করোনাকালে রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়াবে তুলসী

তুলসী ঔষধি গুণসম্পন্ন গাছ যার বৈজ্ঞানিক নাম ওসিমাম সাঙ্কটাম। তুলসীর অর্থ যার তুলনা নেই। তুলসী গাছ লামিয়াসি পরিবারের অন্তর্গত একটি সুগন্ধী উদ্ভিদ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে তুলসীর বিশেষ কদর আছে। এখন অবশ্য তুলসী পাতার গুণ ও তুলসীর রসে তৈরি ওষুধের আন্তর্জাতিক খ্যাতিও রয়েছে। তুলসী পাতা শুধু নয়, গোটা গাছটাই আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় লাগে।এই বর্ষায় নানা সংক্রামক রোগের উপদ্রব বাড়ে । তার উপর আবার করোনাভাইরাস। সর্দি-হাঁচি-কাশি মানেই আতঙ্ক। আর যদি হাঁপানি বা শ্বাসকষ্ট আগে থেকেই থাকে, তাহলে তো ভারী বিপদ। ভাইরাস জাঁকিয়ে বসবে শরীরে।

তাই এই করোনা কালে শরীরে রোগ প্রতিরোধ শক্তি কয়েকগুণ বাড়িয়ে রাখা দরকার।এই রোগ প্রতিরোধ শক্তি বা ইমিউনিটিকে জাগিয়ে তোলার অনেক রকম ঘরোয়া দাওয়াই আছে। বিশেষত এই সঙ্কটের সময় যারা ডাক্তারের কাছে যেতে ভয় পাচ্ছেন। তাদের জন্য মোক্ষম দাওয়াই হল তুলসী পাতা। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে তো তুলসীর স্থান অনেক উপরে। জীবাণুনাশক, রোগ-প্রতিরোধক হিসেবে তুলসীকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

ভেষজ গাছ-গাছড়ার মধ্যে সেরা তুলসী
তুলসীর ভেষজ গুণ অনেক। ভিটামিন এ ও ভিটামিন সি ভরপুর থাকে তুলসীতে। আর থাকে ক্যালসিয়াম, জিঙ্ক, আয়রন, ক্লোরোফিল। অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিফাঙ্গাল, জীবাণুনাশক গুণ আছে তুলসী পাতার। যে কোনও সংক্রামক ব্যধির প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তুলসী গাছের ফুল ব্রঙ্কাইটিস সারাতে কাজে লাগে। পাতা ও বীজ গোল মরিচের সঙ্গে মিশিয়ে ম্যালেরিয়ার ওষুধ তৈরি হয়। তুলসীর রস থেকে একজিমা, সোরিয়াসিসের মতো ত্বকের সংক্রমণজনিত রোগ সারানো ওষুধ তৈরি হয়। পাকস্থলীর আলসার সারাতেও অব্যর্থ দাওয়াই তুলসী। পোকামাকড়ের কামড়ে জ্বালাপোড়া হলে সেখানেও তুলসীর রস লাগিয়ে দিলে অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে কাজ করে। গরম পানিতে রোজ তুলসী পাতা ফুটিয়ে খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়ে।

ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাসের সংক্রমণ সারায়, প্রদাহ কমায়
তুলসীর মধ্যে আছে ইউজেনল, সিট্রোনেল্লোল, লিনালোল নামক এসেনশিয়াল ওয়েল। এই উপাদানগুলোর অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণ আছে। অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা যে কোনও প্যাথোজেনের সংক্রমণে শরীরে যে তীব্র প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন তৈরি হয়, তাকে কমাতে পারে এই এসেনশিয়াল ওয়েল। সাইটোকাইন নামক প্রোটিনের বেশি ক্ষরণে শরীরে তীব্র প্রদাহ হতে পারে। এই ইনফ্ল্যামেশনের কারণেই নানা রোগ ধরতে পারে শরীরে। তুলসীর নির্যাস এই প্রদাহ কমাতে পারে। তাছাড়া হজমশক্তি বাড়াতে, ইনফ্ল্যামেটারি বাওয়েল সিন্ড্রোম বা খাদ্যনালীর যে কোনও জটিল রোগ সারাতেও কাজে আসে তুলসী।

ত্বকের সুরক্ষায়
তুলসীর মধ্যে আছে ফ্ল্যাভনয়েড জাতীয় অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। করোনা সংক্রমণের এই সময় ঘরোয়া উপায়েই রোগ প্রতিরোধ বাড়ানো খুবই জরুরি। তুলসী সেখানে আদর্শ উপায়। সকাল বেলা খালি পেটে ২-৩টি তুলসী পাতা চায়ের সঙ্গের ফুটিয়ে খেলে ফুসফুসের স্বাস্থ্য ভাল থাকে। তুলসীর চা শরীরের রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়াতে পারে। ত্বকের যে কোনও সংক্রমণও রুখতে পারে। তুলসীর সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেলেও তা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি। তুলসীর রস ত্বকের যে কোনও র‍্যাশ, অ্যালার্জি বা ক্ষতস্থানে লাগালে ভাল ফল মেলে। অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে কাজ করে তুলসী। বিশেষজ্ঞরা বলেন, তুলসীর পেস্ট চন্দনের সঙ্গে মিশিয়ে ২০ মিনিট মুখে লাগিয়ে রাখলে ব্রণ, ফুসকুড়ি বা ত্বকের যে কোনও অ্যালার্জির থেকে রেহাই মেলে।

