চিড়িয়াখানায় ধারণক্ষমতার চেয়ে বেড়েছে প্রাণী, আসছে মাস্টারপ্ল্যান

চিড়িয়াখানায় ধারণক্ষমতার চেয়ে বেড়েছে প্রাণী, আসছে মাস্টারপ্ল্যান

গতবছর সব মিলিয়ে সাতমাস দশদিন বন্ধ ছিল দেশের জাতীয় চিড়িয়াখানা। বন্ধ থাকার সুবাদে নিরিবিলি পরিবেশে খাঁচাবন্দি প্রাণীরা একটু হাঁফ ছাড়ার সুযোগ পেয়েছিল। এ সুযোগে নতুন অনেক প্রাণীর জন্ম দেখেছে চিড়িয়াখানা। এ বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মে পর্যন্ত জন্ম নিয়েছে ৪২টি বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী। আর গতবছর জন্ম নিয়েছে ১১৬টি। তবে এত প্রাণীর স্থান সংকুলান দিনদিন কঠিন হয়ে পড়ছে।

মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী একদম জঙ্গলের অনুভূতি দিয়ে সাজানো হবে চিড়িয়াখানা। মানুষ যখন প্রাণীর খাঁচার সামনে আসবে তখন কোনো দেওয়াল দেখবে না। একদম প্রাকৃতিক মনে হবে। দেওয়ালের বদলে থাকবে ইলেকট্রিক ফেন্স। এগুলো এমনভাবে সাজানো থাকবে যে দেখলে মনে হবে অনেকটা জায়গা জুড়ে জঙ্গল আছে।

এছাড়া নিশাচর প্রাণীদের দেখানোর দর্শকদের জন্য থাকবে নাইট সাফারির ব্যবস্থা। বর্তমান চিড়িয়াখানায় লেক আছে দুইটি। এগুলোর আধুনিকায়ন করা হবে, থাকবে ভাসমান রেস্তোঁরা। বাচ্চাদের জন্য তৈরি হবে এমিউজমেন্ট পার্ক। থাকবে বাফার জোন এবং ওয়াকওয়ে।

এসময় তিনি হরিণ, ময়ূর, জেব্রা, জিরাফ, আফ্রিকান হর্স, ইমু পাখি ও জলহস্তির কথা বিশেষ করে উল্লেখ করেন। লতীফ ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ছয়টা জলহস্তীর ধারণক্ষমতা আছে এখানে। এগুলো বেড়ে হয়েছে ১৩টা। তিনটি শেডে ১৫০ হরিণ রাখার জায়গা আছে, হরিণের সংখ্যা এখন ৩৫০। ইমু ও ময়ূরের ডিম ফোটানোর জন্য বিশেষ ইনকিউবেটর কেনা হয়েছে। ফলাফলে ১৪টি ইমু ও ১৬টি ময়ূরের বাচ্চা জন্মেছে। আরো ৭০টা ময়ূরের ডিম হ্যাচারিতে দেওয়া আছে। সেখান থেকে আরো কিছু পাওয়া যাবে। অন্যান্য প্রাণীও বাড়ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে চিড়িয়াখানায় কোনো প্রাণীর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি বলে জানা গেছে। স্বাভাবিক আয়ুস্কাল পেরিয়ে যাওয়া গুটি কয়েক প্রাণী প্রাণ হারিয়েছে। লতীফ ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, প্রাকৃতিক পরিবেশে থাকলে প্রাণীর আয়ুস্কাল একটু বেশি হয়। চিড়িয়াখানায় বন্দি অবস্থায় এটা দুই থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কমে যায়। তবে দুঃখের ব্যাপার হলো, বাঘের খাবারের বরাদ্দ দুই কেজি কমিয়ে দেওয়ায় বাঘের স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

জানা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ প্রাণীগুলোর মধ্যে বর্তমানে বাঘ আছে ৯ টা, সিংহ ৫টা, জলহস্তি ১৩টি, হরিণ ৩৫০, জেব্রা ৭টা, জিরাফ আছে ৮টি, হাতি ৫টি, গণ্ডার একটি, শকুন ১৩টি, ময়ূর ৩২টা, ইমু পাখি ২৮টা, চিতাবাঘ ২টা, ভল্লুক ৩টা ও চার প্রজাতির বানর ৬০টা। সব মিলিয়ে ১৩৫ প্রজাতির তিন হাজারের অধিক প্রাণী আছে ১৮৬ একর আয়তনের জাতীয় চিড়িয়াখানায়।

