ক্রাবির সর্বোচ্চ মন্দির টাইগার হিলে

ক্রাবির সর্বোচ্চ মন্দির টাইগার হিলে

ফিফি আইল্যান্ড থেকে আমাদের গন্তব্য ক্রাবিতে। ফেরিতে চড়ে আন্দামান সমুদ্রের প্রায় ৪১ কিলোমিটার পথ পাড়ি সেখানে যেতে হবে। সকাল ৯টায় আমি এবং হাসান দু‘জন ফেরিতে উঠলাম। আমাদের মতো বিভিন্ন দেশের শতাধিক পর্যটক আছেন এই ফেরিতে। নীল পানির বুক চিড়ে ফেরি চলছে।

মাঝে মাঝে দেখা মিললো সমুদ্রের মধ্যে জেগে উঠা ছোট ছোট পাহাড়ের দ্বীপ। আমি আর হাসান ফেরির ছাদে দাঁড়িয়ে অবাক বিস্ময়ে দেখছি সমুদ্র ও পাহাড়ের অপরূপ দৃশ্য। চোখ জোড়ানো এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যে আমরা ক্রাবি ফেরিঘাটে পৌছে গেলাম টেরই পেলাম না।

ফেরি থেকে নেমে হাসান তার লাগেজ আমার কাছে রেখে বলল, ‘তুই দাঁড়া আমি একটু বাথরুম থেকে আসি।’

বেশি দেরি করিস না বলে আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। ফিরে আসার পর হাসানের হাসিমাখা মুখ দেখে বললাম, ‘কিরে হঠাৎ তোর মুখে আলোর ঝলকানি। ব্যাপার কী?’

হাসান বলল, ‘টাকা লাগেনি। তাই দুটোই একসাথে সেরে এসেছি। থাইল্যান্ডে এমন সুবিধা আর কোথাও মিলবে না। তুইও সেরে আস।’

থাইল্যান্ডের মাটিতে ফ্রি কোনো কিছু পাওয়া যায় না। তাই প্রয়োজন না সত্ত্বেও আমিও ঘুরে আসলাম।

ফেরিঘাট থেকে আমাদের হোটেল বেশি দূরে নয়। কিন্তু অচেনা দেশে রিকশা না নিয়ে ফিক্সড ভাড়ায় ট্যাক্সি ভাড়া নিলাম। মিনিট দশেকের মধ্যে আমারা পৌঁছে গেলাম অনলাইনে বুকিং দেয়া ‘ডি আন্দামান হোটেলে’। চেক ইনের সময়ের আগেই চলে আসায় আমরা রুম পেলাম না। হোটেল কর্তৃপক্ষকের পরামর্শে আমরা লবিতে ব্যাগ রেখে চলে গেলাম সুইমিং পুলে। আমি পুলের পাশে রাখা চেয়ারে গা হেলান দিলাম।

হাসান পানিতে নেমে বলল, তুই নবাবের মতো শুয়ে আছিস। এত সুন্দর সুইমিং পুল! তুই নামবি না?

সাগরে সাঁতার কাটার পর সুইমিং পুল আমাকে আকর্ষণ করছে না। বললাম আমি।

হাসান একা একা কতক্ষণ সাঁতার কেটে ক্লান্ত হয়ে উঠে এলো। ততক্ষণে হোটেলে রুম পাওয়ার সময় হয়ে গেছে। দু‘জন লবি থেকে ব্যাগ নিয়ে রুমে চলে গেলাম। রুমের ইর্নেরিয়র রীতিমতো টাসকি খাওয়ার মতো। কাঠের দরজা-জানালা, খাট-পালংক, আলমারি সব কিছুতে একটা বাদশাহী ভাব। মনে হলো তুরস্কের সুলতান সোলেইমানের কোনো বিলাসী কক্ষ।

হোটেল থেকে বের হয়েই হাসান বলল, ‘চল আশপাশে কোথাও খেয়ে নেই।’

মিনিট দশেক হাঁটার পর ‘পিয়ারলি অহ বিস্ত্র’ নামের একটি রেস্টুরেন্ট চোখে পড়ল। দু‘জন সেখানে গিয়ে বসলাম। রেস্টুরেন্টটি ছোট হলে বেশ নান্দনিকভাবে সাজানো। ম্যানু হাতে এগিয়ে এলো এক সুন্দরী তরুণী। কোমর পর্যন্ত কালো কেশ, মিষ্টি ও বিনয়ী হাসি দেখে আমরা মুগ্ধ হয়ে গেলাম।

দু‘জনেই ফ্রাইড রাইস এবং সি-ফুডের অর্ডার দিলাম। বেশ আন্তরিকতার সাথে তরুণী খাবার পরিবেশন করল। কথা বলে জানতে পারলাম তার ডাক নাম পিয়ার। এমবিএ শেষ করে সে এই দোকান পরিচালনা করছে।

হাসান ফেরিঘাট থেকে ফেরার পথে চালকের ফোন নম্বর সেভ করে রেখেছিল। খাবার শেষ হওয়ার পর সে চালককে ফোন দিল।

