এই পাখিরা এখন পরিবারেরই অংশ

বাঁশবনে প্রায় সারা বছরই এখন পাখি থাকে। সকাল-বিকেল পাখির ডাকে সরব বাড়ি দুটি। সন্ধ্যার পর নিঝুম, নিস্তব্ধতা। ছবি: প্রথম আলো

দুই বাড়ির পুরো বাঁশবনই দখলে নিয়েছে বকের দল। 

বাঁশবনে সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে যেন বকফুল ফুটে আছে। বাঁশঝাড়ের এখানে–ওখানে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে বসে আছে সাদা ও হালকা খয়েরি পালকের বক। কোনোটি বাসায় ডিমে তা দিচ্ছে, আবার কোনো বাসাতে বাচ্চা ফুটেছে। কোনো বাসায় মা–বাবার মুখ থেকে হাঁ করে খাবার খাচ্ছে ছানাগুলো। শুধু বক নয়, রঙের বৈচিত্র্য ফোটাতেই কি না দু–চারটি কালো পানকৌড়ির দেখা মেলে সাদা বকের ভিড়ে। আছে কিছু দেশীয় পাখি।

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার গয়ঘর গ্রামের দুটি বাড়ির ঘর-গেরস্তির অংশ এখন এই পাখির দল। পাখির ডাকেই বাড়ির লোকজনের ঘুম ভাঙে। সকাল হলেই ডাকতে ডাকতে উড়ে যায় দূরে কোথাও। বিকেল হলেই সাদা ঝাঁক হয়ে উড়ে আসে বকের সারি। তখন বাড়ির পুরোটাই পাখিদের দখলে। পাখির কিচিরমিচিরে একটা বুনো পরিবেশ থাকে বাড়িতে।

বাড়ির মালিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গয়ঘর গ্রামের মাসুক মিয়া ও মধুসূদন দেবের পাশাপাশি বাড়ি। বছর চারেক আগে বাড়ি দুটির বাঁশবনে হঠাৎ করে কিছু বক এসে আশ্রয় নেয়। বাড়ির কেউ তাদের বিরক্ত করেনি। নিরাপদ ভেবেই হয়তো আস্তে আস্তে পাখি বাড়তে থাকে। প্রথম দিকে বর্ষাকালজুড়ে পাখি থাকত। আশ্বিন-কার্তিকে কোথাও চলে যেত। বছর দুয়েক ধরে দুই বাড়ির পুরো বাঁশবনই দখলে নিয়েছে এরা। প্রায় সারা বছরই এখন পাখি থাকে। সকাল-বিকেল পাখির ডাকে সরব বাড়ি দুটি। সন্ধ্যার পর নিঝুম, নিস্তব্ধতা।

এখন প্রজননের মৌসুম থাকায় বাঁশবনের এখানে–সেখানে পাখির বাসা চোখে পড়ে। বর্ষাতেই পাখি বেশি থাকে। শীতকালে কমে যায়। পাখির মধ্যে বকের সংখ্যাই বেশি। আছে কিছু পানকৌড়ি। আনুমানিক হাজার দুয়েক পাখির বিষ্ঠায় বাঁশ বনের নিচ, বাড়ির ঘাস, কচুবন সাদা হয়ে আছে। অনেক বাঁশ মরে গেছে। বিষ্ঠার গন্ধ চারদিকে। কিন্তু এই পাখিরা এখন বাড়িরই অংশ হয়ে গেছে।

বাড়ির এক গৃহিণী ফাতেমা বেগম বলেন, ‘পাখিরা এখানে নিরাপদে আছে। গন্ধ হলেও দিনরাত পাখিরা কিচিরমিচির করে। পাখির ডাকে মুখর থাকে আমাদের বাড়ি। এ যেন পাখির মেলা। আমাদের ভালো লাগে। আমার প্রবাসী ছেলেরাও ফোন করে পাখির খবর নেয়।’

বাড়ির মালিক মাসুক মিয়া বলেন, ‘প্রথম প্রথম পাখির গায়ের গন্ধ খারাপ লাগত। এখন ভালো লাগে। প্রতিটি বাঁশে ছয়–সাতটি বাসা রয়েছে। এর মধ্যে দুই দফা বাচ্চা দিয়েছে। কিছু পাখি প্রতিবেশীর মতো সকালে আমাদের হাঁস-মোরগের সঙ্গে উঠানে চলাফেরা করে।’

অপর বাড়ির মালিক মধুসূদন দেব বলেন, ‘চার বছর ধরে পাখিরা এখানে আশ্রয় নিয়েছে। যদিও গাছপালার ক্ষতি হয়, তবু আমরা পাখি তাড়াই না। বাড়িতে এখন সারা বছরই পাখি থাকে। বৈশাখ মাস থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিরা আসে। এ সময় পাখিগুলো বাসা বোনে, বাচ্চা ফোটায়। বাচ্চারা উড়াল দেওয়া শিখে ফেললে আশ্বিনে আস্তে আস্তে উড়ে যায়। বক ছাড়াও আছে পানকৌড়ি, শালিক, ঘুঘুসহ বিভিন্ন জাতের দেশীয় পাখি।’

বাড়ির বাসিন্দা ও শিক্ষিকা শাহেলী আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিকারিরা হামলা করলে ডাকাডাকি করে। আমরা ছুটে যাই। পাখিরা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করছে। আমাদের প্রতিবেশী এই পাখিরা। বলা যায় বাড়ির অন্য সবার মতো তারাও একটি অংশ।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.