আধুনিক ঔষধিতে আফ্রিকান আদিবাসীদের অবদান

১৭২১ সালের ঘটনা। স্মলপক্স বা গুটি বসন্তের ভাইরাস বোস্টনের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল। শেষ পর্যন্ত শহরের ১১,০০০ বাসিন্দার প্রায় অর্ধেককে সংক্রামিত করেছিল এবং প্রায় ৮৫০ জনের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। যদিও ভ্যারিওলেশন ( variolation)- এর জন্য অনেক বোস্টোনিয়ান সেইসময়ে মারাত্মক ভাইরাস থেকে বেঁচে যান। ভ্যারিওলেশন হল টিকা দেওয়ার একটি প্রাচীন পদ্ধতি। যা প্রথমে রোগী বা সাম্প্রতিক পরিবর্তনশীল ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া উপাদানের সাহায্যে সুস্থ ব্যক্তিদের টিকা দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয় এই আশায় যে এটি শরীরে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। ইচ্ছাকৃতভাবে ত্বকের কাটা অংশ, কিংবা নাক দিয়ে শ্বাস নেয়ার মাধ্যমে অল্প পরিমাণে গুটিবসন্তের জীবাণু প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয় সুস্থ মানুষের শরীরে। এই পদ্ধতি আসলে জনপ্রিয় হয় নিউ ইংল্যান্ডের প্রচারক কটন ম্যাথারের হাত ধরে ।

সালেম জাদুকরী বিদ্যায় ( witch trials) পারদর্শী ছিলেন। আসলে ওনেসিয়ামাস নামে একজন ক্রীতদাস যিনি পশ্চিম আফ্রিকার বাসিন্দা ছিলেন তিনি ম্যাথারকে এই পদ্ধতির কথা জানান । যদিও ওনেসমিয়াসকে সর্বজনীনভাবে আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেওয়া হয়নি, ম্যাথার একটি ডায়েরিতে লিখে গেছেন যে আসলে ওনেসমিয়াসই প্রথম এই পদ্ধতির পরামর্শ দিয়েছিলেন। ওনেসমিয়াস বলে গেছেন যে ইচ্ছাকৃতভাবে একজন সুস্থ ব্যক্তির দেহে সংক্রামিত রোগীর থেকে অল্প পরিমাণে গুটিবসন্তের ভাইরাস পুশ করলে তা শরীরের মধ্যে রোগপ্রতিরোধী ক্ষমতা গড়ে তোলে। বিএমজে কোয়ালিটি অ্যান্ড সেফটি-তে প্রকাশিত একটি জার্নাল অনুসারে, ওনেসমিয়াসের গুটিবসন্ত সম্পর্কে জ্ঞান আমেরিকান ইতিহাসে প্রথম টিকা সম্পর্কে একটি ধারণা প্রদান করেছিল ।