কিছুক্ষণের মধ্যে চালক হোটেলে হাজির। তাকে সব বুঝিয়ে বলার পর তিনি জানালেন, ‘এই সময়ে শহরের কিছু দর্শনীয় স্থান দেখতে পারবেন। আর ক্রাবির আকর্ষণীয় টাইগার মন্দির না দেখলে ক্রাবি আসা বৃথা।’

আমরা বললাম, ‘আগে টাইগার হিলে নিয়ে চলেন। তারপর অন্য জায়গায় ঘুরব।’

গাড়ি আমাদের নিয়ে চলছে টাইগার হিলের দিকে। জানালা দিয়ে আমরা একপলকে শহর দেখা নিলাম। ফুকেটের চেয়ে বেশ শান্ত এই শহর। নেই কোনো কোলাহল ও যানজট। গাড়ি গিয়ে থামল মন্দিরে কাছে।

চালক বললেন, ‘আপনাদের ফিরে আসতে আড়াই তিন ঘণ্টা সময় লাগবে। আমি এখানেই অপেক্ষা করব।’

টাইগার কেইভ টেমপেল মাউটেন্ট যা টাইগার হিল মন্দির নামে পরিচিত। সমতল ভূমি থেকে ৩০৯ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট এ মন্দিরের আরোহণ করতে হলে ৬০০ মিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। আর ১২,৬০টি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হবে মূল মন্দিরে। এ তথ্য জানার পর অনেক পর্যটক নিচ থেকেই ঘুরে চলে যান। আমি এবং হাসান দু‘জনই সিদ্ধান্ত নিলাম যত কষ্টই হোক মন্দিরের চূড়ায় উঠব।

সাহস সঞ্চয়ের জন্য প্রথমে দু‘জনে মূল মন্দিরের নিচে ছোট ছোট মিন্দরগুলো দেখে নিলাম। তারপর এক বোতল পানি কিনে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠা শুরু করলাম। প্রথম দিকে দু‘জনে গুনে গুনে সিঁড়ি পার হচ্ছি। কয়েক‘শ সিঁড়ি আরোহণের পর কারও মুখ দিয়ে আর কথা বের হচ্ছিল না। এই পথেই অনেক পর্যটক উপর থেকে নেমে আসছেন। তাদের চেহারায় মাউন্টেন এভারেস্ট জয়ের হাসি। আমি একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম কর কতদূর? সে হেসে উত্তর দিলো, ‘সবে তো শুরু। আরও বহুপথ পাড়ি দিতে হবে।’

খাঁড়া সিঁড়ি বেয়ে চলতে গিয়ে দু‘জনের শরীর দিয়ে ঘাম ঝরছে। কয়েক দফা বিরতি নিয়ে আমরা পৌঁছলাম মাঝপথে। সাথে থাকা পানিও প্রায় শেষ। সিঁড়ি বেয়ে উঠার পথে পাহাড়ের ওপর বৌদ্ধমূর্তির দেখা পেলাম। দু‘জন একের পর এক সিঁড়ি বেয়ে চলছি। ঘামে আমাদের টি-শার্ট ভিজে একাকার। দু‘জন টি-শার্ট খুলে কাঁধে রেখে আবার চলা শুরু করলাম। বড় বিপদে পড়েও কখনো আমার হাঁটু কাঁপেনি। কিন্তু এক হাজার সিঁড়ি উঠার পর আমার দু‘হাঁটু কাঁপতে শুরু করল। হাঁটুতে কোনো বল পাচ্ছিলাম না। তাই এক হাত সিঁড়ির র‌্যালিংয়ে আর অন্য হাত হাঁটুতে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে পা থেকে হাঁটু খুলে পড়ে যাবে। হাসানের মুখেও কোনো হাসি নেই। আমাদের এ অবস্থা দেখে এই পথে ফিরে আসা পর্যটকরা বললেন, ‘তোমরা প্রায় এসে গেছ। আর একটু কষ্ট কর।’

শরীর যখন প্রায় শক্তিশূন্য তখন পৌঁছলাম পাহাড়ের চূড়ার মূল মন্দিরে। হাসান ব্যাগ রেখেই মন্দিরের পাশে রাখা একটা কাঠের বেঞ্চিতে শুয়ে পড়ল। আমি পাশে বসে হা করে নি:শ্বাস নিচ্ছি।

একটু পর লক্ষ্য করলাম হাসান প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছে। যেখানে সেখানে ঘুমের জন্য হাসানের বেশ খ্যাতি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ক্লাসেই সে শেষের বঞ্চে শুয়ে ঘুমিয়ে যেত।

আমি হাসানকে ডেকে তুলে বললাম, ‘এখানে বিনামূল্যে খাবার পানির ব্যবস্থা আছে। হাতমুখ ধুয়ে গলা ভিজিয়ে নেই।’