এত বাড়তি প্রাণী সামাল দিতে পর্যাপ্ত জায়গা ও লোকের অভাবে হিমশিমই খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। ফলে বনবিভাগের অনুমতি সাপেক্ষে হরিণ ও ময়ূর বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যেকেউ নির্ধারিত শর্ত মেনে অনুমতি নিয়ে কিনতে পারবেন এই দুইটি প্রাণী। একজোড়া করে হরিণ ও ময়ূর পাওয়া যাবে যথাক্রমে এক লাখ চল্লিশ হাজার এবং পঞ্চাশ হাজারে। তবে অন্যান্য প্রাণী বিক্রির সুযোগ নেই। সেগুলো বাইরের দেশের সঙ্গে বিনিময় বা দেশের অন্যান্য চিড়িয়াখানায় পাঠানোর চিন্তাভাবনা চলছে।

প্রচুর গাছ ও বড় জলাশয় থাকার কারণে ঢাকার স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে কমপক্ষে দুই ডিগ্রি তাপ কম থাকে চিড়িয়াখানায়। তবু চলমান তাপদাহে ভূগেছে প্রাণীগুলো। এগুলোকে রক্ষার জন্য এদের ঘরে পানি স্প্রে করা হয়েছে, ছাদের তাপ ঠেকাতে ছয় থেকে আট ইঞ্চি পুরু করে খড় বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং দরজা-জানালায় ভেজা চট ঝোলানো হয়েছে। পাশাপাশি ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতি পূরণে প্রাণীদের স্যালাইন ওয়াটার, ভিটামিন সি ও রসালো ফল বিশেষ পদ্ধতিতে খাওয়ানো হচ্ছে।

চিড়িয়াখানায় প্রজনন বাড়ার কারণ হিসেবে দর্শনার্থীদের ভিড় না থাকাকেই উল্লেখ করেছেন চিড়িয়াখানার পরিচালক ডাঃ মোঃ আব্দুল লতীফ। তিনি ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, দর্শনার্থী থাকলে কেউ ঢিল ছুড়ে, কেউ হাততালি দিয়ে নানাভাবে প্রাণীদের বিরক্ত করে। এতে প্রজননের ব্যাঘাত ঘটতো। পাশাপাশি গবেষণা করে আমরা একটি আধুনিক খাবারের চার্ট তৈরি করেছি। সব প্রাণী এখন প্রয়োজনীয় পুষ্টিসম্পন্ন খাবার পাচ্ছে। উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে এখন কিছু প্রাণী এমন ভাবে বেড়েছে যে রাখার মতো পর্যাপ্ত জায়গা হচ্ছে।

দেখা গেছে, বর্তমানে চিড়িয়াখানায় প্রাণীগুলোর খাঁচা বেশ এলোমেলোভাবে সাজানো। নতুন পরিকল্পনায় এগুলো থাকবে সুনির্দিষ্ট জোনভিত্তিক। যেমনঃ সুন্দরবন কেন্দ্রিক প্রাণীগুলো থাকবে একপাশে, এর নাম হবে বাংলাদেশ হ্যাবিটেট। আফ্রিকান জঙ্গলের প্রাণী জিরাফ, জেব্রা, জলহস্তী ইত্যাদি থাকবে আরেক পাশে। এ ভাগের নাম হতে পারে আফ্রিকান হ্যাবিটেট। পিট এনিমেলের আলাদা একটা জোন হবে। এভাবে পাঁচটি জোন হবে।

জানা গেছে, চিড়িয়াখানাকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এটাকে মাস্টারপ্ল্যান নামে উল্লেখ করা হয়েছে। ধাপে ধাপে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলবে। সব কিছু ঠিক থাকলে সামনের বছরের জুন মাসে পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা হাতে পাবে কর্তৃপক্ষ। এর বাইরে বর্তমানেই রাজা বাহাদুর ও সুন্দরী নামের দুইটি হাতিকে ফুটবল খেলা শেখানো হয়েছে। তারা রীতিমতো দৌড়ে ফুটবল খেলতে পারে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.