠমান্ডুর একটি স্তূপ। কাঠমান্ডুর কেন্দ্র এবং উত্তর-পূর্ব সীমা থেকে প্রায় ১১ কিমি দূরে অবস্থিত। উচ্চতায় ৩৬ মিটার। এই স্তূপের বিশাল মন্ডালার জন্য এটি নেপালের বৃহত্তম গোলাকার স্তূপের মধ্যে অন্যতম। শোনা যায়, তিব্বত থেকে আসা বড় শরণার্থী জনগোষ্ঠীর আগমনে বৌদ্ধের আশপাশে ৫০টির বেশি গুম্ফা (তিব্বতীয় বিহার) রয়েছে। স্তূপের আশপাশ দিয়ে বাজারের দ্রব্য সামগ্রী দর্শনার্থীদের নজরকাড়া।

তারপর বুধানীলকণ্ঠ। কাঠমান্ডু থেকে প্রায় দশ কিমি দূরে শিবপুরী পর্বতমালার পাদদেশে ‘বুধানীলকণ্ঠ’। পৃথিবীর বৃহত্তম শায়িত বিষ্ণুমূর্তি। চতুষ্কোণ জলাশয়ের মধ্যে অনন্তশয়নে রয়েছে বিষ্ণুর আঠার ফুট একটি মূর্তি। একখন্ড বিশালাকার কালো পাথর কেটে তৈরি। সব থেকে আশ্চর্যের বিষয় এ ধরনের কালোপাথর কিন্তু নেপালের এই উপত্যকায় পাওয়া যায় না। পুরাতত্ত্ববিদদের মতে, রাজমহল পাহাড় থেকে প্রাপ্ত এই কালো পাথর যেটা ইংরেজিতে “জধলসধযধষ ংপযরংঃ” নামে পরিচিত। এখন প্রশ্ন, এই বিরাটাকার পাথর এখানে এল কিভাবে? আর একটিমাত্র পাথরকে খোদাই করে মূর্তি বানালেন কারা? সেখানকার বৃদ্ধ পূজারি মাথা চুলকিয়ে জানালেন, একাদশ শতাব্দীতে এক চাষি চাষ করতে এসে দেখলেন মাটি ফেটে রক্ত বের হচ্ছে! কৌতূহলবশত তিনি ডাকলেন গ্রামবাসীকে। শুরু হলো খোঁড়াখুঁড়ি। আর মাটি খুঁড়তেই বের হলো আজকের এই বিষ্ণুমূর্তি। ঐতিহাসিকদের মতে, দশম শতাব্দীতে রাজা বিজয়কামদের নেপালে নাগ ও বাসুকি পূজা শুরু করেন। তার আমলে বেশকিছু বিষ্ণুমূর্তি তৈরি হয়েছিল। এটি তার মধ্যে অন্যতম। অনন্তশয্যায় শায়িত বিষ্ণুর নাম ‘বুধানীলকণ্ঠ’। স্বয়ম্ভূনাথ নেপালের প্রাচীনতম ধর্মীয় স্থানগুলোর মধ্যে একটি।

স্বয়ম্ভূনাথ হলো কাঠমান্ডু শহরের পশ্চিমে কাঠমান্ডু উপত্যকার একটি টিলার চূড়ায় অবস্থিত প্রাচীন ধর্মীয় কমপেস্নক্স। কমপেস্নক্সটিতে একটি স্তূপ, বিভিন্ন মঠ এবং মন্দির রয়েছে, যেগুলো তৈরি হয়েছিল লিচাভি যুগের সময়। সাম্প্রতিক সংযোজন হচ্ছে একটি তিবতি বিহার, জাদুঘর এবং গ্রন্থাগার। কমপেস্নক্সটির দুটি প্রবেশ পথ- একটি দীর্ঘ সিঁড়ি যা সরাসরি মন্দিরের মূল পস্নাটফর্মের দিকে গেছে যেটা পাহাড়ের শীর্ষ থেকে পূর্বদিকে এবং আর একটা, দক্ষিণ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম প্রবেশ পথে। পাহাড়ের চারদিকে একটা গাড়ির রাস্তা, সিঁড়ির শীর্ষে পৌঁছানোর দর্শনীয় স্থান ‘বজ্র’। কাঠমান্ডুর শক্তিশালী রাজা প্রতাপ মলস্না, যিনি ১৭তম শতাব্দীতে পূর্ব সিঁড়িটি নির্মাণ করেছিলেন। স্থানটি বৌদ্ধ ও হিন্দুদের কাছে সম্মানের। যদিও ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে এই কমপেস্নক্সটির যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এখন স্তূপটিতে দর্শনার্থীদের কাছে খুব জনপ্রিয়। ২. সকালের প্রাতরাশ সেরে রওনা দিলাম পোখরার (চড়শযধৎধ) উদ্দেশে। পুরোটাই পাহাড়ি রাস্তা। পাহাড়, পর্বত, নদী, গাছ-গাছালি ইত্যাদি নিয়ে পাহাড়ে অপূর্ব প্রাকৃতিক সম্ভার। বাঁ-দিকে কোনো কারণে গাড়ি পড়ে গেলে উল্টাতে উল্টাতে সোজা পাহাড়ের নিচে। বাঁ-দিকে নিচে তাকালে ভীষণ ভয়! স্থানীয় এলাকার ড্রাইভার। পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালাতে খুব দক্ষ।