হাসানের সাথে আমিও তৃষ্ণা মিটিয়ে নিলাম। মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষায় দু‘জনেই জুতো খুলে মন্দিরে প্রবেশ করলাম। এটি সম্ভবত ক্রাবির সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থিত কোন মন্দির। এখান থেকে গোটা ক্রাবি শহরকে ছবির মতো দেখা যাচ্ছে। দূরের পাহাড়গুলোকে মনে হচ্ছে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আমাদের চোখের সামনে দূর দিগন্তে সূর্য পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে গেল। এ চূড়ায় মূলত গৌতম বৌদ্ধের বিশালাকৃতি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। পুরো মন্দিরে রয়েছে ছোট-বড় আরও বেশ কিছু মূর্তি। আমি এবং হাসান স্বল্প সময়ে মন্দিরের প্রায় সব অংশ বিচরণ করলাম।

এবার নামার পালা। উচ্চতার কথা চিন্তা করতেই দু‘জনের গলা শুকিয়ে গেল। খাঁড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠার চেয়ে নামা অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ। দু‘জনেই বেশ সাবধানে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসলাম। এভারেস্ট জয়ের মতো আনন্দে আমাদের ক্লান্তি অনেকটা কমে গেল। চালক তখন আমাদের অপেক্ষায় ছিল। গাড়িতে চড়ে তাকে বললাম নতুন কোথাও নিয়ে যেতে।

গোধুলীর আলোতে গাড়ি ছুটে চলছে। চালক আমাদের নিয়ে দাঁড়ালেন ভিউ পয়েন্ট নামে একটি দর্শনীয় স্থানে। ক্রাবি শহরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদীর বুকে জেগে উঠা দুটি পাহাড় মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে থাকার অপরূপ দৃশ্য এখান থেকে উপভোগ করা যায়। পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য এখানে রয়েছে গ্রাউন্ড ব্ল্যাক ক্রাব বা ধাতবের তৈরি বৃহদাকৃতির কাঁকড়া। আছে ঈগলের বিশাল স্ট্যাচু। ঈগলের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার ক্ষেত্রে হাসান কোন অনুভূতি প্রকাশ করল না। তবে কাঁকড়ার সাথে বিভিন্ন ভঙ্গিতে ছবি তুলতে তুলতে সে বলল, ‘জীবনে কাঁকড়ার অনেক চিমটি খেয়েছি। আজ ছবি তুলে উসুল করে নিলাম।’

আমি বললাম, ‘সিঁড়ি বেয়ে ক্ষুধা লেগেছে চল কোথাও খেয়ে নেই।’

হাসান বলল, ‘ক্রাবিতে খেতে হলে পিয়ারের এখানেই খাবো।’

খাবারের অজুহাতে এমন সুন্দরীর দেখা পাওয়া মন্দ নয়। আমিও কোনো আপত্তি করলাম না।

দ্বিতীয় দফায় আমাদের দেখে পিয়ার বেশ আনন্দিত হলো। সে বলল, ‘তোমরা চাইলে কাঁকড়া দিয়ে তৈরি এখানকার জনপ্রিয় খাবার পরিবেশন করতে পারি।’

দু‘জনেই হাসি দিয়ে জানিয়ে দিলাম আমরা রাজি।

পিয়ার জানতে চাইলো সিদ্ধ নাকি টাটকা?

ওরে বাবা। জ্যান্ত কাঁকড়া খাবো নাকি? আমাদের উল্টো খেয়ে ফেলবে। তুমি সিদ্ধ করেই দাও। আমি বললাম।

তাই হবে বলে হেসে কিচেনে চলে গেল পিয়ার। কিছুক্ষণ পর পেঁয়াজ কাঁচামরিচসহ খুব সুন্দরভাবে সে খাবার পরিবেশন করল। বরাবরের মতোই হাসান মুখে দিয়েই বলল আহা।

আমিও খেয়ে দেখলাম বেশ সুস্বাদুই হয়েছে। বেশ আয়েশ করে দু‘জন কাঁকড়া ভোজন করলাম। বিল পরিশোধের পর বিদায় নেয়ার পালা। পিয়ার বেশ উৎসাহ নিয়ে আমাদের সাথে ছবি তুলল। আমরা বিদায় নিয়ে চলে আসলাম।

রাত প্রায় ৮টা। চালককে নতুন কোথাও নিয়ে যেতে বললাম। তিনি আমাদের ক্রাবি কালচারাল ওয়াকিং স্ট্রিটে নিয়ে আসলেন। সড়কের দু‘পাশে পসরা করে সাজানো বিভিন্ন খাবারের দোকান। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। একটা জায়গায় মঞ্চ বানিয়ে তাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে। আমি এবং হাসান সেখানে বসে স্থানীয় এক শিল্পীর গান উপভোগ করলাম। সকালে আমাদের ব্যাংকক যাওয়ার ফ্লাইট। তাই ফিরে আসতে হলো হোটেলে। ক্রাবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য এখানে একটু রাত হলেই নীরবতা নেমে আসে। শান্ত এই নগরী বলতে গেলে অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়ে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.