ডিএসইর লা মেরিডিয়ান কাণ্ড

মেরিডিয়ান হোটেলকে সরকারি কোম্পানির তকমা দিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে পাশ কাঠিয়ে সরাসরি তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়।

লা মেরিডিয়ান কাণ্ডে জালিয়াতির আরেক ঘটনা

বেসরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিকে ‘সরকারি মালিকানার তকমা’ দিয়ে শেয়ারবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ লুটের অভিনব এক আয়োজন সম্পন্ন করেছিল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালনা পর্ষদ। কাজটি করা হয়েছিল পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কোনো অনুমোদন ছাড়া।

পর্যটন খাতের যে কোম্পানিকে ডিএসইতে সরাসরি তালিকাভুক্ত করতে পর্ষদের অনুমোদনের জন্য আলোচ্যসূচিভুক্ত করা হয়েছিল সেটি হলো বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেড। এ নামে সাধারণ মানুষের কাছে কোম্পানিটি অপরিচিত। কিন্তু রাজধানীর নিকুঞ্জে পাঁচ তারকা হোটেল ‘লা মেরিডিয়ান’ হয়তো সবাই চেনেন। সেই হোটেল এই বেস্ট হোল্ডিংসেরই মালিকানাধীন।

আইন করে শেয়ারবাজারে বেসরকারি কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ করে রেখেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। কিন্তু সেই আইনের ফাঁকফোকর খুঁজে বের করে বেসরকারি লা মেরিডিয়ান হোটেলকে সরকারি মালিকানার কোম্পানি বানিয়ে তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নিয়েছিলেন ডিএসইর প্রভাবশালী এক সদস্য। যিনি ১৯৯৬ ও ২০১০ সালে দুবারের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির জন্য অভিযুক্ত।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও বেসরকারি একটি কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে কয়েক শ কোটি টাকা তুলে নেওয়ার এ চেষ্টার কথা জানতে পেরে ছুটির দিনে ত্বরিত হস্তক্ষেপ করে বিএসইসি। বিজয় দিবসের ছুটির মধ্যেই জরুরি নির্দেশনা দিয়ে ডিএসইর পর্ষদ সভায় কোম্পানিটির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ডিএসইর কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা তলব করা হয়।

জানতে চাইলে ডিএসইর সভাপতি ইউনুসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোম্পানিটির সরাসরি তালিকাভুক্তির আবেদন স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে এসেছিল। নিয়ম অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কমিটির পক্ষ থেকে বিষয়টি পর্ষদের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছিল। তাই এ বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তা পর্ষদ সভার আলোচ্যসূচিভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী আমরা পরবর্তী ব্যবস্থা নেব।’

কেন সরকারি কোম্পানির তকমা

শেয়ারবাজারে আসার আগেই কোম্পানিটি প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকের কাছ থেকে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করে। ব্যাংকগুলো প্রাইভেট প্লেসমেন্টে প্রতিটি শেয়ার ৬৫ টাকায় কেনে। একটি শক্তিশালী গোষ্ঠীর চাপেই মূলত রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে প্লেসমেন্টে চড়া দামে শেয়ার কিনতে বাধ্য করা হয়। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের কেনা শেয়ারের ‘মালিকানার’ অংশের কারণেই কোম্পানিটিকে সরকারি কোম্পানির তকমা দিয়ে সরাসরি তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য অর্থমন্ত্রীর লেখা একটি চিঠিকেও ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও বিএসইসির চেয়ারম্যানকে লেখা ওই চিঠিতে যদিও কোনো নির্দেশনা ছিল না।

বিএসইসির আইনে বেসরকারি খাতের কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তি বন্ধ রাখা হলেও সরকারি কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে এ ধরনের বিধিনিষেধ নেই। এ কারণে রাষ্ট্রমালিকানাধীন চার ব্যাংকের শেয়ারের মালিকানার অংশকে ‘সরকারি মালিকানা’ দাবি করা হয়, যাতে সরাসরি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করা যায়।