ফলে অনুভব করছিলাম, পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাটা খুব কম। দুদিকের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা এগিয়ে চললাম। পোখরা যাওয়ার পথে মনোকামনা মন্দির। কাঠমান্ডু থেকে ১৪০ কিলোমিটার পশ্চিমে। প্রথমেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল, পোখরা ঢোকার আগে মনকামনা মন্দিরে মনকামনা দেবীর দর্শন। নেপালের গোর্খা জেলায় অবস্থিত মনোকামনা মন্দির। হিন্দু ধর্মের একটি অন্যতম শক্তিপীঠ বলে গণ্য। মনের অভীষ্ট কামনা পূর্ণ করেন, এই অভিমতের প্রেক্ষিতে অধিষ্ঠাত্রী দেবীর নাম। রাম শাহের রানী স্বয়ং মনোকামনা দেবীর অবতার ছিলেন বলে জনশ্রম্নতি রয়েছে। দশহরার দিন দেবীর পূজার জন্য প্রচুর ভক্তসমাগম ঘটে। বড় উৎসব হচ্ছে দুর্গা-অষ্টমীতে। গোর্খার রানী মনোকামনার ঐশ্বরিক শক্তির অধিকারী ছিলেন। কথিত আছে, একদিন রাম শাহ তার নিজের স্ত্রীকে ভগবতী রূপে এবং তার স্ত্রীর ভক্ত লক্ষণ থাপাকে সিংহরূপে দর্শন করেন। তারপর হঠাৎ রাম শাহের রহস্যজনক মৃতু্য ঘটে। সেই সময় সমাজ জীবনে সতী-দাহের প্রথা রমরমা। যার জন্য রাম শাহ মারা গেলে তার স্ত্রীকে রাম শাহের সঙ্গে সহমরণে যেতে হয়েছিল। সহমরণে যাওয়ার আগে রাম শাহের স্ত্রী তার ভক্ত লক্ষণ থাপাকে বলে গিয়েছিলেন, তিনি শিগগিরই ফিরে আসবেন।