১৭২১ সাল নাগাদ তুরস্ক, চীন এবং ভারতেও সফল ভ্যারিওলেশন পদ্ধতি চালু হয় । তুরস্কে এই চিকিৎসা থেরাপি সম্পর্কে জেনে আসার পর গ্রেট ব্রিটেনে গুটিবসন্তের চিকিৎসা শুরু করেন লেডি মেরি ওয়ার্টলি মন্টেগু। যদিও ওনেসমিয়াসের চিকিৎসা অভিজ্ঞতা বস্টন মহামারীর সময় অগণিত জীবন বাঁচিয়েছিল, তবুও বহু শতাব্দী ধরে চিকিৎসা ইতিহাস থেকে তাঁর নাম বাদ পড়েছিল। যদিও আজ ইতিহাসবিদদের হাত ধরে কালের গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলির নাম প্রকাশ্যে আসছে। রিড কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক মার্গট মিনারডি এনবিসি বোস্টনকে বলেছেন, “ওনেসমিয়াসের গল্প থেকে একটি জিনিস শিখতে হবে তা হল যে বর্ণবৈষম্য এবং পক্ষপাতদুষ্টতার কারণে প্রায়শই কিছু মানুষের জ্ঞান, শ্রম এবং অভিজ্ঞতা প্রচারের আলোয় আসে না। অন্ধকারেই থেকে যায়। ” যখন ওনেসমিয়াস আমেরিকাতে ভ্যারিওলেশন বা প্রাচীন টিকাকরণ প্রক্রিয়া চালু করেছিলেন, অনেক ছাত্র ওনেসিমাসের ইতিহাস বা আমেরিকাতে আধুনিক বিজ্ঞান চর্চায় তাঁর মত একজন ক্রীতদাসের অবদান সম্পর্কে অবগত ছিলেন না । আমেরিকায় আফ্রিকানদের ক্রীতদাস বানানোর ভূমিকা নিয়ে পাবলিক স্কুলের ছাত্রদের বইতে যা পড়ানো হত বা রাষ্ট্র যা বোঝাতো তাই তারা শিখতো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দাসত্ব নিয়ে কি শেখানো হত তা জানতে সাউদার্ন পোভার্টি ল সেন্টার ১২ টি মার্কিন ইতিহাসের ওপর লেখা বই, ১,৭০০ বেশি ইতিহাস শিক্ষক এবং ১,০০০ উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়রদের ওপর সমীক্ষা চালায়। তাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে অনেক শিক্ষাবিদ আমেরিকান দাসত্বের ইতিহাস শেখানোর জন্য পর্যাপ্তভাবে তৈরী নন, ৫০% এরও বেশি রিপোর্ট করেছেন যে তাদের পাঠ্যপুস্তকের বিষয়টির কভারেজ অপর্যাপ্ত ছিল।

ওনেসমিয়াসের গল্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞানের ইতিহাস সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে: আফ্রিকান এবং আফ্রিকান বংশোদ্ভূ্ত লোকেরা কী ধরনের চিকিৎসা এবং বোটানিকাল জ্ঞানের অধিকারী ছিল এবং তারা কীভাবে আধুনিক বিজ্ঞানে অবদান রেখেছিল? এমনকি যখন তাদেরকে তাদের মাতৃভূমি থেকে নির্মমভাবে বহিস্কার করা হয়েছিল , তখন ক্রীতদাস আফ্রিকানরা ব্রিটেন, ইউরোপ এবং আমেরিকায় তাদের মূল্যবান চিকিৎসা জ্ঞানের নমুনা তুলে ধরেছিল । আফ্রিকান চিকিৎসা পদ্ধতি ভারত এবং চীনের মতোই বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থাগুলির মধ্যে একটি। লোকেরা যখন আফ্রিকার কথা চিন্তা করে তখন তারা অনেকেই এই বিষয়টি জানে না, সারা বিশ্বের ৮০% মানুষ তাদের ট্রাডিশনাল ওষুধ ব্যবহার করে। রয়্যাল সোসাইটির কাছে পাঠানো ঘানার কেপ কোস্ট ক্যাসেলের তৎকালীন মন্ত্রী জন স্মিথ এবং মিস্টার ফ্লয়েড- এর নথি অনুসারে, আমেরিকাতে স্থানান্তরিত হওয়ার আগে অন্ধকূপে আটকে রাখা হয়েছিল আফ্রিকান ক্রীতদাসদের । যেহেতু রয়্যাল আফ্রিকান কোম্পানির কর্মচারীদের আয়ুষ্কাল ছিল মাত্র চার থেকে পাঁচ বছর, মন্ত্রীরা মৃত্যু কমানোর জন্য এবং কর্মচারীদের স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির সন্ধান করছিলেন, পাশাপাশি বাণিজ্যিক ওষুধের জন্য নতুন বোটানিকাল ওষুধের সন্ধানও করছিলেন। পশ্চিম আফ্রিকানরা দাঁতকে সুস্থ ও সাদা রাখতে কোন গাছের ছাল ব্যবহার করেন আমেরিকানদের কাছে তাও ছিল গভীর আগ্রহের বিষয়।

