তাপদাহে ভালো নেই প্রাণিকুল

টানা তাপদাহে ভালো নেই চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার প্রাণীরা। তাদের মধ্যে দেখা দিচ্ছে খাবারে অনীহা ও আচরণগত সমস্যা। তীব্র গরম থেকে নিস্তার পেতে দিনের বেশিরভাগ সময় পানিতেই সময় কাটাচ্ছে বাঘ, সিংহ, ভালুকসহ অনেক প্রাণী-মো. রাশেদ

টানা তাপদাহে ভালো নেই চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার প্রাণীরা। তাদের মধ্যে দেখা দিচ্ছে খাবারে অনীহা ও আচরণগত সমস্যা। তীব্র গরম থেকে নিস্তার পেতে দিনের বেশিরভাগ সময় পানিতেই সময় কাটাচ্ছে বাঘ, সিংহ, ভালুকসহ অনেক প্রাণী-মো. রাশেদ

টানা তাপদাহে অতিষ্ঠ জনজীবন। প্রচণ্ড এই গরমে ভালো নেই চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার পশুপাখিও। চরম কষ্টে আছে তারা। তীব্র গরম থেকে পরিত্রাণ পেতে এখন সারাক্ষণ পানিতেই সময় কাটাচ্ছে চিড়িয়াখানার বাঘ, সিংহ, ভালুকসহ বেশিরভাগ প্রাণী। খরতাপে পাখিদের মধ্যেও বেড়েছে চরম অস্বস্তি। বাড়তে থাকা খরতাপে দেখা দিচ্ছে পানিশূন্যতা। গরমে অনেক প্রাণী শুধু হাঁপাচ্ছে। অনেকের খাবার গ্রহণে দেখা দিচ্ছে অনীহা। যে কারণে টানা কয়েক দিনের ভ্যাপসা গরমে প্রাণীদের স্বস্তি দিতে প্রতিদিনের খাবার তালিকায় আনতে হচ্ছে ভিন্নতা। প্রাণীদের সুস্থ রাখতে দেওয়া হচ্ছে বাড়তি স্যালাইন ও ভিটামিন সি। পানিশূন্যতা থেকে রক্ষা করতে দেওয়া হচ্ছে তরল খাবারও। জোরদার করা হয়েছে মনিটরিং কার্যক্রমও। চিড়িয়াখানায় সরেজমিন ঘুরে এমন চিত্রই উঠে এসেছে। তবে গরমে একটি প্রাণীরও যাতে শারীরিক কোনো সমস্যা না হয়, সে জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা রাখার কথা বলছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। এদিকে, এমন তাপদাহ আরও কয়েক দিন চলমান থাকার কথা বলছেন আবহাওয়াবিদরা।