পরে রাম শাহ ও রানী মারা যাওয়ার ঠিক ছয় মাস পর একজন কৃষক চাষ করার সময় জমিতে হঠাৎ পাথরখন্ড পান। সেই পাথরখন্ড থেকে রক্ত ও দুধের ধারা বইছিল। তাই স্থানীয় মানুষের অনুমান, রাম শাহের স্ত্রী আবার ফিরে এসেছেন। স্পটে ছুটে যান লক্ষণ থাপা। তারপর লক্ষণ থাপার উদ্যোগে সেই স্থানে শুরু হয় ভগবতী দেবীর পূজা পাঠ। ওই পবিত্র ভূমি পরে পরিণত হলো মন্দির প্রাঙ্গণ। শোনা যায়, দুর্গা ও কালির মিশ্ররূপে এখানে তিনি ভগবতী দেবী। ভগবতী দেবীকে শুদ্ধচিত্তে ও নিষ্ঠার সঙ্গে ভক্তি করলে তার কৃপা মেলে। মনোষ্কামনা পূর্ণ হয়। আবার অনেকে বলে, ভগবতী দেবী নাকি দুর্গার অবতার। যাই হোক মন্দিরের দেবীকে ভগবতী, বৈষ্ণদেবী, মহেশ্বরী, ইত্যাদি নামে অনেকেই ডেকে থাকেন। পূজার সময় আবীর, কেশর বাদাম, ফুল, বেল-তুলসী পাতা, বস্ত্র, নারিকেল, মিষ্টি, পান সুপারি ইত্যাদি দিয়ে ভগবতী দেবীকে তুষ্ট করার প্রয়াস আজও অব্যাহত। মন্দিরটি ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ (উবঢ়ধৎঃসবহঃ ড়ভ অৎপযধবড়ষড়মু) অনেক নেপালি রুপি খরচ করে সারিয়ে মন্দিরটির বাস্তব রূপ দেন। আমরা গাড়ি থেকে কুরিন্তার স্টেশনে নামলাম। সেখান থেকে কেবল কারে (ঈধনষব ঈধৎ) মনোকামনা মন্দিরে পৌঁছালাম। কুরিন্তার থেকে মনোকামনা মন্দিরের দূরত্ব ২.৮ কিমি। নিচের জায়গা কুরিন্তার থেকে একেবারে উঁচুতে অর্থাৎ মনোকামনা মন্দিরের কাছে পর্যন্ত ১৩০২ মিটার উচ্চতা। কেবল কারে অনধিক ৬ জন মানুষ উঠতে পারে।

প্রায় ২.৮ কিমি রাস্তা কেবল কারের মাধ্যমে উঠতে সময় লাগে ২০ থেকে ২৫ মিনিট। ঝুলন্ত কার সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত পরিষেবা দেয়। কুরিন্তার স্টেশনের টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে কেবল কারে ওঠার জন্য লাইন দিলাম। সেদিন অনেক পর্যটক এক-একটা গ্রম্নপে মনোষ্কামনা মন্দিরে ভগবতী দেবীকে দর্শনে এসেছিলেন। যার জন্য আমাদের সামনে প্রায় ৪০ জনের একটি গ্রম্নপ কেবল কারে ওঠার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিল। তারা মনোষ্কামনা মন্দিরে উঠে যাওয়ার পর আমরা কেবল কারে বসার সুযোগ পেলাম। একটা নতুন অভিজ্ঞতা। কেবল কারের মাধ্যমে পাহাড়ের ওপর দিয়ে মনোষ্কামনা মন্দিরে পৌঁছানো সত্যিই আনন্দের। কেবল কার থেকে মনোষ্কামনা মন্দিরের প্রবেশদ্বারে নামার পর অনেকটা খাঁড়াই সিঁড়ি বেয়ে উঁচু পাহাড়ে উঠতে হয়। বেশ কিছুক্ষণ সিঁড়ি বেয়ে ওঠার পর মন্দির। তারপর মনোষ্কামনা মন্দিরে ঢোকার লাইন দেখে আমরা চমকে উঠলাম। প্রচুর মানুষের সমাগম। বিশাল লম্বা লাইন। লাইনটা উঁচু পাহাড়ের দিকে ক্রমশ বেড়েই চলেছে। লাইনে মানুষের মধ্যে শৃঙ্খলাপরায়ণতা যথেষ্ট ঠিক আছে। কেননা নিরাপত্তাবেষ্টনী যথেষ্ট টাইট। কিন্তু ভীষণ লম্বা লাইন। সেখানেও গ্রম্নপের একজন দাঁড়ানো, বাকিদের মন্দিরের আশপাশে ঘোরাফেরা। পুজো দেওয়া হলে মন্দিরের পাশে প্রদীপ প্রজ্বলন ও ধূপবাতি জ্বালানোর জায়গা। সেখানেও প্রচন্ড ভিড়। অনেক সময় লাগল।

