দীর্ঘস্থায়ী বন্যার আশঙ্কা

৮৮ সালের পর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ...

প্রতিদিনই নদনদীর পানি বাড়ছে। প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। বাড়ছে দুর্ভোগ। আগামী মাসের আগে এই পানি কমার সম্ভাবনা নেই। চলমান বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা করছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। ১৯৮৮ সালের পর এবারের বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। হতে পারে এটি এই শতাব্দীতে বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা।

উজান থেকে আসা পানিতে জুলাই মাসজুড়েই দেশের ৪০ ভাগ এলাকা ডুবে থাকতে পারে। বন্যায় পানিবন্দি হতে পারে ২৫ জেলার মানুষ। আবহাওয়াবিদরা জানান, মৌসুমি বায়ুর স্থায়িত্ব দীর্ঘ হওয়ায় বৃষ্টি বেশি হচ্ছে। এ কারণে বন্যার স্থায়িত্বকালও বেশি হবে। পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি চলতি শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যা হতে পারে। তবে পরিস্থিতিতে মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভুঁইয়া জানান, বাংলাদেশ ও ভারতের আকাশে দীর্ঘ সময় মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় ভারতের আসাম, মেঘালয়, পশ্চিমবঙ্গ, জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিংসহ হিমালয় অঞ্চলে বেশি বৃষ্টি হচ্ছে। পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় ভারত তাদের ব্যারেজগুলোর জলকপাট খুলে দেয়ায় উজানের ঢল নামছে বাংলাদেশের নদনদীতে। যমুনা ও মেঘনায় পানি বেড়ে প্লাবিত হয়েছে দেশের মধ্যাঞ্চল। দ্বিতীয় দফার বন্যায় প্রায় ২৫ জেলার ৪০ ভাগ এলাকা ডুবতে পারে।

দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২১ জেলার ১০২টি উপজেলাকে বন্যা উপদ্রুত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব উপজেলায় ৬৪০ ইউনিয়নের ছয় লাখ ৭৯ হাজার ১৭৮ পরিবার পানিবন্দি। বন্যায় এখন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৯ লাখ ২৩ হাজার ৮৩১ জন। আর মারা গেছেন ২৫ জন। জাতিসংঘের ওসিএইচএ বলছে, বন্যায় অন্তত ৫৪ জন মারা গেছেন। বাস্তুচ্যুত হয়ে আশ্রয় শিবিরে অবস্থান করছেন ৫৬ হাজার মানুষ।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, দেশের চারটি নদী অববাহিকার মধ্যে তিনটিতেই পানি বেড়েছে। এগুলোর মধ্যে ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা অববাহিকায় পানির সমতল আগামী ৪৮ ঘণ্টা অব্যাহতভাবে বাড়বে। গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় পানির সমতল স্থিতিশীল আছে। তবে পদ্মা নদীর অন্তত চারটি পয়েন্টে পানি বইছে বিপদসীমার উপরে। যমুনা নদী থেকে পদ্মায় পানি নেমে আসার ধারা অব্যাহত আছে। এ কারণে রাজধানীর আশপাশের নদীগুলোতে পানি বেড়েছে। পানি বাড়ার এ ধারা আরো ২৪ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে। সবমিলে দেশে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে।

রাজবাড়ী ও ফরিদপুরে পদ্মার পানি বিপৎসীমার উপরে বইছে। ফরিদপুরের ২৫টি ইউনিয়নের চার শতাধিক গ্রামের দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি। তলিয়ে রয়েছে বিভিন্ন সড়ক। শহর রক্ষা বাঁধের কিছু অংশ ভেঙে শহরে পানি প্রবেশ করায় ঝুঁকির মধ্যে লাখো মানুষ। শেরপুরে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বাড়ছেই। সদর উপজেলার আটটি ইউনিয়নের ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি। তলিয়ে গেছে ফসলি জমি, বাড়িঘর ও রাস্তাঘাট। বিচ্ছিন্ন রয়েছে সড়ক যোগাযোগ। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকট।

বগুড়ায় যমুনা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও, বাড়ছে বাঙ্গালী নদীর পানি। এতে নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আট হাজার ৭৫৪ হেক্টর জমির ফসল। সিরাজগঞ্জে যমুনার পানি কিছুটা কমলেও, দুর্ভোগ কমেনি বানভাসি মানুষের। এখনো পানিবন্দি প্রায় দুই লাখ মানুষ। এসব এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ না পৌঁছায় খাদ্য সংকটে মানুষ।
কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি এখনো বিপৎসীমার উপরে। রৌমারী, রাজিবপুর ও চিলমারী উপজেলা শহরে পানি প্রবেশ করায় অফিস, ব্যবসা বাণিজ্যসহ স্বাভাবিক কাজ কর্মে বিঘ্ন ঘটছে। এছাড়া চরাঞ্চলের দুই লাখের বেশি মানুষ মাস খানেক ধরে বন্যার পানিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

দেশের চলমান বন্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলও উদ্বিগ্ন। গত মঙ্গলবার জাতিসংঘের কো-অর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্সের (ওসিএইচএ) নিয়মিত ব্রিফিংয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ১৯৮৮ সালের পর এবারের বন্যা সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা আছে।

এদিকে, বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা করে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দুর্যোগ মোকাবিলার যথেষ্ট প্রস্তুতি রয়েছে সরকারের। বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হলেও ক্ষতিগ্রস্ত কেউ পুনর্বাসনের বাইরে থাকবে না। সামনে আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরো বন্যা হওয়ার শঙ্কা আছে। তবে আমাদের প্রস্তুতি আছে বন্যা মোকাবিলা করার।
পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনূন নিশাত ভোরের কাগজকে বলেন, এবার চলতি শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যা হতে পারে। ১৯৯৮ সালের বন্যার মেয়াদ ছিল ৬৩ দিন। ২০১৬ সালের পর চারটি বন্যা হয়েছে। ২০০৪ ও ২০০৭ সালেও মোটামুটি বড় বন্যা হয়েছে। কিন্তু কোনোটিই এবারের মতো এমন বড় ছিল না। মনে হচ্ছে এটি বেশ দীর্ঘস্থায়ী হবে। ইতোমধ্যে এবারের বন্যার বয়স ২৬ দিন হয়েছে। সবমিলে ৩৫ থেকে ৪০ দিন ধরে বন্যা চলতে পারে।

পরিবেশ ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. এ আতিক রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, এখন যে বন্যা সেটা পানি নামার বন্যা। নিম্নাঞ্চলে পানি নামতে গিয়ে প্লাবিত হচ্ছে। গত কয়েক দিনে সারাদেশে বৃষ্টি হওয়ায় প্রায় সব নদীতে পানি বেড়েছে। আগামী এক সপ্তাহ এ অবস্থা থাকবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান বলেছেন, ভারতের মেঘালয়, চেরাপুঞ্জি, আসাম, ত্রিপুরা, চীন ও নেপালের পানি এসে বাংলাদেশে বন্যার সৃষ্টি করেছে। বন্যা আরো বেশ কয়েকটি জেলায় বিস্তৃত হয়ে আরো সপ্তাহ দুয়েক স্থায়ী হতে পারে। নতুন ২৩ জেলায় বন্যা বিস্তৃতি লাভ করবে এবং তা আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হবে। চলমান বন্যা মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.