জানতে চাইলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরে আসার পর কমিশনের পক্ষ থেকে আইনানুগ যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার, সেটিই করা হয়েছে। এর বেশি তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

লা মেরিডিয়ান হোটেল শেয়ারবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে ৪ কোটি ৩৫ লাখ ৪৮ হাজারের বেশি শেয়ার বিক্রি করতে চায়। প্রতিটি শেয়ার ৬৫ টাকা দামে বিক্রির আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে কোম্পানিটির পক্ষ থেকে। এ দামেই চার রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের কাছে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার বিক্রি করা হয়েছিল।

নিয়ম অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে যেসব শেয়ার বিক্রি করা হয় সেই শেয়ার বিক্রির টাকা কোম্পানির হিসাবে জমা হয় না। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রি করে যে অর্থ পাওয়া যায়, তা সরাসরি জমা হয় উদ্যোক্তাদের পকেটে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, বর্তমানে লা মেরিডিয়ান হোটেলের শেয়ারধারী প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে রাষ্ট্রমালিকানাধীন একটি ব্যাংক তাদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করে দিল। ওই শেয়ার বিক্রি থেকে যে টাকা পাওয়া যাবে, তা জমা হবে ব্যাংকটির হিসাবে। কোম্পানি হিসেবে লা মেরিডিয়ান হোটেলের এতে লাভবান হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

এদিকে বেসরকারি কোম্পানিকে সরকারি কোম্পানির তকমা দিয়ে ডিএসইর পর্ষদ সভার অনুমোদনের জন্য আলোচ্যসূচিভুক্ত করা হয়েছে গতকাল বুধবার, সরকারি ছুটির দিনে। ডিএসইর প্রভাবশালী ওই সদস্যের পরিকল্পনায় এদিনটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে, যাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ বিষয়ে ত্বরিত কোনো ব্যবস্থা নিতে না পারে। আবার আগেভাগে বিষয়টি যাতে জানাজানি না হয়, সে জন্য নিয়মিত আলোচ্যসূচির বাইরে ‘অতিরিক্ত আলোচ্য’ বিষয় হিসেবে এটিকে নথিভুক্ত করে ডিএসইর পরিচালকদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী, পর্ষদ সভার আলোচ্যসূচি দুই দিন আগে চূড়ান্ত করে প্রত্যেক পরিচালকের কাছে পাঠাতে হয়। যাতে পরিচালকেরা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে পারেন। ডিএসইর আজ বৃহস্পতিবারের পর্ষদ সভার জন্য দুই দিন আগে পরিচালকদের কাছে যে আলোচ্যসূচি পাঠানো হয়েছিল, সেখানে বেস্ট হোল্ডিংসের তালিকাভুক্তির বিষয়টি ছিল না। গতকাল অতিরিক্ত আলোচ্যসূচি হিসেবে এটিকে অন্তর্ভুক্ত করে পরিচালকদের কাছে মেইল পাঠান ডিএসইর কোম্পানি সচিব আসাদুর রহমান। ডিএসইর এ কোম্পানি সচিব আবার সংস্থাটির প্রভাবশালী ওই পরিচালকের ক্রীড়নক হিসেবেই কাজ করেছেন।

জানা গেছে, কোম্পানিটিতে ব্যাংকের লগ্নি করা অর্থ ও প্রাইভেট প্লেসমেন্টে শেয়ার কেনা কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ করা অর্থ ফিরিয়ে দিতেই এটিকে যেকোনো উপায়ে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে একটি গোষ্ঠী। এ যাত্রায় বিএসইসির হস্তক্ষেপে আপাতত উদ্যোগটি ভেস্তে গেলেও এটির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে। আর কোম্পানিটিতে বিপুল মূলধন বিনিয়োগে বাধ্য হওয়া রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলো তাদের এ অর্থ কীভাবে ফেরত পাবে, আদৌ ফেরত পাবে কি না, সেটি নিয়েও আছে সংশয়।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.