দেবীকে প্রণাম করার পর আমাদের শান্তি। তারপর মনোষ্কামনা মন্দির থেকে বেরিয়ে দোকানের দ্রব্যসামগ্রী দেখতে দেখতে আবার কেবল কারে কুরিন্তার স্টেশনে নেমে আসা। কাঠমান্ডু শহর থেকে ২৮ কিমি দূরত্বে নাগরকোট। শোনা যায় হিমালয়ের মোট ১৩টি পর্বত রেঞ্জের মধ্যে ৮টিই নাগরকোট থেকে দেখা যায়। যদিও সেদিন ছিল মেঘলা আকাশ। যাই হোক নেপালের এই নাগরকোট গ্রামটি ভূমি থেকে ৭২০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। এখানকার লোকজন ঘুম থেকে উঠলেই আকাশের খন্ড খন্ড ভাসমান মেঘগুলো দেখতে পান। এই গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আদিবাসী মানুষ বেশি। চারদিকে মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভান্ডার। পাহাড়ের সরু, উঁচু-নিচু রাস্তা নজরকাড়া। নাগরকোট টাউয়ার থেকে হিমালয় পর্বত দর্শন ভীষণ আনন্দের। চোখ জুড়িয়ে গেল। এখানে ঠান্ডাটা বেশি। বিদেশি পর্যটক চোখে পড়ার মতো। নাগরকোট সফরে অপূর্ব প্রাকৃতিক ভান্ডার দর্শনে আমরা আপস্নুত। মনোষ্কামনা মন্দির থেকে ছুটলাম পোখরার দিকে। পোখরা হল নেপালের পশ্চিমাংশে গন্ডকী অঞ্চলের অন্তর্গত কাস্কী জেলার একটি শহর। পোখরা শহরটি পার্বত্য উপত্যকায় গড়ে উঠেছে। আবার অনেকে বলে, শহরটি পোখরা উপত্যকায় গড়ে উঠেছে। পোখরা উপত্যকার উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে শহরটি অবস্থিত। এই উপত্যকা দিয়ে স্বেত গন্ধকি নদী বা সাদা নদী প্রবাহিত হয়েছে। শহরটি সর্বোচ্চ ১৪৭০ মিটার ও সর্বনিম্ন ৮২৭ মিটার উঁচু।

শহরটি অন্নপূর্ণা পর্বত শ্রেণির একটা অংশে এবং হিমালয়ের মধ্য এলাকায় অবস্থিত। পোখরা নেপালের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর যেটা কিনা কাঠমান্ডু থেকে ২০০ কিমি পশ্চিমে অবস্থিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর পোখরা শহরকে ‘নেপালের ভূস্বর্গ’ ও ‘নেপালের রানী’ বলা হয়। মানুষের মধ্যে একটি প্রবাদ প্রচলিত, ‘তোমার নেপাল দেখা পূর্ণ হবে না, যদি না তুমি পোখরা দেখ’। বাস্তবে এটাই ঘটনা। এত সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য খুব কর্মক্ষেত্রে দেখা যায়। পোখরা থেকে বিশ্বের দীর্ঘতম (১৪০ কিমি) সারিবদ্ধ হিমালয় ও পাহাড়ের সারি দেখা যায়। এজন্য পোখরাকে ‘মাউন্টেন ভিউ’-এর শহর বলা হয়। এখান থেকে ‘অন্নপূর্ণা’ ও ‘মাছের লেজের’ মতো দেখতে মচ্ছ পুছরে (৬৯৭৭ মিটার) পর্বতশৃঙ্গ দেখা যায়, যা কিনা বিশ্ববিখ্যাত চারটি পর্বতশৃঙ্গের একটি।

পোখরা থেকে মুক্তিনাথ মন্দির ও জ্বালামুখী মন্দির দর্শন করা খুব সহজ। এই মন্দির দর্শনের ক্ষেত্রে আকাশ পরিষ্কার থাকাটা খুব জরুরি। তা ছাড়া এই পোখরাতে রয়েছে অনেক দর্শনীয় স্থান। ফেউয়া লেক (চযবধি খধশব), অনেকে ‘ফেওয়া’ লেক বলে থাকে। পোখরার সবচেয়ে মূল আকর্ষণ ফেউয়া লেক। ফেউয়া লেক নেপালের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক লেকের একটি। দৈর্ঘ্যে ৪ কিমি এবং প্রস্থে ১.৫ কিমি। প্রথমটির নাম ‘রারা লেক’ যা নেপালের পশ্চিম মুগু জেলার দুর্গম অঞ্চলে অবস্থিত। বলা চলে, ফেউয়া লেক পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু এবং আদর্শ বিনোদন কেন্দ্র। বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.