মানসিক চাপ-উদ্বেগ কমায়
তুলসী পাতার রস হজমশক্তি বাড়ায়। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। রক্তে শর্করার ভারসাম্য বজায় রাখে। মানসিক স্বাস্থ্যও ভাল রাখে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, অতিরিক্ত উত্তেজনা, উদ্বেগ, মানসিক অবসাদ দূর করে তুলসী। স্লিপিং ডিসঅর্ডার সারাতেও এর বিশেষ ভূমিকা দেখা গেছে। মাথা ব্যথা, মাইগ্রেন, ঝিমুনিভাব কাটাতেও তুলসীর রস উপকারী। ‘আয়ুর্বেদ অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ মেডিসিন’ জার্নালে তুলসীর অ্যান্টি-স্ট্রেস এবং অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি গুণের কথা বলা হয়েছে। গবেষকরা বলেছেন, প্রতিদিন ৫০০ মিলিগ্রামের মতো তুলসী নির্যাস খেলে মানসিক চাপ, অবসাদ থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

রক্তে শর্করা কমায় তুলসী
টাইপ-২ ডায়াবেটিস সারাতে তুলসী বিশেষ উপযোগী। রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখে। স্থূলত্ব বা ওবেসিটি কমায়। রক্তে অধিক ইনসুলিন বা হাইপারইনসুলিনেমিয়া সারাতে তুলসী উপকারী। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, টানা ৩০ দিন তুলসী পাতার রস খেলে রক্তে শর্করার পরিমাণ ২৪ শতাংশ কমে যায়। তবে ডায়াবেটিসের রোগীদের ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েই ডায়েটে তুলসী রাখা উচিত।তুলসী খারাপ কোলেস্টেরলের ‘এলডিএল’ পরিমাণ কমায়। ভাল কোলেস্টেরল ‘এইচডিএল’ বাড়ায়। পেট ভাল রাখে, পাকস্থলীর ঘা বা আলসার সারাতেও কাজে আসে। লিভার, কিডনি, হার্ট শরীরের তিন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকেই ভাল রাখে তুলসীর নির্যাস।

ব্ল্যাকহেডস ও ব্রণ দূর করে

তুলসী পাতায় অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিইনফ্লামেটরি উপাদান থাকে বলে ব্ল্যাকহেডস ও ব্রণ দূর করতে সাহায্য করে। এই হার্বটি প্রাকৃতিকভাবে ত্বক পরিষ্কার করতে এবং মুখের ধুলোময়লা দূর করতে সাহায্য করে। তুলসী পাতার রসের সাথে সামান্য হলুদ মিশিয়ে মুখে লাগান। কিছুক্ষণ রেখে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

দাগ দূর করে
মুখের দাগ কেউই পছন্দ করেন না। মুখের দাগকে হালকা করতে সাহায্য করে তুলসী পাতা। ব্রণের দাগসহ অন্যান্য দাগও নিরাময় করতে সাহায্য করে তুলসী পাতা। কিছু তুলসী পাতা পিষে নিন। এর সাথে ১ টেবিল চামচ মধু ও ১ চা চামচ লেবুর রস মিশিয়ে মাস্ক তৈরি করুন। এই মাস্কটি মুখে লাগান।

ত্বকের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়
তুলসী পাতা অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে পরিপূর্ণ বলে এটি ত্বকে পুষ্টি সরবরাহ করে এবং ত্বককে উজ্জ্বল হতে সাহায্য করে। কয়েকটি তুলসী পাতা থেঁতলে রস বের করে নিন। এর সাথে ১ টেবিল চামচ গ্লিসারিন মিশিয়ে নিন। প্রতিদিন এই মিশ্রণটি আপনার ত্বকে ম্যাসাজ করে লাগান।

অ্যান্টি এজিং বৈশিষ্ট্য রয়েছে
বয়সের ছাপ প্রতিরোধে সাহায্য করে তুলসী পাতা। তুলসী পাতার ব্যবহারে আপনাকে প্রাকৃতিকভাবেই কমবয়সী দেখাবে। তুলসী পাতার পেস্টের সাথে সামান্য তেল এবং ১ টেবিল চামচ মুলতানি মাটি মিশিয়ে মিশ্রণ তৈরি করুন। মিশ্রণটি মুখে লাগিয়ে কিছুক্ষণ রাখুন। তারপর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। সন্তোষজনক ফল পাওয়ার জন্য দিনে ২ বার ব্যবহার করুন এই পেস্টটি।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.