থমাস কুক : আধুনিক পর্যটনের জনক

থমাস কুক
থমাস কুক
আমরা সকলেই কম-বেশি ভ্রমণ করি। ভ্রমণের মাধ্যমে আমরা পর্যটন ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করছি। কিন্তু আমরা কতজনই বা আমাদের এই আধুনিক পর্যটন ব্যবস্থার জনক বা উদ্ভাবককে জানি? তাই আধুনিক পর্যটন ব্যবস্থার জনক সম্বন্ধে ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠকদের অবহিত করার উদ্দেশ্যে এই লেখা। প্রথমেই বলে রাখি, পূর্বে পর্যটন ব্যবস্থায় দুই শ্রেণির মানুষ ছিল। এক শ্রেণির লোক ছিল যারা অনেক ছুটি কাটাতে পারতো। মূলত তারা উচ্চবংশীয় এবং ধনাঢ্য লোকজন ছিল। আর অন্য শ্রেণির মানুষরা কোনো ছুটি পেত না।উচ্চবংশীয় বা ধনাঢ্য ব্যক্তিরা ভ্রমণের জন্য যথেষ্ট সময় পেতো যা মধ্য বা নিম্নশ্রেণীর লোকেরা কখনোই করতে পারতো না। এটা মূলত হয়ে থাকতো ২টি কারণে; ভ্রমণের জন্য যথেষ্ট অর্থ না থাকা এবং ভ্রমণের জন্য যথেষ্ট সময় না থাকা। তাই ভ্রমণ বা পর্যটন বলতে ধনীদের কাজ হিসেবে বুঝা হতো। এই ধারার পরিবর্তন করে দেন থমাস কুক এবং নিয়ে আসেন আধুনিক পর্যটন ব্যবস্থা। আধুনিক পর্যটন বলতে এমন ব্যবস্থাকে বুঝানো হয় যেখানে সকল স্তরের মানুষ তাদের নিজস্ব সামর্থ্য অনুযায়ী নিজ নিজ স্থান থেকে ভ্রমণে যেতে পারেন।

আধুনিক পর্যটন ব্যবস্থায় মূলত সকল স্তরের মানুষের জন্য গড়ে উঠেছে। এর ফলে শুধুমাত্র এক স্তরের মানুষ পর্যটনের স্বাধ না পেয়ে সকল স্তরের সকল মানুষ বর্তমানে ভ্রমণে যাচ্ছে। যাতে পর্যটনের উন্নতি দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই আধুনিক পর্যটন ব্যবস্থার জনক বলা হয় থমাস কুক-কে। থমাস কুক ছিলেন একজন ইংরেজ ব্যবসায়ী। তিনি মূলত সকলের নিকট পরিচিত তার বহুল পরিচিত ‘থমাস কুক এন্ড সন’ (Thomas Cook & Son)-নামক ভ্রমণ সংস্থার কারণে। তিনি ভ্রমণের এমন পন্থা উদ্ভাবন করেন যা তার পূর্বে কেউ করেননি।

থমাস কুক এন্ড সন
থমাস কুক এন্ড সন

থমাস কুক: 

১৮০৮ সালে মেলবোর্নে জন্মগ্রহণ করেন কুক। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি সেখানের বাজারে সাপ্তাহিক ছয় পেন্স (তৎকালীন ব্রিটিশ মুদ্রা)-এর বিনিময়ে এক মালির সহকারী হিসেবে কাজ করতো। ১৪ বছর বয়সে তিনি তার চাচার সাথে আলমারি তৈরির কাজ শুরু করে। তিনি খ্রিস্টধর্মে দিক্ষা দেয়ার কাজেও লিপ্ত ছিলেন। তিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময় লেইসেস্তেরে অতিবাহিত করেন। থমাস কুক ছিলেন একজন বিশিষ্ট স্ব-প্রতিষ্ঠ ব্যক্তিত্ত্বের অধিকারী। তাকে অনেক পেশা ও ব্যবসায় ঝুঁকি,বাধা-বিপত্তি, পরাজয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এমনকি এক সময় তাকে দেউলিয়াও হতে হয়েছিল।