ঘানার কেপ কোস্ট ক্যাসেলের মন্ত্রী জন স্মিথ বর্ণনা করেছেন যে আফ্রিকানরা কীভাবে “unnena plant” সেদ্ধ করে সেটিকে শরীরের কেটে যাওয়া বা ফোলা অংশে লাগাতেন প্রদাহ কমাতে। পাম তেল এবং পাম ওয়াইন উভয়ই বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হত। কোষ্ঠকাঠিন্য কমানোর জন্য পাম ওয়াইন সিদ্ধ করা unnena গাছের সাথে মেশানো হত এবং ঘা এবং ক্ষত নিরাময়ের জন্য গাছের পাতাগুলিকে থেঁতলে পাম তেলের সাথে মিশ্রিত করে মলম তৈরি করা হত । ক্রীতদাস আফ্রিকানদের কাছ থেকে স্মিথও “পোকুমা উদ্ভিদ” থেঁতো করে, শুকিয়ে সেবন করে আমাশয়ের জন্য একটি চিকিত্সা পদ্ধতি শিখেছিলেন । এখানেই শেষ নয়- পাকস্থলীর ব্যথা, গুটিবসন্ত, কৃমি, যৌনরোগ, দাঁতের ব্যথা, স্কার্ভি এবং রক্তক্ষরণের চিকিৎসাগুলি পশ্চিম আফ্রিকার বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে শিখেছিলেন স্মিথ। কিন্তু পশ্চিম আফ্রিকার বোটানিকাল এবং চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের নাম আজও রয়্যাল সোসাইটিতে অনুপস্থিত। কেপ কোস্ট ক্যাসলের প্রধান বণিক জেমস ফিপসের কাছে পশ্চিম আফ্রিকার চিকিৎসা অনুশীলনগুলি প্রাথমিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। লন্ডনের নিয়োগকর্তাদের কাছে তিনি লিখেছেন : ” আমরা একজন দক্ষ উদ্যানপালকের সহায়তা পেয়ে আনন্দিত , যিনি ভেষজগুলির সাথে ভালভাবে পরিচিত। আমরা বিশ্বাস করি যে এখানে এমন অনেক জিনিস পাওয়া যেতে পারে যা খুবই উপকারী, যা স্থানীয়দের দ্বারা ফার্মেসিতে ব্যবহার করতে দেখা যায়, সেইসাথে সার্জারিতেও সুফল মেলে ।” “Bitter Roots” নামক বইতে আবেনা ডোভ ওসেও-আসারে বর্ণনা করেছেন কিভাবে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে, আফ্রিকান দেশগুলিতে পাওয়া ঔষধি গাছের ক্ষমতা নিয়ে বিজ্ঞানী এবং নিরাময়কারী মধ্যে দ্বন্দ্ব বিদ্যমান ছিল । অনেক ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি আবার এর মধ্যেই মুনাফা তৈরী করেছে এই নিরাময়কারী উদ্ভিদগুলির পেটেন্ট দাবি করে।

যদিও অতীতের ইতিহাসবিদরা ওনেসমিয়াসের মতো ক্রীতদাসদের গল্প এবং কেপ কোস্ট ক্যাসলের পশ্চিম আফ্রিকান বোটানিকাল এবং চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের উপেক্ষা করেছিলেন, কিন্তু সাম্প্রতিককালে বোস্টন ম্যাগাজিন ওনেসমিয়াসকে ১০০ জন সেরা বোস্টোনিয়ানদের মধ্যে একজন বলে উল্লেখ করেছে । ” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষাবিদরা খুব অল্প বয়স থেকেই এই ইতিহাসগুলি শেখানো শুরু করতে পারেন পড়ুয়াদের এবং ওনেসমিয়াসের মতো গল্পগুলি সম্পর্কে জানলে শিশুদেরও বিজ্ঞান সম্পর্কে আগ্রহ বাড়বে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.