কক্সবাজার সৈকতে পর্যটক নেই, কিটকট ব্যবসাও বন্ধ

ফাঁকা সমুদ্রসৈকতে পড়ে আছে পর্যটকদের বসার চেয়ার। যা চেয়ার ছাতা বা কিটকট হিসেবে পরিচিত। এসব পাহারা দিচ্ছেন কয়েকজন মালিক ও কর্মচারী। বৃহস্পতিবার বিকেলে কক্সবাজারের সুগন্ধা পয়েন্টে

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। সুগন্ধা পয়েন্টে বৃহস্পতিবার বিকেল চারটায়। বিশাল সৈকতে কেউ নেই। সৈকতে বালুর মধ্যে কয়েকটি স্থানে স্তূপ করে রাখা হয়েছে পর্যটকদের বসার জন্য বিশেষ ‘চেয়ার ছাতা’, যা ‘কিটকট’ হিসেবে পরিচিত। স্তূপের কাছে দাঁড়িয়ে ‘কিটকট’ পাহারা দিচ্ছেন কয়েকজন মালিক ও কর্মচারী।

১০টি কিটকটের মালিক ওমর ফারুক (৪৪)। তাঁর বাড়ি কক্সবাজার শহরের দক্ষিণ ঘোনাপাড়ায়। ৯ বছর ধরে তিনি সৈকতে কিটকটের ব্যবসা করছেন। তাঁর ১০টি কিটকট পরিচালনায় কর্মচারী আছেন তিনজন। কর্মচারীরা ওমর ফারুককে ঘিরে ধরে চলমান বিধিনিষেধের প্রভাবে সংসারের কষ্টের কথা তুলে ধরছেন, চাইছেন অর্থসহায়তা। কিন্তু মালিক কিছুই করলেন না। উল্টো জানালেন দুর্বিষহ পরিস্থিতির কথা।

ওমর ফারুক বললেন, কর্মচারীরা দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরিতে চাকরি করতেন, তাঁদের দুই বেলা খাবার ও দুই বেলা নাশতা দিতে হতো। পর্যটক যখন সৈকতে ভরপুর থাকেন, তখন কর্মচারীদের বেতন, খাওয়ার খরচ পরিশোধ করে দৈনিক তাঁর লাভ থাকে ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে দেড় হাজার টাকা। এখন পর্যটক নেই, ব্যবসাও বন্ধ, কর্মচারীদের টাকা দেওয়া দূরের কথা, নিজের সংসার চালাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে স্তূপ করে রাখা হয়েছে পর্যটকদের জন্য বসার কাঠের চেয়ার। বৃহস্পতিবার বিকেলে

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ওমর ফারুক নতুন করে কিটকট ব্যবসায় নামেন। লকডাউনের কারণে ১ এপ্রিল থেকে সৈকতে পর্যটকের সমাগম নিষিদ্ধ করে জেলা প্রশাসন। এখন ঋণের দুই লাখ টাকার বিপরীতে প্রতি মাসে সুদ গুনতে হচ্ছে ২১ হাজার টাকা। সুদের টাকার জন্য লোকজন ঘরে এসে প্রতিনিয়ত ধরনা দিচ্ছেন, কী করবেন, বুঝে উঠতে পাচ্ছেন না ফারুক।

কয়েকজন কিটকট ব্যবসায়ী বলেন, করোনা সংক্রমণ রোধে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত টানা পাঁচ মাস সৈকতের কিটকট ব্যবসা বন্ধ ছিল। এ সময় অন্তত ৯০০ কিটকট রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হয়েছে। জানুয়ারি মাসে ঋণ ও ধারদেনার টাকায় এক হাজারের বেশি কিটকট তৈরি করে পুনরায় ব্যবসায় নামেন অন্তত ১০০ জন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। সর্বাত্মক লকডাউনে এবারও ব্যবসা বন্ধ। ফলে সৈকতে বালুর মধ্যে পড়ে নষ্ট হচ্ছে কিটকটগুলো।

সুগন্ধা পয়েন্টে কথা হয় কিটকট কর্মচারী মো. ইমনের সঙ্গে। তাঁর বাড়ি শহরের ঘোনাপাড়ায়। আট বছর ধরে তিনি সৈকতে পানির ধারে বসানো কিটকট পরিচালনা (চাকরি) করছেন। খাওয়া মালিকের, এরপর তাঁর দৈনিক মজুরি ২০০ টাকা। তাঁর বাবা মিনার হোসেন সমুদ্রে ওয়াটার বাইকের (জেডস্কি) চালক। সর্বাত্মক লকডাউনের প্রভাবে পর্যটকের আগমন বন্ধ থাকায় এখন বাবা-ছেলে দুজনই বেকার। ইমন বলেন, সৈকতে চাকরি করে বাবা-ছেলের দৈনিক আয় ছিল ৫০০ টাকা, সে টাকায় চলতো পাঁচ সদস্যের সংসার। এখন সৈকতে পর্যটক নেই, আয়ও বন্ধ। পেটেও ঠিকমতো খাবার জোটে না।

লাবণী পয়েন্টে কথা হয় আরেকজন কিটকট কর্মচারী আবদুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে। তাঁর বাড়ি শহরের বাহারছড়া এলাকায়। তিনি বলেন, লকডাউন শুরুর পর প্রথম পাঁচ দিন ধারদেনায় সংসার চালিয়েছেন। এখন কেউ ধারও দিতে রাজি নন, অভাব–অনটনে চলছে সংসার। হতাশার সুরে তিনি বলেন, ‘কিটকট ব্যবসা কখন শুরু হবে জানি না, তত দিন কী করব, কী খাব, ভেবে পাচ্ছি না। ঘরে স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ের চেহারা দেখলে কান্না আসে।’

সৈকতের কলাতলী থেকে উত্তর দিকে ডায়াবেটিস হাসপাতাল পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পর্যটকদের বসার কিটকট আছে ১ হাজার ২০০টি। জেলা প্রশাসনের রাজস্ব বিভাগে বার্ষিক কর পরিশোধ করেন অন্তত ১০০ জন ক্ষুদ্র কিটকট ব্যবসায়ী।

সৈকতের যেসব পয়েন্টে পর্যটকের সমাগম বেশি, সেসব এলাকার কিটকটের কর (রাজস্ব) পরিশোধ করতে হয় বেশি। লবণী পয়েন্টের প্রতিটি কিটকটের বিপরীতে রাজস্ব পরিশোধ করতে হয় ১ হাজার ৫০০ টাকা, সিগাল পয়েন্টে ৩ হাজার টাকা, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে ২ হাজার ৩০০ টাকা করে। কিটকট ভাড়া হয় ঘণ্টা হিসাবে, প্রতি ঘণ্টায় ৩০ টাকা।

কক্সবাজার বিচ কিটকট মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, কিটকটের বিপরীতে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হলেও বছরে ব্যবসা চলে মাত্র পাঁচ মাস (নভেম্বর থেকে মার্চ)। করোনায় ১ এপ্রিল থেকে সৈকতের কিটকট ব্যবসা বন্ধ থাকায় এর সঙ্গে জড়িত অন্তত ৩০০ পরিবারের দেড় হাজার মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছেন। অনেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.