কিন্তু, তিনি কখনই হাল ছাড়েননি বরং একের পর এক চেষ্টা করেই গেছেন। তিনি তার অসাম্প্রদায়িক চিন্তাধারার জন্য সবসময় লড়ে গেছেন। ১৫০ বছর আগে তিনি ভ্রমণ ও পর্যটন নিয়ে যে বিপ্লব, যে অভিনবত্ব নিয়ে এসেছেন তা এখনও চলছে। সর্বসাধারণের অবসর সময় বা ছুটিগুলো সহজলভ্য, সাশ্রয়ী, সু-রুচিসম্মতভাবে অতিবাহিত করার পথ তিনি দেখিয়ে গেছেন। ছুটির দিনের প্যাকেজ, ভ্রমণ হুন্ডি বা চেক, হোটেলে ছাড়, ছুটির দিনের প্রচারপত্রসহ বিভিন্ন ধরনের নতুন নতুন প্রথা নিয়ে আসেন,যার ফলে কম আয়ের মানুষও তাদের অল্প সময়ের ছুটিও অনেক সুন্দরভাবে উপভোগ করতে সক্ষম হয়।

শিল্প বিপ্লবের সময় নতুন নতুন রাস্তা, রেললাইন, রেলগাড়ি আসায় সবাই শহর মুখি হয়ে যাচ্ছিলো এবং এই কারণে ভ্রমণে বিভিন্ন দ্বার খুলে যায়। শিল্প বিপ্লবের পর সরকারিভাবে মানুষের সাপ্তাহিক ছুটি ও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলে মানুষ ভ্রমণের জন্য অধিক সময় পান। এছাড়াও অধিক অর্থ, জ্ঞান এবং ভ্রমণের উৎসাহ পায় কারণ, তখন ভ্রমণের জিনিসপত্র, যানবাহন ইত্যাদি সহজলভ্য হয়ে পরে। আর এই সুযোগটাই থমাস কুক লুফে নেন।

থমাস কুক এন্ড সন

১৮৪১ সালে মাত্র ১০ পাউন্ড দিয়ে ‘থমাস কুক & সন’ নামক একটি ভ্রমণ এজেন্সি খুলেন। তার এই এজেন্সির মাধ্যমে প্রথম ৫০০ জনকে নিয়ে ১২ মাইলের একটি স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভ্রমণ আয়োজন করেন, একই সালের ৫ই জুলাই তারিখে যার খরচ ছিল জনপ্রতি ১২ পেন্স বা ১ শিলিং(ব্রিটিশ মুদ্রা)। এটাই ছিল তার টার্নিং পয়েন্ট। এরপর তিনি একে একে লন্ডন, লিভারপুল, সেফফিল্ড, ব্রিস্টল সহ বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণের আয়োজন করেন। এছাড়াও তিনি রেলগাড়ির মাধ্যমে প্যারিস, ব্রাসেল, ফ্রাঙ্কফ্রুর্টেও ভ্রমণ আয়োজন করেন।

থমাস কুকের ট্যুর প্যাকেজ
তৎকালীন থমাস কুকের ট্যুর প্যাকেজ। ছবি : সংগৃহীত
তিনি মূলত তার কাজ নিন্মবিত্তদের জন্য শুরু করলেও পরবর্তীতে তার কাজের প্রসারের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের জন্যও তার কাজ অব্যাহত রাখেন। এমনকি তৎকালীন বড় বড় লোকেরাও তার এই সেবা গ্রহণ করেন। কিন্তু, ধনী গরিব সকলের জন্য ভ্রমণের একটা উৎস খোলার কারণে তৎকালীন কিছু ধনী ব্যক্তি তার কাজ পছন্দ করেননি,যার কারণে তাকে অনেকবার হেনস্তার শিকারও হতে হয়। কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি।
শুধুমাত্র তার এরকম পদক্ষেপের কারণেই যেখানে ১৮৫০ সালে লন্ডনের ১ লাখ ৬৫ হাজার মানুষ ইউরোপের বাহিরে ভ্রমণ করেছিল। ১৮৯৯ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৯ লাখ ৫১ হাজার জনে পরিনত হয়। আধুনিক পর্যটন ব্যবস্থার জনক এই থমাস কুক তার জীবনের শেষ সময়ে অন্ধ হয়ে যান এবং ১৮৯২ সালের ১৮ই জুলাই তারিখে লেইসেস্তারের কিংটনে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করা।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.