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে এক সপ্তাহ ধরে তাপমাত্রা থাকছে গড়ে সাড়ে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে। গতকাল রোববার চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে মাংসাশী প্রাণীগুলো বেশি দুর্ভোগে পড়েছে। করোনা ও লকডাউনের কারণে বন্ধ সুনসান চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখা যায়, স্বাভাবিক সময়ের মতো চিড়িয়াখানার ভেতরে নেই পশুপাখির তেমন চিৎকার-চেঁচামেচি। স্বাভাবিক সময়ে খাঁচার চারপাশে ‘রাজার’ মতোই ঘুরে ঘুরে দিনের বেশিরভাগ সময় হুঙ্কার দিয়ে বাঘ ও সিংহ সময় পার করলেও এখন তা নেই। বাঘের দুটি বাচ্চা করোনা ও জয়া খাঁচার ভেতরের পানির চৌবাচ্চাতে একে অপরের সঙ্গে করছে দুষ্টুমি। তাদের সঙ্গে আছে বাঘ শাবক জো বাইডেন। তাদের এই দলে আছে বিরল সাদা বাঘ ‘শুভ্রা’ও। আছে তাদের মা ‘পরী’ ও বাবা ‘রাজ’। কখনও একে অন্যের ওপরে উঠে, কখনও বা একে অন্যকে পানি দিয়ে ভিজিয়ে কিংবা পানিতে ডুব দিয়ে কাটছে তাদের বেশিরভাগ সময়। কিছুক্ষণ পরপর পানিতে ডুব দেওয়া ও একে অপরের সঙ্গে পানি নিয়ে খেলায় মেতে ওঠার এমন চমৎকার দৃশ্য নজর কাড়বে যে কারও। তীব্র গরম থেকে কিছুটা হলেও স্বস্তি পেতে এভাবেই বেশিরভাগ সময় পানিতে কাটাতে দেখা যায় তাদের। অন্য প্রাণীরাও যারা স্বাভাবিক সময়ে একদিক থেকে অন্যদিকে দৌড়াদৌড়ি ও ছোটাছুটি করে বেশিরভাগ সময় পার করত, গরমে তাদের মধ্যে দেখা গেছে ভিন্নতা। এদের কেউ খাঁচার এককোণে বসে, কেউ বা আবার গাছের ছায়াতলে বসে পার করছে বেশিরভাগ সময়। বাঘদের মধ্যে চঞ্চলতা দেখা মিললেও সিংহ জোড়াকে খাঁচার মধ্যে ঝিম ধরে বসে থাকতে দেখা যায়। কালো ভালুক কখনও পানিতে, কখনও বা আবার গ্রিলে উঠে লাফ দিয়ে সময় পার করছে। খাঁচার এককোণে ছায়ায় বসে মায়া হরিণদের একে অপরের সঙ্গে খুনসুটিতে ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা যায়।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব ও হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমীন সমকালকে বলেন, ‘তীব্র গরমে মানুষের মতো পশুপাখির অবস্থাও কাহিল। টানা তাপদাহের কারণে চিড়িয়াখানার সব প্রাণীর ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গরমে কোনো প্রাণীর শরীরে যাতে পানিশূন্যতা কিংবা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা দেখা না দেয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতিনিয়ত দেওয়া হচ্ছে বাড়তি স্যালাইন, ভিটামিন সিসহ প্রয়োজনীয় খাবার। যত তাড়াতাড়ি গরমের মাত্রা কমে আসবে, তা মানুষের মতো প্রাণীদের জন্যও সুখকর হবে।’

চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর ডা. শাহাদাত হোসেন শুভ সমকালকে বলেন, ‘গরমের এ সময়ে প্রাণীদের প্রশান্তি দিতে আমরা বদ্ধপরিকর। প্রতিটি খাঁচার চৌবাচ্চায় প্রতিদিন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি লিটার পানি পরিবর্তন করে দেওয়া হচ্ছে। তাদের স্বাস্থ্যগত বিষয়টি চিন্তা করে দেওয়া হচ্ছে বাড়তি স্যালাইন ও ভিটামিন সি। পানির অভাব পূরণ করে এমন খাবার বেশি দেওয়া হচ্ছে। গরমের তীব্রতা বর্তমানে অনেক বেশি হওয়ায় বাঘ, সিংহ, ভালুকসহ বেশিরভাগ প্রাণী সারাক্ষণ পানিতেই থাকছে। তাদের এখন অতিরিক্ত যত্ন নেওয়া হচ্ছে। কোনো প্রাণীর শারীরিক আচরণে সামান্য পরিবর্তন দেখা দিলে তাৎক্ষণিক পরীক্ষা করে ব্যবস্থা নিচ্ছি। বাড়তি কর্মীরা তাদের সর্বক্ষণ নজরদারিতে রাখতে দায়িত্ব পালন করছেন।’

আবহাওয়াবিদ আবুল হাসানাত বলেন, ‘চট্টগ্রামে বৃষ্টি না হওয়ায় তাপমাত্রা বেশি অনুভূত হচ্ছে। টানা গরমের এমন পরিস্থিতি আরও কয়েক দিন থাকবে। কয়েক দিনের মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কাও আছে।’

১৯৮৯ সালে চট্টগ্রাম নগরের ফয়’স লেকের পাহাড়ের পাদদেশে ছয় একরে নির্মিত বিনোদন কেন্দ্রটি টিকিট বিক্রির টাকায় এরই মধ্যে পেয়েছে নান্দনিকতা; এটি রূপলাভ করছে ১০ একরে। চট্টগ্রামের অন্যতম এই বিনোদন কেন্দ্রটিতে চিত্রা হরিণ, শালিক, ককাটিয়েল, মায়া হরিণ, গয়াল, শজারুসহ দেশি-বিদেশি প্রায় ৬৭ প্রজাতির ছয় শতাধিক পশুপাখি রয়েছে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: